: দিই, অর্পনা একটা ছেঁড়া গেঞ্জী পরিয়ে দিচ্ছে খোকনকে। খোকন বলল, এটা ছেঁড়া মা। ঐটাই দাও না, বাবা তো আর দেখতে পাবেন না।
–ছিঃ খোকন। বাবা মার সঙ্গে লুকোচুরি করবি। মুখে সে বললো, কিন্তু অন্তর জুড়ে একটা বেদনার বাম্প উঠেছে। বললো–
: আর এমন কথা বলিস না কখনো।
: না মা, আর কখনো বলবো না মা, মা তুমি রাখ না, ওগুলো রেখে দাও, ও জামা, আমি পরবোই না, আর কাকু জামা আনলে পরবো মা–
: হ্যাঁ, কাকুর রোজগারের টাকাতে জামা কিনে দেব, কেমন?
হ্যাঁ মা, হ্যাঁ এ টাকা বুঝি, কাকু চেয়ে পাঠায়?
অর্পণার আহত দারিদ্র আবার আহত হোল, অসাধারণ সহ্যশক্তি তার। কিন্তু দুধের বালাক কিছুটা বোঝে না, বার বার সে তাই আঘাত করছে মায়ের অন্তরকে। অর্পনা একটু কঠোর স্বরে বললো–
: এ বংশের মানুষ না খেয়ে মরে তবু কারো কিছু চায় না, এই সত্যিটা শিখে রাখ, এমন কথা বলিসনে আর।
: না মা, আর বলবো না।
খোকন খালি গায়েই চলে গেল বাইরে, ছেঁড়া গেঞ্জীটা হাতে অর্পণা নিঃশব্দে বসে রইল খানিকক্ষণ, চোখে জল। ঠিক সেই সময় দেবেন্দ্রের বহু দিন না শোনা আনন্দময় কণ্ঠের আহ্বান এলো।
: অর্পণা ছুটে এসে, মহীন টাকা পাঠিয়েছে তার নিজের রোজগারের টাকা অর্পণা ঘেঁড়া গেঞ্জীটা হাতেই বাইরের ঘরে এসে দেখল সাগর পিওন চৌদ্দটা টাকা দিচ্ছে দেবেন্দ্রের হাতে। কুপনটা সাগর পড়েছে, তুমি আর একবার পড়তো অর্পণা। অর্পণা কুপনটা হাতে নিয়ে পড়লো?
শ্রীচরণেষু দাদা, আপনার চরণমুলে এই আমার প্রথম অর্ঘ্য এই টাকা কয়টি আপনার মহানের রোজগারের। অনন্ত প্রণাম গ্রহণ করবেন। মহীনের টাকাগুলো পরম আদরে বুকে চেপে অন্ধ দেবেন্দ্র অশ্রুপ্লাবিত চোখে ডাকলেন এই নাও, অর্পণা, দুহাত পেতে নাও বুকে করে নিয়ে লক্ষ্মীর হাঁড়িতে তোল। অর্পণার দু’চোখে জল, হাত পেতে টাকা নিয়ে নিঃশব্দে উঠে গেল। সাগর পিওন প্রতি মাসে পঞ্চাশটা করে টাকা এই বাড়ি দিয়ে যাচ্ছে কিন্তু কোনোদিন এতটুকু আনন্দের স্ফুরণ দেখেনি, আজ বিস্মিত হয়ে অন্ধ দেবেন্দ্রর অশ্রুসজল মুখোনা দেখতে দেখতে প্রণাম জানিয়ে বেরিয়ে গেল দেবেন্দ্র ডাকলেন, খোকন।
: যাই বাবা, খোকন খালি গায়ে এসে দাঁড়ালো।
: তোর দয়াল দাদাকে ডাক, বল বাবার সেতারটা সারিয়ে আনতে হবে, আর তোর একখানা মোটা জামা, যা ডেকে আনতো বাবা।
খোকন নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল, দেবেন্দ্রের চোখে জল, মুখে হাসি। ঘরটায় পায়চারী করতে লাগলেন, আপন মনে গাইছেন–
নিবিড় আঁধারে মা তোর চমকে অরূপরাশি
তাই যোগ্য ধ্যান ধরণে হয়ে গিরিগুহাবাসী
অনন্ত আঁধার কোলে মহা নির্বাণ হিল্লোল,
চিরশান্তি পরিমল অবিরত যায় ভাসি—
দয়াল নিঃশব্দে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে শুনেছে গানটা। সুরের অসাধারণত্ব ঘরের আকাশকে যেন স্নিগ্ধ করে তুলেছে দু’হাত জোড় করে দয়াল নমস্কার জানালো এই আত্মভোলা সুর সাধককে।
