–সে কি কিছু বাঁচাতে পারবে মাধুরী।
হ্যাঁ বিশ পঁচিশ টাকা বাঁচবে এ কথা আর কাউকে জানিও না বাবা। তুমি আর আমি বাপ–বেটিতে জানলাম যা হোক।
–হ্যাঁ মা আমার এই ষোল বছরের ভুলটা মহীনও ক্ষমা করতে পারে না।
–ক্ষমার কথা উঠে না এটা ভুল নয় অকর্তব্য। তোমার কর্তব্যের যে ত্রুটি তার জন্য তোমাকে দুঃখ পেতে হলো বাবা, কিন্তু গৌরব বোধ করতে পারবে।
–কেন মা? কিসের গৌরব আর।
–তোমার বন্ধুর ছেলের চরিত্র মহিমার জন্য। মানুষ কত কঠিন আর কত কোমল হতে পারে, দেবেন্দ্রনাথ তার প্রমাণ।
ক্ষেত্রর কাছে আমি ঋণী হয়ে গেলাম মাধুরী।
–না বাবা, ঋণ দেবে না ওরা। সেবা করেন প্রতিদানের আশা না রেখে। শুধু ভালবাসার জন্য তোমার প্রতি তার ভালবাসাটাকে ঋণ ভেবে খাটো করো না বাবা।
মাধুরী ওর মাথার চুলে হাত বুলাচ্ছিল, আরো কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে ধীরে ধীরে চলে গেল। পিতাপুত্রীর এই কথোপকধন কেউ শুনলো না, কেউ জানলো না এমন অনেক গভীর গোপন কথা উমেশবাবুর সঙ্গে হয় মাধুরীর।
অতঃপর মাধুরী এসে ঢুকলো মহীনের পরিত্যক্ত ঘরটায়, ঘরখানা তালাবদ্ধ ছিল। খুলে ভেতরে এসে মাধুরী দেখলো। সেই পুথি দু’খানা মহেন্দ্র নিয়ে যেতে ভুলেছে নিজের মনে খানিকটা উলটালো। কয়েকটা ছেঁড়া কাগজ পড়ে আছে দেখলো তারপর জানালার কাছে দাঁড়িয়ে তাকালো পশ্চিম দিকে সূ র্যাস্ত দেখা যায় না। দেখা যায় একটি ছোট পরিবার, এক তরুণী বধু তার স্বামী আর বছর খানেকের এক খুকী। একখানা মাত্র ঘর নিয়ে ওরা থাকে ভাগের কল ভাগের পায়খানা। বধুটি উনুনে রুটি সেকছে, স্বামীর বৈকালিক জলখাবার নিশ্চয়, আলু ভেজে রেখেছে একটু গুড়ও আছে দেখতে পেল বাচ্ছা মেয়েটা হানা দিয়ে এসে সেই গরম আলু ভাজা মুখে পুরে দিল এবং সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার। তার মাও সঙ্গে সঙ্গে দুটো চাপড় দিল ওর পিঠে কারণ আলুভাজার বাটিটা উলটে সব ছড়িয়ে গেল। গরম আলুভাজা মুখে মেয়েটার শাস্তি তারপর মার খেয়ে সজোরে কান্না জুড়ে দিল মাধুরী বলতে চাইল মারল কেন? কিন্তু কিছুই বলতে হল না। ওর মাই মেয়েকে কোলে নিয়ে মাই দিতে লাগলো। মাধুরী হেসে ফেললো মহীনের কথাটা মনে পড়ে গের, বিশ্বে যেখানে যত মা আছে সবারই। চেহারা একই সত্যি তাই।
৫. ইতিমধ্যে ওর স্বামী এল
