মহেন্দ্র এলো, বসলো একধারে। নৌকাটা টলমল করছে ওদের ভারে কিন্তু পরে স্থির হলো। কেথায় একটি পাখি বৌ কথা কও’ ডাকছে। মাধুরী বললো তোমার খালি গলার গানও ভাল লাগে মহীনদা গাওনা একটা। গলা কোন সময়ই খালি নয় মাধুরী বিশ্ব জুড়ো অবিরাম যে শব্দ ধ্বনিত হচ্ছে ঋষি তাকে বলছেন ওঙ্কার নাব্রহ্ম। ঐ গাছের পাখি শুধু নয়, এই বাতস এই বনমর্মর এই জলকল্লোল, সবই সেই বিরাট সঙ্গীতের বাদ্যযন্ত্র শোন–
ওম, ও ও ও ও ও ম…।
সুরের গভীর ধ্বনি, যেন রূপ পরিগ্রহ করেছে আকাশে গিয়ে লয় হচ্ছে সেই ওঙ্কার নাদ অপূর্ব আশ্চর্য, কিন্তু অকস্মাৎ মহীন কেমন নীল হয়ে গেল। গানটা থামাতে ওর দেরী হচ্ছে কোন রকমে গান বন্ধ করে শ্বাস নিল।
–কি হল মহীনদা?
: কিছু না, দাদা ছোটবেলা শেখাতেন, অনেকদিন অভ্যাস নাই, বলে মহীন কয়েক আযলা জল তুলে মুখে দিল। সুস্থ হতে যেন সময় লাগছে ওর। মাধুরী বলল তোমার মাতৃত্বের রূপটা এতা প্রকট, মাধুরী আমি অবাক হয়ে যাই অনেক সময়। কি রকম? মাধুরী প্রশ্ন করলো।
–মেয়েরা মূলতঃ দুই জাতের। এক প্রণয়িনী স্বভাবা আর এক মাত্ররূপী, তুমি শেষেরটা?
: মোটেই না, আমি দারুণ প্রণয়িনী স্বভাবা, আমাকে ঘিরে সোসাইটতে অবিশ্রাম জলতরঙ্গ বাজে জানো তো কচু!
ওটা তোমার বাইরের খোলস অন্তরে তুমি মা! চল, ওঠো। মহীন উঠলো।
: হবে।
মাধুরী যেন নিবে গেছে, এতোটুকু প্রতিবাদ করলো না। নেমে লিচু গাছের তলায় মহীনের অঙ্গ ধরে বললো আচ্ছা, দুটোর মধ্যে কোনটা ভালো, মাতৃস্বভাবা নাকি প্রণয়িনী স্বভাবা?
: প্রেম যদি সত্য হয়, তাহলে তার থেকে বড় কিছু নাই মাধুরী সে অন্তরের লীলা। বিলাসের চারণভূমি, সে তোমার ক্ষেত্র কিন্তু সে প্রেম সুদুর্লভ সে প্রেম সুপ্ত সে প্রেম খনির সোনা তাকে হাটে বাজারে পাওয়া যায় না। আর মাতৃরূপ পৃথিবীতে বড় দরকার, যেমন–
: ইস্পাত হেসে ব্যঙ্গ করলো মাধুরী। না ইস্পাত আমি বেলতে চাই না। যেমন আকাশের বৃষ্টি মাটির শস্য মায়ের জন্য।
: তাহলেও বড় কিন্তু প্রেমিকাই তোমার মতে?
হ্যাঁ কিন্তু প্রেম অপার্থিব সে প্রেম অন্তরের সেখানে দেহ বিলাসে কোন প্রশ্ন নাই চল, দেরী হয়ে যাচ্ছে। মাধুরী যেন গম্ভীর হয়ে কত কি ভাবতে লাগলো। মহীনের অন্তরঃস্থল খুঁজবার ব্যথা সে ভেবেছিল একটু আগে, এই চেষ্টা করে কি ফল হবে তার? একি অসীম একটা অনুভূতিময় প্রাণ মাধুরী যেন কুল পাচ্ছে না। এই পর্যন্ত এই ধরণের কথা কারো মুখে শোনেনি কথার ফুলঝুরি খেলে ওর দাদার বন্ধুগণ রাজনীতি, অর্থনীতিতে বিশেষজ্ঞ সুর তরুণ পাশ্চাত্য উপন্যাসের পাত্রপাত্রীদের আইডিয়ায় ভরপুর, অশ্লীল আর অসুন্দর শিল্পের বিকৃত পুজকদের দল আসে।
যার আপনাকে প্রকাশ করার সহস্র ভঙ্গিমায় আবেদন জানায় যেন ভিক্ষুক। আর মহীনদা যেন অটল গম্ভীর হিমাচল, ওর প্রতি বন্দনে ঝঙ্কার ধ্বনি স্পন্দিত হচ্ছে।
–ওর আত্ম প্রকাশের প্রচেস্টা নেই, ও স্বতঃ প্রকাশমান সূর্য।
–এই যে, রাস্তা ভুল করছো? মহেন্দ্র ডাক দিল?
