সকালে বড়বাবু ওর ঘরে আলো ঠিক করে সারিয়ে দিলেন এবং ঘরখানা ধুয়ে দিলেন। লেডি হিসাবে এটা কর্তব্য। তবে কোন শিল্পী নাকি এই ঘরে থাকতেন তিনি ক্লে মডডিং অর্থাৎ মাটির মূর্তি গড়তেন, ঘরের এক কুলঙ্গীতে তাঁর হাতের তৈরি একটি হরগৌরীর মূর্তি রয়েছে। চমৎকার মূর্তিটি শিবের বিশাল বক্ষে আশ্রিতা উমা যেন বিরাট আকাশের কোলে বনানীর বিরস্নিগ্ধ হরিদ্রাভা। মহেন্দ্র মূর্তিটি সযত্নে রেখে দিল। মেসের বাবুর সঙ্গে আলাপ এবং কয়েকজন সমবয়সীর সঙ্গে বন্ধুত্ব হোল মহেন্দ্রের। অতঃপর ভালই চলেছে এবং চলতো কিন্তু তৃতীয় দিনে অফিসের টেলিফোনে ডাক পড়লো মাধুরী কথা বলছে, অন্য কোন কথা না বলে হুকুম করলো,
: আজ সন্ধ্যায় এখানে আসতে হবে।
: আমার ছুটি হতেই ছয়টা বেজে যায় মাধুরী, কখন যাব।
: আচ্ছা, আমি ছয়টার পর মেসে গাড়ী পাঠাব রাত্রে এখানেই খাবে।
ফোন ছেড়ে দিল মাধুরী যেন সম্রাজ্ঞীর আদেশ। কিন্তু মহেন্দ্র কেন জানিনা যেতে চায় , যথেষ্ট সাহায্য এই আড়াই মাস ওদের কাছ থেকে নিয়েছে সে, আর নয়। কিন্তু কোন সাহায্য সে নিচ্ছে না এ শুধু নিমন্ত্রণ। হয়তো বিশেষ কোন ব্যাপার আছে আজ ওখানে তাই যেতে হবে। মহেন্দ্র কয়েক মিনিট আগেই মেসে ফিরে হাত মুখ ধুয়ে তৈরী হচ্ছে। মেসের গলিতে গাড়ী এসে দাঁড়াল। নামলো স্বয়ং মাধুরী। নেমেই সামনে যে বাবুটিকে পেল। তাকেই শুধলো–মহীনদা কোন ঘরে থাকেন, মহেন্দ্র মুখোপাধ্যায়।
–যে বাবুটি নুতন এসেছেন?
–হ্যাঁ নিশ্চয় তাকে চেনেন আপনি। যেন না চিনলে ওর অপরাধ হবে হ্যাঁ চিনি বৈকি। আপনি দাঁড়ান আমি ডেকে দিচ্ছি তিনি থাকেন ছাদে।
: ছাদে, মাধুরী চোখ কপালে তুললো। ছাদে কি করে মানুষ থাকে মশাই?
: ছাদে, মানে ছাদের ঘর, ঘর তো নয় পায়রার খোপ।
: ও আচ্ছা অনেক ধন্যবাদ ডাকতে হবে না যাচ্ছি বলে মাধুরী তর তর বেগে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল। মেসের চার পাঁচজন বাবু দেখলো ঐ গতিশীল উল্কাকে। বাইরে তাকিয়ে দেখলো বিরাট গাড়ীখানা দাঁড়িয়ে।
মলীন ধুতিখানা পরে গায়ে গেঞ্জী চড়াচ্ছে মাধুরী উঠে এসে বললো–বাঃ পায়রার খোপ নয়তো চড়াইয়ের বাসা?
মহেন্দ্র মহাব্যতীব্যস্ত হয়ে শুধলো মেসে কেন এলে তুমি মাধুরী।
কেন? মেসে তুমি থাকতে পার আর আমি আসতে পারি না?
কেন। বলে মাধুরী, ঘরখানা ভাল করে দেখতে লাগলো দীর্ঘক্ষণ ধরে। মহেন্দ্র জামা গায়ে দিয়ে বললো, চলো কোথায় যেতে হবে?
হ্যাঁ, চলো। ঐ মূর্তিটি কার?
