ওগো সাখী, মম সাখী আমি সেই পথে যার সাথে
যে পথে বন্ধুত্ব দেশ বন্ধুত্ব সাথে।
যে পথে কাননে পাশে ফুলদল, যে পথে কুসুমের পরিমল,
যে পথে উষার হয় অভিসার অরুণ কিরণ, মাঝে—
গানের ভাষা এবং ভাব এমনই অপরূপ যে শ্রোতারা মুহ্যমান হয়ে শুনেছে নির্বাক নিষ্পন্দ। মাধুর হাতে সেতারখানা যেন কথা কইছে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে গাইলে মহেন্দ্র, ও নিজেই মগ্ন হয়ে গেছে তসরের ভাবে মুছনায়, সঙ্গীতে সমাধিস্থ হয়ে গেছে যেন।
গান শেষ হল লক্ষ্ণৌ এর ভদ্রলোক শুধু বললেন, সার্থক সাধনা তোমার। মহেন্দ্র ওকে প্রণাম করলো। তিনি অল্পক্ষণ ওর পানে তাকিয়ে হেসে বললেন তুমি আমার ওখানে দিনকয়েক থাকবে বাবা শরীরটা সারিয়ে দেব, ওখানকার জল হাওয়া খুব ভাল।
: আমি চাকরী করি ছুটি পাব না তো এখন।
: ও আচ্ছা ছুটি পেলে, যেও আমার ওখানে একবার।
মহেন্দ্র মাথা নামানো মাত্র, অতঃপর গানের আসর আর জমলো না। প্রচুর সুখাদ্য খেয়ে মহীন যখন মেসে ফিরছে মাধুরীকে খুঁজে পেল না।
বড়বৌদি বললো এবার তোর একটা আর মাধুরীর একটা–
–কি বৌদি, মহীন বোকার মত প্রশ্ন করলো—
বি–য়ে বড়বৌদি টান করে বললো–বুঝেছ?
না বৌদি মেট্রিকেই আটকে গেলাম, বি, এ আর হলো কৈ। মহীন সংক্ষেপে জানালো।
: বিদ্যালয়ের বি. এ. নয় এটা অবিদ্যালয়ের বিয়ে, বুঝলে মুগ্ধ। বৌদি হাসল আবার এস শীগগীর।
সঙ্গীতের আসরে যে ক’জন ছিল, তার মধ্যে মাধুরীর বিশেষ বান্ধবী মেনকা অন্যতম। সুন্দরী, তরুণী ধনী কন্যা এবং সঙ্গীত ও নৃত্যে পটু। পরদিন কলেজে দেখা হতেই মেনকা বললো তোর মহীনদাকে দেখলাম মাধু অমন রোমান্টিক ছেলে অত দরদ দিয়ে গান গাইল কিন্তু মেয়েদের সম্বন্ধে ও যেন বড্ড ভাল।
–তোর মত মুখ আর দেখিনি, মাধুরী বললো মহীনদা সামাধিস্থ শিব। তাঁর ধ্যান ভাঙতে মদন ভস্ম–অত সাজসজ্জা করে নাইবা যেতিস।
–সবাই যেমন যায় তেমনি গিয়েছিলাম তাই বলে মেনকা একটু থেমে বললো উনি বুঝি ওসব পছন্ন করেন না?
