—তুই বন্ধুর দিকটা বেশী মমতায় দেখছি শিখা, দাদার দিকটা তেমনি দ্যা দেখি। মিঃ ব্যানার্জির কোলে মাথা রেখে সে দাদাকে বুঝিয়ে দিয়েছে মুক্তিই সে চায়, দাদাকে চায় না। সেদিনের সে-চাওয়ায় তার কোনো ছলনা ছিল না। ছিল সত্য, সহজ চাওয়া।
–কিন্তু আজ সে আবার দাদাকে চাইছে কেন? ভালবাসছে বলেই তো।
—ও প্রেম অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী, শিখা! দাদা চলে যাওয়ায় ওর নারী গর্বে আঘাত লেগেছে। দাদাকে ও বশ করতে পারলো না বলেই এই আকুতি ওর: তুই এত পড়াশুনা করেছিস এসব কিছু বুঝিস নে। উপেক্ষা সইতে পারে না নারী-হৃদয়। দাদাকে পেলে ও আবার অপমান করবে।
—কিন্তু এবার বিরহের আগুনে খাঁটি হয়ে ও দাদাকে সত্যি ভালবাসতে পারে তো?
—সেদিন যেন না আসে, শিখা, সে-কামনা আর করিস নে। ও যাক।
শিখা চুপ করিয়া গেল। তপতীর অদৃষ্টের নির্মমতা তাহাকে অত্যন্ত বিমনা করিয়া তুলিছে! তপনের জন্যও মন কাঁদে, কিন্তু তপন অসাধারণ শক্তিমান মানুষ, সমস্ত দুঃখ সে সহ্য করিতে পারিবে; কিন্তু তপতী—যদি সত্যিই সে তপনকে আবার ভালবাসে তবে তাহার জীবন দুঃখের অমানিশার চেয়ে কালো।
–বিনুদার খবর কি রে? কত গরু হলো তোর গোয়ালে?…মীরা প্রশ্ন করিল।
—তা হাজারখানেক। আমি রোজই যাই ওঁর সঙ্গে দমদম। আজ তুই আসবি বলে গেলাম না।
-দুজনেই তোরা অত গরুর যত্ন করিস্! দুধটা কি করিস ভাই :
-যত্ন করবার লোক রয়েছে। দুধটা বিক্রী করা হয়, এক-চতুর্থাংশ বিলি করা হয় শিশু আর রোগীদের। গোবরে হয় দাদার চাষ-বাড়ির সার। খাঁটি দুধ পাওয়া যায় না বলে দুধের চাষ করা, ভাই! দেশের লোক দুধ খেয়ে বাঁচুক।
আমার ওঁকে দাদা আদেশ করেছেন, বিনে-মাইনের স্কুল-কলেজ করতে। খরচ অবশ্য দাদার সমস্ত উপার্জন, আমাদের আয় আর দেশের বড়লোকদের তহবিল থেকে আসবে। কিন্তু পড়ানো হবে খাঁটি বৈদিক প্রথায়, আর ছাত্র হবে যাদের এক পয়সা দেবার সমর্থ নেই। আর নারী-বিভাগের কর্মী হবে তুই আর আমি। দাদার মনে কষ্ট আছে, পয়সার অভাবে কলেজে পড়তে পায়নি। তাই গরীবদের জন্যই তার স্কুল কলেজ, কোন বড়লোকের ছেলেমেয়ে সেখানে ঠাঁই পাবে না।
শিখাও কথাটার কিছু কিছু জানিত। বলিল, আরম্ভ হোক, আমরা তো আছিই।
–হয়ে গেছে আরম্ভ। শিবপুরে আমাদের যে হাজার বিঘে পতিত জমি ছিল, সেখানে পাঁচশো খোলার কুঁড়ে ঘর তৈরী হয়েছে। গেটে লেখা হয়েছে–
সবার উপর মানুষ সত্য,—তাহার উপর নাই।
মানুষের মাঝে, হে মানুষ—তুমি তোরে দিয়ো ঠাঁই।
শেষের লাইনটা অবশ্য দাদার রচনা—মীরা আপন মনে হাসিয়া উঠিল।
শিখা মীরার মনের তল পাইতেছেনা! তপতী-ভাগ্য-বিপর্যয়ে ব্যথিত শিখা মীরার হাস্য শুনিয়া কহিল,—মীরা, দাদা মহীয়ান, এ কথা তুই জানি, আমিও জানি। কিন্তু তপতীর জন্য তোর মন কি এতটুকু বিচলিত হচ্ছে না আজ?