ইতিমধ্যে ওর স্বামী এল, এসেই মেয়েটাকে নিল ওর কোলে আর বধুর গালে আস্তে একটা টোকা দিল। হাসিমুখে বধুটি তাড়াতাড়ি রুটি ক’খানা সেঁকে ওকে জল খেতে দেবার ব্যবস্থা করছে। নিত্যান্ত অভাবের সংসার তবু কত সুখের নীড় ওরা রচনা করেছে ভাবছে মাধুরী, বিরাট প্রাসাদে গগনচুম্বি বিলাস দ্রব্য ওখানে নাই রইল, ওখানে আছে অন্তরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাধুরী মুরলীর মূর্তিমতি শান্তিসুধা। মাধুরীর মুখে অপরূপ একটা তৃপ্তির হাসি ফুঠে উঠলো। শুক্রবারের দিন মাধুরী ফোন করে মহেন্দ্রকে তার অফিসে জানালো যে আগামীকাল শনিবার সে শঙ্করের নৃত্য দেখতে যাবে, মহেন্দ্র যেন ছুটির পরই মেসে ফেরে। অব্যাহতি নাই মহেন্দ্র জানে তা সম্মতি দিল, মাধুরী শনিবার দিন দুটোর আগেই কতগুলো জিনিস নিয়ে এসে উঠলো মহেন্দ্রের মেসে। মহেন্দ্র তখনো ফেরেনি, অনেক বাবুই ফেরেননি। মাধুরী সোজা উঠে এলো উপরে মেসের চাকরটা এল ওর সঙ্গে। মহেন্দ্রের ঘর তালা বন্ধ। মাধুরী চাকরটাকে বললো।
তালা ভেঙ্গে দাও—
সে কি! বাবু বকবেন। চাকরটা বিপন্ন বোধ করছে খুবই।
–না আমি বলছি, তুমি ভাঙো–
–আজ্ঞে না বাবু–
মাধুরী ওকে আর কিছু বললো না, ড্রাইভার অনুপ সিং জিনিসগুলো নিয়ে ও পেছনে এসেছে। মাধুরী ইঙ্গিত করলো তালা ভাঙতে। অনুপ সিং পকেট থেকে একটা লম্বা গ্লাস কে করে তালাটা মোচর দিল, কম দামী তালা আধ মিনিটের মধ্যে ভেঙে গেল। ঘরে ঢুকলো মাধুরী অনুপ সিং। জিনিসগুলো ঘরে নামাতেই মাধুরী তাকে একখানা পাঁচ টাকার নোট দিয়ে বললো, ভাল একটা তালা আন দুটো চাবি যেন থাকে।
অনুপ সিং চলে গেলে মাধুরী চাকরটাকে বললো, ঝাটা আন। ঘরে একটা চৌকি আনা হয়েছে কোথা থেকে কিন্তু বই রাখবার শেলফ ছিল না। মাধুরী একটা সেলফ এনেছে, একখানা টিপয়, দুটো ভাজা চেয়ার আর একখানা ক্যাম্বিসের ইজি চেয়ার, ওর লোক দুতিন বারে সেগুলো বয়ে আনলো নীচে থেকে। চাকরটা ঘর ঝাট দিতে লাগলো মাধুরী ঘরের প্রত্যেকটি কোন পরিষ্কার করিয়ে নিচ্ছে, চাকরটা পারছে না কেড়ে নিল মাধুরী ঝাটা তার হাত থেকে বললো–ছাড়ো অকর্মা। নিজেই একোন কোন পরিষ্কার করলো, তারপর বিছানাটা ঝেড়ে পেতে দিল। ঝালর দেয়া নতুন বালিশ দিয়ে পার দিকে রাখলো। পুরুইটালিয়ান ব্যাগ। লেপ আছে একখানা, চেয়ারগুলো ভাজ খুলে বসালো, একধারে ইজিচেয়ার, পাশে টিপয়টার ওপর কভার ঢেকে একটা ফুলদানীতে একগুচ্ছ ফুল সাজিয়ে দিল এরপর মাথার দিকের দেয়ালে টাঙ্গিয়ে দিল একটা বড় ছবি রবীন্দ্রনাথের। ওর তলায় ছোট একটি ধুপদানী কয়েকটা ধুপকাঠি গুঁজে ধরিয়ে দিল। সে ঘর এখন আর চেনা যায় না। মাধুরী দেখছে নিজের সাজানো ঘরখানা নিজেই। মহেন্দ্র অফিস থেকে ফিরে উপরে এল দেখলো মাধুরীকে তদবস্থায় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলো–
: এসব কি হচ্ছে মাধুরী?
: সেবা। হেসে জবাব দেয় মাধুরী।
: একে সেবা বলে না মাধুরী, মহেন্দ্র করুণ কণ্ঠে বললো।