মেসে ঠাই পাওয়া খুবই শক্ত আজকাল, কিন্তু মহীনের সৌভাগ্য ওদের অফিসের বড়বাবু একটা মেসের মালিক। তিনিই মহীনকে জায়গা দিলেন, চিলেকোঠার পাশের ঘরটায়। ঘর নয়, একটা গুদাম তবে খোলা, আলো হাওয়া প্রচুর, মস্ত ছাদটা পড়ে রয়েছে। লেখবার সুবিধা হবে মহীনের। মেস বলতে যে নোংরা অন্ধকার আবাস বুঝায় এখানে উঠে এলে তা মনে হয় না। কিন্তু ঘরখানা অত্যন্ত ছোট মাত্র একটা জানালা, ছাদটা টালীর। ওতেই মাধুরির দেয়া তোষক, চাদর–বালিশ বিছিয়ে ফেললো মহেন্দ্র। বইগুলো একপাশে রাখলো খবরের কাগজ পেতে, অতঃপর তালা চাবি দিয়ে অফিসে গেল।
বড় অফিস, বহুলোক কাজ করে ভারতের নানাস্থানে এদের শাখা অফিস আছে। কাজের ক্ষমতা দেখাতে পারলে মহেন্দ্র যথেষ্ট উন্নতি করতে পারবে। এখানে কাজটি শুধু টাইপ করা, তার জন্য ওদের আরো লেডী টাইপিষ্ট আছে, মহেন্দ্রকে টাইপ তো করতেই হবে চিঠিপত্রের ব্যাপারে বড়বাবুকে সাহায্যও করতে হবে।
পাঁচটা পর্যন্ত কাজ করলো মহেন্দ্র, শরীরটা কেমন যেন ক্লান্ত বোধ হচ্ছে হয়তো এক নাগাড়ে এতখানি খাটা অভ্যাস নেই অভ্যাস হয়ে যাবে ভাবতে ভাবতে বাসায় ফিরলো। ঘঁদের ঐ ঘরটায় আলো ছিল না, মিস্ত্রি ডেকে লাইন করিয়ে নিতে হবে, কিন্তু আজ আর। হয়ে উঠলো না মহেন্দ্র এক কাপ চা মাত্র খেয়ে শুয়ে পড়লো বিছানায়।
শীতে রাত সাড়ে নটার পূর্বে মেসে খাওয়া হবে না ততক্ষণ মহেন্দ্র শুয়ে আকাশ পাতাল ভাবতে লাগলো অন্ধকার ঘরে। আলো থাকলে কিন্তু লিখতে বা পড়তো। ভাবছে খোকনকে এই ঘরে এনে রাখবে তার কাছে, কাছের কোন স্কুলে ভর্তি করে দেবে। সকাল সন্ধ্যা নিজে পড়াবে আর গান শেখাবে। কিন্তু গান শেখাবে কি? যন্ত্র নেই। কিন্তু কেন? মহেন্দ্র কিনে নেবে একটা যাহোক কিছু যন্ত্র অথবা বাড়ি থেকে একটা এনে সারিয়ে দেবে। অপরের দেয়া যন্ত্রে কেন সে গান শেখাতে যাবে খোকনকে?
খিদে পেয়েছে, এতক্ষণ রান্না হল হয়তো, মহেন্দ্র উঠে এলো। আকাশ ভর্তি জ্যোৎস্না সুন্দর হয়ে উঠেছে, একটা বাঁশি পেলে বাজাতো মহেন্দ্র কিন্তু থাক সিঁড়ি দিয়ে নীচে এসে দেখলো বাবুরা খেতে বসেছে, ঘরে আর জায়গা নেই। নিরুপায় মহেন্দ্র পাশের ঘরে একজনের খাটে বসে রইল দ্বিতীয় ব্যাচ বসবার অপেক্ষায়। অতঃপর খেল, মেসের কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করলো এবং বড়বাবুকে জানালো যে, আলোটা আজও হয়নি। তারপর উপরে এসে শুলো। ক্লান্তিতে সর্বাঙ্গ ভেঙ্গে পড়ছে। এই গুদামটায় আগে যে সমস্ত জীব বাস করত তারা এতক্ষণ কোথায় ছিল, এসে উপদ্রপ আরম্ভ করেছে, এরা সংখ্যায় বহু। ইঁদুর এবং আরশোলা তো আছেই, একটা বিছাও দেখলো মহেন্দ্র মোমবাতির আলোতে। সর্বনাশ এ ঘরে কি করে শোয়া যায়। কিন্তু ওর অভ্যাস আছে। ওদের প্রাচীন বাড়ীতে বিছা ইঁদুর আরশোলা প্রচুর। মহেন্দ্র মশারীটা ভাল করে গুঁজে শুয়ে পড়লো ঘুমিয়ে গেল।
