: না, ব্যস্ত কিসের, মাধুরী বললো জবাবে আজকাল তুমি মহীনদের সঙ্গে গল্প কর কিনা, তাই আমি আসি না তোমাদের গল্পে ব্যাঘাত ঘটাতে চাইনা।
: মহীনদা। না, উনি গল্পতো করেন না। নিদারুণ কাজের লোক বলে একটু হাসলেন। মেমসাহেব বয়সের তুলনায় বড়ো। নো রোমান্স ইন হিম।
: তুমি মেমসাহেব একটি দ্বিতীয় শ্রেণীর গাধা, প্রথম হলেও কথা ছিল।
: কেন? মেমসাহেবের চোখে হাসি ফুটে উঠলো।
মহীনদাকে তুমি কি বুঝবে। আমাকেই সাতঘাটের পানি খেতে হয়। ওর রোমান্স শাড়ি ব্লাউজ সেণ্ডেলের কাছে ঘেঁষে যায় না হাইহিল রুজ লিপস্টিকেও না, ওর প্রেম অন্তরের গভীরে ঝঙ্কার তোলে যে আঁধার পাথরতলে রাজকন্যা রূপোর কাঠির ছোঁয়ায় ঘুমিয়ে আছে?
বুঝতে পারলাম না ছোটদি বলে মেমসাহেব হাসলো।
: থাকগে ও তোমার না বুঝলেও চলবে আচ্ছা, চলোম।
মাধুরী চলে এলো ওখান থেকে। মহীন এখানো ফেরেনি। গেল কোথা? গল্পটা দিতে গেছে হয়তো, কিম্বা নতুন কোন প্লট খুঁজতে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে। কোথায় কোন বাবা কাকা তার শিশুর জন্য লাটিম খুঁজে ফিরছে তার গল্প কিন্তু এতো করুণ এতা অপরূপ! এই অতি তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে ভাল সাহিত্য সৃষ্টি হয়? আশ্চর্য মাধুরী আপন মনে গুঞ্জন করলো।
তুমি কেমন করে কর হে গুণী।
আমি অবাক হয়ে শুনি, কেবল শুনি।
আসেন মহেন্দ্ৰ মুখোনা হাসিতে উজ্জ্বল। জুতোটা খুলতে খুলতে মাধুরী বললো ব্যাপার কি? অত খুশি খুশি।
: আন্দাজ করো।
: নতুন গল্প বেরিয়েছে?
: না।
: নতুন প্লট?
: না।
: তাহলে কোথাও কিছু টাকা পেয়ে থোকনের জন্য কিছু কিনেছ?
: তা নয় চাকর বনে এলেম।
: মানে চাকুরি পেয়েছে। কোথায়? কি চাকুরি?
: চাকরি পেলাম একটা সওদাগরী অফিসে। ওদের সাপ্লাই এর কাজ মাইনে ষাট টাকা।
: মাত্র ষাট। ওতে কি হবে?
: হয়ে যাবে। মাগগি ভাতা ইত্যাদি শ’খানেক চালিয়ে দেব কোন রকমে। এককাপ চা দাও মাধু, দাদাকে একখানা চিঠি লিখে দেই সুসংবাদ দিয়ে।
: এইটা নাকি সুসংবাদ। এতো আত্মহত্যার সামিল। মাধুরীর কণ্ঠে রুদ্ধ ক্রন্দন যেন।
: না এটা আত্মাকে আবিষ্কার করার সাধনা। আপনাকে খুঁজে পাওয়ার যোগাসন যেখানে
আমি সত্যিকার সেখানেই আমায় যেতে দাও মাধুরী।
: যাবে। মাধুরীর কণ্ঠ মলিন। ঐ সাধনা পীঠে সমাধি যেন না হয়।
: হবে না তো কি হবে।
: না। তীক্ষ্ণ তীব্র প্রতিবাদে মাধুরী, ও তোমার যাওয়া নয় বদরীকা যাবার পথে ওটা চটি মাত্র এ আমি জানি, জানি–