: না মহীনদা, এই ফুলটা তুলোম বোটা ছেঁড়া একটি ফুল মাধুরী এগিয়ে এলো দেখতে কি ফুল। আমি তো চিনি না–
: আমিও না কিন্তু নামের কি দরকার। ও নিজেই ওর পরিচয়।
: তা কি হয়। দেখতে সুন্দর, গন্ধাটাও বেশ মিষ্টি একটি নাম হলে
: নামের মিষ্টিটা ততক্ষণ ওকে চেননি নাম না জানা ফুল আরো বেশী মিষ্টি মধুরী ওর রহস্যতেই ওকে থাকতে দাও
: তাহলে মালীকে শুধোব নামটা।
: নাই বা শুধোলে ওর নাম জবা, কবরী অথবা ডালিয়া, ডায়স্থাস গোছের কিছু একটা হবে সেইটাকে অতবড় করে দেখছো কেন?
: এররূপ রস গন্ধের সঙ্গে নামটিও যোগ করতে চাইনি।
: না ওর রহস্যকে অবগুণ্ঠিত করো না, হাজার ফুলের নাম তো জান ওর নাম নাই বা জানলে।
তাহলে এর নাম রইল নাম না ও শুধু রইল আমাদের আজকের বেড়ানোর সাক্ষী হয়ে আচ্ছা তাই বলে হাসলো মাধুরী।
৪. উমেশবাবু স্বয়ং কোনো কাজ করেন না
উমেশবাবু স্বয়ং কোনো কাজ করেন না, বড় ছেলেই সব দেখে শোনে, তবে ছেলে এমন যে বাবার মত ছাড়া এক পা চলে না। বর্তমান যুগেও পিতা হিসেবে উমেশবাবুর গর্ব করার মতো তার ছেলেরা। গিন্নিও নিজের পূজা পার্বণ নিয়ে থাকেন ওদিকে বড়বৌ সব দেখাশোনা করে কিন্তু মাধুরীর বিয়ের কথাটা উমেশবাবুকে আর গিন্নিকে ভাবতে হয়।
মেয়ে বড় হয়েছে, এবার যোগ্যপাত্রে তাকে সম্প্রদান করা দরকার। কুমার নৃপেন্দ্র নারায়ণ অবশ্য বাড়িতে আসেন পাত্র হিসাবে যতেষ্ট যোগ্যতা তার। কিন্তু মাধুরী তার কাছে ঘেঁষে না অতএব উমেশবাবু ও কথা ভাববেন না। হঠাৎ সেদিন অন্য একটি ছেলে এল ছেলেটি যতীনের বন্ধু নাম সুশীল বড় লোকের ছেলে এম. এ. পাস, ভালো গাইতে পারে। মাঝে মাঝে আসে এখানে গান গায় ব্রিজ খেলে। হঠাৎ এলো সে বিকাল বেলা। কুশলাদি প্রশ্নের পর রতীন তাকে নিয়ে বসলো নিজের গান বাজনার ঘরটায়। মহেন্দ্র বাড়ি নাই, কোথায় গেছে কে জানে, অতএব মেজবৌদি, মেজদা রতীন আর সুশীল ব্রীজ খেলতে বসলো সন্ধ্যার পর গান হবে। খেলা চলছে, অকস্মাৎ মাধুরী এসে ঢুকলো বৈকালিক প্রসাধন সেরে! চা দেবে সকলকে। সুশীল তাকে দেখে নমস্কার জানিয়ে বলল……..
: তাস আর খেলা চলে না, এবার মাধুরী দেবী একটা গান শোনান।
