ফরমাস করলেই আমি গাইতে পারি নে, অত সস্তা গলা নেই আমার, চা খাবেন তো আসুন সবাই এই বারান্দায় বলে সে ওদিকে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল চায়ের সরঞ্জাম সমেত চাকরটাকে নিয়ে।
বেশ, চা খেতে খেতে গানের মুড আসবে তো? বলতে বলতে ওরা এলো বারান্দায়।
: আমার গান হুড চাপা আছে ও এখন খুলবে না এখানে হুড মানে হড়পী, যাতে সাপ থাকে ওকে তুবড়ী বাজিয়ে খুলতে হয়, আসুন, চা খান। এখানে আছে গোখরা সাপ বলে চা ঢেলে চলে যাচ্ছে, বড়দা এসে ঢুকলো বললো–
আমায় এক কাপ দে ছোটদি।
: দিই মাধুরী কোমল হয়ে উঠল। বড়দাকে সে অত্যন্ত ভক্তি করে, বললো আজ দমদমার বাগানটা দেখে এলাম বড়দা, ওখানে একটা গোশালা করলে হয় না? আমি না হয় দেখবো?
: গো শালা? কেন রে?
: দেশে বিস্তর গরু, রাখবার জায়গা নেই আমি কতকগুলো রাখতাম।
: বিস্তর গরু কোথায়? গরুরই অভাব বাংলাদেশে।
না বড়দা গরু অনেক আছে, তবে সেগুলো দুধ দেয় না ওদের খোয়াড়ে পুড়ে ভালো করে খাওয়াতে হবে!
চা দিয়ে গেল মাধুরী। ওর কথা কেউ ধর্তেব্যের মধ্যে আনে না তাই রক্ষে নইলে সুশীল হয়তো অপমান বোধ করতো তথাপি সে লাল হয়ে উঠলো মাধুরীর ছেলে মানুষ রসিকতায়। কিন্তু কিছু করবার নেই। মাধুরীর কথা বরাবরই এমনি কাউকে সে খাতির করে না।
মেজবৌদি উঠে গেল ভেতরে, মাধুরীকে ধরলো এসে মাঝ পথে বললো শোন ছোটদি, সুশীলকে গরু বানিয়ে ছাড়লি তুই।
: গরু খুব দামী জানোয়ার ওর অহঙ্কার হওয়া উচিত ওকে তো সম্মান করলাম।
: হ্যাঁ গাধা বলিসনি, এই ঢের।
মেজবৌদির পিছনে মেঝদা মাধুরীর কথাটা শুনতে পেলো কঠিন ভাবে বললো মানুষকে অত হতশ্রদ্ধা কেন করিস মাধুরী।
: ও মা, হতশ্রদ্ধা কই করলুম। গরু আমাদের পূজোর দেবতা, যজ্ঞের বলি, ওর গোবর অবধি মাথায় রাখি।
কথাগুলো এমন গভীর ভাবে বললো মাধুরী মেজদা, মেজবৌদি দুইজনেই হেসে ফেললো। অতঃপর হাসি সামলে মেজদা বললো
: বাড়িতে অতিথি এলে তাকে সম্মান করতে হবে বোনটি, এখন বড় হয়েছিস। উনি অতিথি নাকি? আমি ভেবেছিলাম আপনার লোক। তাহলে মাফ চাইছি গিয়ে বলে সটান ফিরে এসে সুশীলকে বললো।
: শুনুন সুশীলবাবু, আমি আপনার সঙ্গে রসিকতা করছিলাম আপনার লোক মনে করে, কিন্তু মেজদা বললেন, আপনি শুধু অতিথি, তাই ক্ষমা চাইতে এলাম, কিছু মনে করবেন না, বলেই চলে গেল।
: অবস্থাটা কিভাবে এনে কোথায় ঘোরাল, ভালো করে কেউ অনুভব করবার পূর্বেই সুশীল বললো, ওতো ঐ রকমই বলে, আপনি আবার ওকে ধমকাতে গেলেন কেন মেজদা। হাসি ফুটল সুশীলের মুখে, অর্থাৎ মাধুরী তাকে আপনার লোক ভেবে রসিকতা করেছে এটা সে বুঝে আনন্দ পাচ্ছে, বড়দা চা খেতে খেতে শুনলো সব, উঠে গেল ভেতরে। মাধুরী মার ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে।
বড়দা এসে ওর পিঠে হাত দিয়ে বললো—
লক্ষী দিদি সুশীলকে তোর কি রকম লাগে বল তো?