মীরা মিনিটখানের চুপ করিয়া রহিল; তারপর বলিল,–সে কথা তোকে অনেকক্ষণ বলেছি সখী, ঠাট্টা করেই আজ ওড়াতে চাইছি আমার সেই একান্ত আপনার কথাটা!—তাহার কণ্ঠস্বরে শিখা চকিত হইয়া চাহিয়া দেখিল, মীরার দুই গণ্ড অশ্রুতে প্লাবিত হইয়া গিয়াছে।
মার মনে যে আশাটুকুও ছিল, তাহা একেবারে নিভিয়া গিয়াছে। স্বামীকে সমস্ত জানাইতে তিনিও কিছুক্ষণ নির্বাক থাকিয়া ধীরে ধীরে চলিয়া গেলেন। তপতী মা বাবার সম্মুখে আসাটা এড়াইয়া যাইতেছে। কিন্তু এমন করিয়া দিন চলা কঠিন। পূজায় কলেজ বন্ধ হইলে পিত কন্যাকে ডাকিয়া বলিলেন,–যা হবার হয়ে গেছে; তুই ভালো করে পড়াশুনা কর।
যদি নিতান্তই সে না ফেরে, তখন অন্য পথ দেখা যাবে…
তপতী চুপ করিয়া রহিল। বাবা তপনকে অত্যন্ত স্নেহ করিতেন, ইহা সে জানে। বাবা আবার বলিলেন,—তুই আমাদের একমাত্র মেয়ে, তোর সুখের জন্য আমরা সবাই করিতে পারি, খুকী—তোর আবার বিয়ে দেব–
কথাটা বলিয়া যেন মিঃ চ্যাটার্জী চমকিয়া উঠিলেন।
তপতী এখন কোনো কথা কহিল না দেখিয়া তিনি আঙুর ফল টক এই নীতি অনুসরণ কবিবার জন্যই বোধহয়, এবং তপতীর নিকট তপনকে এখন খাটো করিবার জন্যই হয়তো বলিয়া উঠিলেন,—এতো গোঁয়ার সে জানলে কি বিয়ে দিতাম। আমারই বোকামী।
মা কথাটা কিন্তু সমর্থন করিতে পারিলেন না, নীরবেই বসিয়া রহিলেন।
—কাপড়-চোপড় গুছাইয়া তপতী শিলং যাইবার জন্য প্রস্তুত হইল। নাই যদি আসে তপন, কী সে করিতে পারে! তপনকে পাইলে হয়তো সে সুখীই হইতে পারিত, কিন্তু যদি একান্তই না পাওয়া যায় তো তপতী কি তাহার পিতামাতার বুকে শেলাঘাত করিয়া বিধবার মতো বসিয়া রহিবে! এই কয়দিন ধরিয়া তপতী বারংবার এই চিন্তাই করিয়াছে। যে লোক একটা দিনের জন্য এতটুকু রাগ দেখায় নাই, একটু প্রতিবাদমাত্র করে নাই, সে কিনা একেবারে অকস্মাৎ সমস্ত ছাড়িয়া চলিয়া গেল! তপতী ইহা বিশ্বাস করিতে পারিতেছে না। তাহার পিতার কোটি মুদ্রা মূল্যের সম্পত্তি, তাহার অতুলনীয় রূপগুণ, তাহার মাতার এত যত্ন আদর কিছুই কি তপনকে এখানে ফিরিয়া আনিতে পারে না। থাক, ফিরিবার দরকার নাই, তপতী তাহার ভাগ্য বিধাতার উপরেই নির্ভর করিয়া চলিবে। কিছুই ভয়ঙ্কর অপরাধ তপতী করে নাই, যাহার জন্য তপন তাহাকে এমনভাবে ত্যাগ করিতে পারে। অকস্মাৎ তপতীর মনে পড়িল তপনের কথাটা—ত্যাগ মানে মুক্তি, ক্ষুদ্র থেকে বৃহতে লঘিষ্ট থেকে গরীয়ানে। হ্যাঁ, মুক্তিই সে তাহাকে দিয়া গেছে। বেশ তপতী চলিয়া যাইবে।
১০. শিলং-এ আসিয়াই আলাপ
শিলং-এ আসিয়াই আলাপ হইল মিঃ রায়ের সহিত। রূপবান্ যুবক। সঙ্গীতে তাহাব অসমান্য অনুরাগ; আই-এ-এস্ পাশ করিয়া আসিয়াছেন, শীঘ্রই কার্যে যোগদান করিবেন।
