মা বুঝিলেন, তপতী বহু দূর আগাইয়া গিয়াছে। তপতী করুণকণ্ঠে কহিল,–প্ল্যানটা আমার নয়, মা, মিঃ ব্যানার্জি বলেছিলেন একদিন–
–বেশ! রাজী হোন-গে এবার–মীরা আরো খানিকটা চলিয়া গেল।
মা মীরাকে কোনরূপে একবার তপতীর বাবার নিকট লইয়া যাইবার জন্য হাত ধরিয়া বলিলেন,–তুমি একবার আমার বাড়ি চলো, মা, ওর বাবাকে সব কথা বলে গিয়ে–
–কিছুমাত্র প্রয়োজন নেই, মা, যার সঙ্গে খুশি আপনার খুকীর বিয়ে দিন-গে—
—হিন্দুমেয়ের কি দুবার বিয়ে হয়, মা?
—খুব হয়। আপনাদের আবার হিন্দুত্ব। হিন্দু, খ্রীষ্টান, মুসলমান—আপনারা কিছু নন।
–যাবে না, মা একবার? চলো–লক্ষ্মী মেয়ে আমার, চলো!
—যেতে পারবো না-মাপ করবেন। যে বাড়িতে আমার দাদার অসম্মান হয়, সে বাড়ির ছায়াও আমি মাড়াইনে।
–তোমার দাদা তাহলে নিশ্চয় ফিরবে না?
—আমার দাদা আপনার ধন-দৌলতের প্রত্যাশী নয়। আপনার সঙ্গে আর কী সম্পর্ক অর?
ক্রোধে অকস্মাৎ তপতী জ্ঞানহারা হইয়া উঠিল। এই ভণ্ডামী তাহার অসহ্য। বলিল—দুলাখ টাকা বুঝি খোলামকুচি? সেটা গ্রহণ করতে তত বাধেনি?
হাসিতে মীরা ফাটিয়া যাইবে কেন! হাসি থামিলে-বলিল—ঐ দুলাখ টাকা আপনার দ্বিতীয় বিয়েতে যৌতুক দিয়ে আসবো গিয়ে।
শিখা স্নানকণ্ঠে কহিল,—ছিঃ তপি, টাকার কথাটা তুলতে পোর লজ্জা করলো না?
মীরা গিয়ে গাড়ীতে উঠিয়া ডাকিল-আয় রে শিখা? শিখাও চলিয়া যাইতেছে! মা ছুটিয়া আসিয়া তপতীকে কহিলেন,–তুই নিজে একবার ডাক, খুকী! যন্ত্রচালিতের মতো তপতী গিয়া মীরার হাত ধরিল; বলিল—আসুন—চলুন আমাদের ওখানে
সরোষে মীরা গর্জন করিয়া উঠিল, ছেড়ে দিন। আপনাকে ছুঁলে গঙ্গা নাইতে হয়। অকস্মাৎ ক্রোধে তপতীর আপাদমস্তক জ্বলিয়া উঠিল। কী এমন সে করিয়াছে যাহাতে তাহাকে ছুঁলে গঙ্গানাইতে হইবে?
সক্রোধে সে বলিয়া উঠিল,—যান যান, আপনার দাদা না এলেও আমার চলবে। গাড়ীটায় স্টার্ট দিয়া স্টিয়ারিংটা ধরিয়া মীরা অত্যন্ত সহজ সুরে কহিল,–তাই চলুক–
তোমার যে দেখিবারে পায় অসীম ক্ষমায়
ভালো-মন্দ মিলায়ে সকলি,
এবার পূজায় তারি আপনারে দিয়ো তুমি বলি!…
মীরা কি তাহাকে আশীর্বাদ করিয়া যাইতেছে! তাহার শান্ত কণ্ঠস্বর তপতীকে অভিভূত করিয়া দিল। এই অত্যন্ত কোপন স্বভাবা মেয়েটি এত সহজে তাহাকে কবিতা বলিয়া আশীর্বাদ করিতে পারে। মীরার হাতটা পুনরায় ধরিতে গিয়া তপতী বলিল,–যাবেন না একবার?
হাতটা সরাইয়া গাড়ীখানা চালাইয়া দিতে দিতে মারা কহিল,—না, এখনও আমার সময় হয়নি। সময় যেদিন আসিবে আপনি যাইব তোমার কুঞ্জে!