–কোন এক শিল্পী এখানে থাকতেন তারই ছিল। এখন আমার, তুমি ইচ্ছে করলে নিতে পার।
না, এই অন্ধকার বাড়িটায় ঐ ছোট্ট প্রদীপটুকু জ্বলে থাক। জানলে ওর জন্যে ফুলের মালা আনতাম।
মহেন্দ্র মৃদু হাসলো কথাটা শুনে, ঘরের দরজা বন্ধ করে তালা দিয়ে বেরুলো দুজনে। কিন্তু মাধুরী বাড়িখানা ভাল করে দেখলো। স্নানাগার, শৌচাগার সবই সে ঘুরে দেখলো, অবশেষে রান্না ঘরে এসে দেখলো, শীত কালে কলকাতায় যখন প্রচুর তরকারী, কপি, মটরশুটি, মাংস তখন এই মেসে রান্না হচ্ছে বেগুন আলু আর টমেটোর চাটনী। কিছু বললেন , কিন্তু কত যে বলছে তার চোখ সেই জানে। নিঃশব্দে মহীনকে নিয়ে গাড়ীতে উঠলো, তখনো মেসের বাবুরা এই জলন্ত অগ্নিশিখাবৎ মেয়েটাকে দেখছে নানা জায়গা থেকে। গাড়ী ছাড়তেই মাধুরী বললো, আচ্ছা মহীনদা, এই কাঙ্গাল মেসে থেকে তুমিও কাঙ্গাল হয়ে যাবে না তো?
সবাই খেটে খায় মাধুরী। কাঙ্গাল কেন হবে ওরা?
টাকার কাঙ্গাল নয়, রূপের কাঙ্গাল, আমাকে দেখবার কি নিদারুণ ওদের চেস্টা, অর্থাৎ তুমি যে রূপসী জানতে চাইছো, কথাটা বললো মহীন হাল্কা ভাবেই।
–মহীনদা, মাধুরী যেন গর্জন করে উঠলো, এই তিন দিনেই তুমি ভিখারী হয়ে গেছ। ছিঃ। আমি যদি তোমার কাছে আসতাম তো ব্যাপারটা অন্যরকম দাঁড়াতো।
–মাধুরী! আমার নিদারুণ ভুল হয়ে গেছে মাধুরী, মহীনের চোখে মার্জনা ভিক্ষার আকুতি।
–আচ্ছা, এ রকম আর বলো না, মাধুরী হেসে দিল।
–তোমাকে না বুঝেতে পারি তো ক্ষতি হবে মাধুরী, কিন্তু ভুল যেন না বুঝি আকশকে বুঝা যায় না তাতে আকাশের ম র্যাদা কমে না।
–অত বাড়িও না মহীনদা, আমার বিদ্যেটুকু সব তোমার দান, তুমি আসার আগে কেউ ওভাবে আমার রূপের প্রশংসা করলে আমিই খুশী হতাম।
–ওটা কি রকম কথা হোল মাধুরী
–আমি যেন নীল শান্ত আকাশ তা জানতাম না, আমার ঝরা মেঘটা তুমি ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিলে–
চাকুরে বাবু হয়ে এই মহেন্দ্র এল এ বাড়িতে, এখানে ও কোনদিন অসম্মানিত হয়নি, কিন্তু ওর যে এখানে বিশেষ একটা সম্মান আছে, তা যেন আজই বুঝতে পারলো। বিশেষত্ব কোন নিকট আত্মীয় যেন দীর্ঘকাল পরে এসেছে, এই রকম ভাব সকলের, চাকরগুলো পর্যন্ত বারংবার নমস্কার জানাল ওকে। ব্যাপারটা আর কিছু নয় ছোটদাকে আশীর্বাদ করতে এসেছেন লক্ষ্ণৌ থেকে সেই ব্যবসাদার ভদ্রলোক, ইনি সঙ্গীতে বিশেষ অনুরক্ত এবং রতীনের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে আপনার একমাত্র কন্যাকে দান করতে চান তার হাতে। মেয়েটিও খুব সঙ্গীত অনুরাগিনী। ওঁকে গান শোনাবার জন্য একটা আসর বসাতে বলেছেন উমেশবাবু এবং এই জন্য মহেন্দ্রকে আনলো মাধুরী।
অনেকগুলি নিমন্ত্রিত ভদ্রলোক। অনেকেই কিছুনা কিছু গাইলেন, মাধুরীও একটা রবীন্দ্র সজীত গাইল। অতঃপর মহীনের পালা। মহীন অতুল প্রসাদের একটা গান ধরলো :–