উনি অতিশয় ভাল ছেলে।
: অতিশয় কথাটা কেন বললি?
: মানে রূপে, গুণে, কুলে শীলে, আভিজাত্যে অহঙ্কারে আর—
: আর কি কি?
: আর মাধুরী আমতা আমতা করে আর তোমার এই বোনটিকে ক্যাপটিভিট করবার ক্যাঙালপনায়, বলেই বড়দার কোল ঘেঁষে দাঁড়ালো। তুমি আমাকে একটা অপদার্থ ধনীর ঘরের পুতুল সাজাতে ছাইছ বড়দা, বাপের টাকার সুট পরে ব্রীজ খেলতে এলেই মানুষ মহাপুরুষ হয় না, এম. এ. পাস করলেও চতুর্ভুজ হয় না। ওই তুলতুলে ননীর শরীর দিয়ে কুটোটি কাটবার যার শক্তি নেই, তাকে বিয়ে করে খাঁচায় পুরে রাখবার মত খাঁচা আমি পাই কোথা বড়দা, তুমি আমাকে ও কথা বল না।
: না না, তোর যাকে ইচ্ছে বিয়ে করবি, না হয় না করবি। বড়দা ওর মাথায় সস্নেহে হাত বুলাতে লাগলো।
বড়বৌদি বললো বিয়ে তোকে এবার করতেই হবে মাধু সুশীল হোক আর দুঃশাসন আমায় তোমরা তাড়াতে চাও বৌদি। মাধুরী অভিমান ভরে বললো কথাগুলো।
: আর না বড়দা বললে করবে না ও বিয়ে কি তার বয়ে যাবে? একটা মাত্র বোন ওর যা খুশি করবে কারো কিছু বলবার নেই তোমাদের। বলে বড়দা ওকে আরো কাছে টেনে আদর করে বললে, যেমন ইচ্ছে থাক, যখন খুশি যাকে খুশি বিয়ে করবি বলে বড়দা চলে গেল।
: কেমন হল। মাধুরী বড়বৌদির পানে চেয়ে বিদ্রূপ করলো।
: আচ্ছা দেখা যাবে বিয়ে না করে কদিন থাকতে পারিস। দাদাদের আদুরে বোন হয়ে চিরকাল চলে নারে ছোটদী, মেয়েদের দরকার সবল আশ্রয়।
: সেটা তোমার মত লতার জন্যে।
: আ তুই কি বনস্পতি শালবৃক্ষ নাকি।
: শাল না হতে পারি কোন আশ্রয় দরকার হবে না, আমি শালও নই, শৈবালও নই। আমি শ্মশানবাসিনী শ্যামা, বুঝলে?
বেশ তো, বৌদি হেসে বললো শিবঠাকুরটি এলেই তো হয়।
: আমার শিবঠাকুর ‘আসেন না তিনি নেশা করে শ্মশানে পড়ে থাকেন তাকে পেতে হলে সাধনা করতে হয়।
আচ্ছা দেখা যাবে তুই কি রকম সাধনা করিস।
দেখবে দেখিয়ে দেব।
হাসি আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠল মাধুরীর মুখে। কিন্তু এখানে আর দাঁড়ানো চলে না কেমন যেন লজ্জা করছে। চলে এল রায় বাড়িতে। সন্ধ্যায় গানের আসর বসবার আয়োজন করছে ছোটদা, মাধুরী তফাৎ থেকে দেখেই সরে পড়লো সুশীলবাবুর দিকে সে আর যেতে চায় না, লন এ মেজবৌদি খেলা আরম্ভ করেছে, অতএব ওখানে যেতে ইচ্ছে নেই, বড়দার অফিসে এল। টাইপে বসা মেমসাহেব ওকে দেখে গুড আফটারনুন জানিয়ে বাংলাতেই বললো আজকাল ছোটদির দেখা পাওয়া যায় না খুব ব্যস্ত আছেন বুঝি?