শিখা ও মীরা এক গাড়ীতেই চলিয়া গেল। মা তপতীর সঙ্গে কথা বলিতেও বিরক্তি বোধ করিতেছেন আজ। কী ভয়ানক কাণ্ড তপতী করিয়াছে, অথচ কিছুই তাহারা জানেন। তপতী আসিয়া গাড়ীতে উঠিয়া এককোণে বসিল। মা বুঝিলেন, কথা সে আর কহিবে। বাড়ি যাইবার জন্য তিনিও গাড়ীতে উঠিলেন।
গাড়ীতে যাইতে যাইতে শিখা কহিল,—তপতী কিন্তু একেবারে বদলে গেছে, মীরা বড্ড রোগা হয়ে গেছে মেয়েটা।
একটুও বদলায়নি। তুই জানিস কচু। ও মেয়ে অত শীগ্গীর বদলাবে!
-কিন্তু যদি সত্যি বদলায়, তাহলে কি দাদা নেবে ওকে আবার?–না সে অসম্ভব। ও অন্য কাউকে বিয়ে করলেই আমাদের ভালো হয়।
শিখা চুপ করিয়া রহিল। কিছুক্ষণ পরে পুনরায় কহিল, দাদা যে নীল গোলাপ ফুটালো—যার জন্য কৃষি-প্রদর্শনী ওকে প্রথম পুরস্কার দিয়েছে, সে গোলাপের নাম নীল গোলাপ কেন দিল জানি?
–না ভাই, জানি না তো!মীরা চাহিল শিখার দিকে।
–তপতীর মার নাম নীলা ওঁর নামটা দাদা অমর করে দিল।
–ওঃ! দাদা একদিন বলেছিল,–শাশুড়ীর স্নেহঋণ কি দিয়ে শুধবো, মীরা—তাই চাষ করতে আরম্ভ করেছি। তাই বুঝি নীল গোলাপ।
উভয়েই চুপ করিয়া রহিল কিছুক্ষণ। মীরাই কথা কহিল,—পুরস্কারের টাকাটা দাদা বোটানী শিক্ষায় দান করেছে।
–আমাকে লিখেছে চিঠিতে। কিন্তু বিদেশে দাদা আর কতদিন থাকবে রে?
–কাজ হয়ে গেছে। এবার ফিরবে, এই মাসেই; দুজনে একসঙ্গে দেশে যাবো।
মীরার মুখ আনন্দে উজ্জ্বল হইতে গিয়া করুণ হইয়া গেল। বলিল, ঐ হতভাগীটাও যেতে পারতো। শিখা, আজ ঠাট্টা করে উড়াই সখী, নিজের কথাটাই! …কেঁদে কি করবো বল? আমার কতদিনের সাধ, দাদা গল্প বলবে, তার ডানদিকে থাকবো আমি বাঁদিকে বৌদিদি-দুজনায় ঝগড়া করবো আবার ভাব করব!…সুদীর্ঘ নিঃশ্বাসটা মীরা আর চাপিতে পারিল না।
শিখার দুই চোখে জল টলমল করিতেছে। মুছিয়া আস্তে কহিল,—বিয়ের সময় আমি থাকলে এমনটা হোত না। ওর বন্ধুগুলোই ওকে ভুলপথে চালিয়েছে তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে। কিন্তু আমার আশা ছিল, ওর মা ওকে সামলে নেবেন।
—ছন্নমতিকে কেউ সামলাতে পারে না, শিখা। ওর পতন বোধহয় বিয়ের পূর্বেই হয়েছে-ও আর পবিত্র নেই, মনে হয়।
–আমি কিন্তু তা মনে করিনে, মীরা! ওর বাল্যজীবন বড় সুন্দর। আর ও বন্ধুদের কেবল খেলিয়ে নিয়ে বেড়াতো। কেউ ওর মন কোনদিন এতটুকুও টানতে পারেনি। আজও যে ও কাউকে ভালবাসে তা বিশ্বাস হয় না…হয়তো সে…
বাধা দিয়ে মীরা বলিল,–তাতে ক্ষতি বেশী আমাদের। ও বিয়ে না করলে দাদা শাস্তি পাবে না। দাদা ওকে নেবে না, এ সূর্যের মতো সত্য—ভালবেসে ও মরে গেলেও নয়। দাদার সত্য কিছুর জন্য ভাঙে না, শিখা, একথা তুই-ও তো জেনেছিস।
—হুঁ, বলিয়া কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল। তারপর ধীর কণ্ঠে কহিল,—দাদা মুক্তিটা দিলেই পারতো। অত শীগগীর কেন দিল ভাই?