চলে গেল মাধুরী, মহেন্দ্র পোস্টকার্ড আর কলম নিয়ে বসেই রইল অনেকক্ষণ। চাকর দিয়ে চা খাবার পাঠিয়ে দিয়েছে মাধুরী নিজে সে এল না। ও ঘরে ছোট দার গানের আসর চলছে, হয়তো মাধুরী সেখানে আছে মহেন্দ্র চিঠি লিখে ডাকে দেবার ব্যবস্থা করে চাকুরি পাওয়ার খবরটা উমেশবাবুকে দিল গিয়ে! বৃদ্ধ খুব খুশি হলেন না, কিন্তু মহীন বললো আপাততঃ এইটা ধরা যাক, মেসও সে একটা ঠিক করে এসেছে শ্রীগোপাল মল্লিক লেনে চিলেকোঠার একটি ঘর। সকালেই সেখানে চলে যাবে। বড়দা এবং বড়বৌদিও কথাটা শুনলো। বড়দা হয়তো কিছু বলতো কিন্তু বড়বৌদি চোখ ইসারা করে তাকে থামিয়ে দিল।
নিজের ঘরে এসে মহীন লিখতে বসলো একটা গল্প। মাধুরীরর সঙ্গে ওর আর দেখা হয়নি কে জানে, কোথায় আছে। কিন্তু গল্পটা আর ভাল হচ্ছে না। ভাব ভাষা সব কেমন আড়ষ্ট বোধ হচ্ছে চাকরি পাওয়ার আনন্দটা নাকি। হবে, সাহিত্য দুঃখের আনন্দময় প্রকাশ, বেদনার অনুভূতি মুর্ত না হলে সাক্ষাৎ মেলেনা, মহেন্দ্ৰ কাগজ কলম গুটিয়ে পড়তে বসলো রবীন্দ্রনাথ। বড়দৌদি এসে ঢুকলো, বললো, এখানকার ভাত বিস্বাদ লাগছে ঠাকুরপো। এত তাড়াতাড়ি নাই মেসে গেলে। অফিসটা এখান থেকে করলে কি ক্ষতি ছিল?
এখানে থেকে অভ্যাসটা আর খারাপ করতে চাই না বৌদি। যেতেই যখন হবে–
: যেতেই হবে, এমন কথা ভাবছো ঠাকুরপো?
: মানুষকে ঘোয়া ভরে আকাশে তোলা যায় বৌদি, কিন্তু তার ঠাই আকাশে মানুষের বুদ্ধি থাকলে সে আকাশে উড়তো না?
: মানুষ আকশে উঠে আমাদের কিছু আনন্দ তো দেয় ঠাকুরপো।
: হ্যাঁ দেয়, কিন্তু তার নিজের সর্বনাশ করে, অঙ্গ জলে যায় আগুনে, বৌদি যার যেখানে ঠাই তাকে সেখানেই যেতে দিন।
: আমি জানি ঠাকুরপো কেন তুমি যেতে চাও, তোমার মতন বুদ্ধিমান ছেলে আমি জীবনে দেখিনি, কিন্তু আগুন যখন লাগে তখন পালিয়ে যেতে নেই, জল ঢেলে তাকে নিভাতে। হয়।
: হ্যাঁ বৌদি। কিন্তু আগুন না হয়ে ভূমিকম্প হলে পালিয়ে যাওয়াই বিধি।
: কথায় আমি পারবো না ঠাকুরপো। আমার অত বিদ্যে বুদ্ধি নেই, কিন্তু তোমার এ বাড়ি ছেড়ে না গেলেই ভাল হত।
: কেন বৌদি? মহন্দ্রে সাগ্রহে প্রশ্ন করলো।
বৌদি চলে গেল। মহেন্দ্র ওপরে গিয়ে খেয়ে এল। মাধুরী ছিল না ওখানে। ওর কলেজ খুলেছে পড়াশুনা করছে হয়তো। খেয়ে এসে মহেন্দ্র শুলো। সকালে উঠে চা খেয়ে যাবার আয়োজন করতে গিয়ে দেখলো মাধুরী কোত্থেকে একসেট বিছানা বালিশ একটা সুটকেস একটিন মাখন যোগাড় করে মহেন্দ্রের জিনিসপত্র গোছাচ্ছে। সে যেতেই বললো, তোমার মেসের নম্বরটা কত? আমার মাঝে মাঝে তো যেতে হবে সেখানে।
: যাবে বৈকি। বলে মহেন্দ্র নম্বরটা বলে দিল।
: শনি রবিবার এখানে আসবে তো?
: হ্যাঁ তা তো আসবোই।
সব গোছগাছ করে মাধুরী ক্লান্ত মুখ মুছে বললো, মাখন একটু করে খাবে দু’বেলা। কিসে যাবে ট্যাক্সিতে?