ওর কিছু এসে যায় না একে যে চাইবে তাকে কক্কবাসা উমা হতে হবে, তপস্যা করতে হবে কন্যাকুমারিকায়–
–ওরে বাবা ঐ কেরানীটার জন্যে।
–শিবকে চাইলে শুশান মেনে নিতে হয়। সম্পদ চাইলে ইন্দ্র, চন্দ্র আছেন অনেক—
–শিব বুঝি আর নেই।
–না, মাধুরী যেন ধমক দিল। তিনি এক মেধাদ্বিতীয়ম।
–চলে গেল মাধুরী। মেনকা ওর নির্বুদ্ধিতায় হাসলো আপন মনে বললো, সৃষ্টি ছাড়া মেয়ে একটা।
কে রে? গীতা এসে দাঁড়ালো।
–ঐ মাধুরী অত বড় লোকের মেয়ে ধনমান কুল শীল রূপ যৌবন কিছুই অভাব নেই, কিন্তু ও ভালবাসছে একজন কেরানীকে।
–যাঃ। ওর সেই মহীনদা তো? ভালবাসে না করুণা করে, ওদের আশ্রিত জীব একটা পোষা কুকুর যার যেমন মায়াও তাই।
–তুই জানিস কচু। ছেলেটাকে কাল দেখলাম, সে মোটে কুকুর নয়, বাঘ।
–পুষতে চাস তো দেখ না? হাসলো গীতা।
–ও পোষা যায় না। একদম জঙ্গলের ব্যাপার মাধুকেই ভাল।
দু’জনেই খুব হাসলো নিজেদের রসিকতায়। কলেজ ছুটি হয়েছে বারান্দা থেকে দেখলো। গাড়ীতে উঠে মাধুরী বাড়ি চলে যাচ্ছে।
বাড়ি ফিরে মাধুরী কলেজের বেশ ত্যাগ করলো, তারপর বাবার কাছে গেল বারান্দায় একধারে তিনি একা বসে চা খাচ্ছিলেন, মাধুরী গিয়ে বসলো, তারপর বললো, বড়দাকে এ মাসেও আমি পঞ্চাশ টাকা পাঠিয়ে দিলাম বাবা কিন্তু আসছে মাস থেকে আর পাঠাব না?
-–কেন মা কেন? উমেশবাবু উদ্বিগ্ন কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন।
–তুমি এতোকাল তোমার বন্ধুর ছেলের খোঁজ নাওনি বাবা, সে ভুল আর শোধরানো যাবে না। কাটা কাপড় জোড়া দেওয়া যায়, কি শেলাইয়ের দাগ থাকে বড়দার আত্মম র্যাদা বোধ হয়তো আমরা ক্ষুণ্ণ করছিলাম বাবা, এই টাকা পাঠিয়ে।
–সে কি মা? বৃদ্ধ যেন অতি বিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন, তুমি কি বুঝলে?
হ্যাঁ বাবা, নিরুপায় হয়ে তিনি এই টাকা গ্রহণ করেন। মহীনদাকে লেখা তাঁর চিঠিতে বিশেষ কিছু বোঝা না গেলেও আমি আন্দাজ করতে পেরেছি, তার দৈন্যের আগুনে এ টাকায় জল ঢালা হচ্ছে না, ঘি তেল দেয়া হচ্ছে। তাকে দুঃখ দিয়ে তো আমাদের লাভ নেই।
উমেশবাবু নির্বাক বসে রইলেন কথাটা শুনে। মাধুরী আবার চা দিয়ে বললো, তোমাকে দুঃখ দেবার জন্য আমি কথাটা বলছি না বাবা, অন্ধ অসহায় আমাদের এক নিকট আত্মীয়কে দুঃখ দেব না এই বললাম।
এ রকম কেন যে ভাবছ মা? উমেশবাবু ধীরে ধীর বললেন!
ভাবনার যথেষ্ট কারণ আছে বাবা, দীর্ঘ ষোল বছর তুমি তাদের খবর নাওনি। মহীনদা এখানে না এলে হয়তো কোনদিন নিতে না। তোমাকে একান্ত আপনার বলে স্বীকার করতে আজ তার মন চাইবে কেন বাবা? তোমার বন্ধুর ঐ পরিবারটি বাইরে যতই দীন হোন, অন্তরে রাজাধিরাজ।
এ ভুল শোধরানো যাবে না মাধুরী?
শোধরানোর চেষ্টা করাই ভাল বাবা, স্বার্থন্বেষী সাধারণ কোন মানুষ হলে তোমার এই দানকে দাবী বলে মনে করতো। চেষ্টা করতো আরও বেশী আদায় করবার, এরা কিন্তু পাথরের মূর্তি বাবা, তোমার টাকার মুঠো ওঁর গায়ে গেলে দাগ কেটে দেয়, স্নেহের ধারা দিতে তুমি ষোল বছর দেরী করেছো বাবা, সে আর দেয়া যায় না–
মাধুরীর গভীর কালো চোখের পানে চাইলেন উমেশবাবু, চকচক করছে জল যেন কিন্তু মুখে হাসি এনে মাধুরী বললো, তুমি ভেবো না বাবা, এবার থেকে মহীনদা তার রোজগারের টাকা পাঠাবেন।
