মিঃ চ্যাটার্জী সাদরে তাহাকে ডাকিয়া আনিয়া কন্যার সহিত আলাপ করাইয়া দিলেন। তপতী মাকে বলিয়াছে,—যদি সে একান্তই না আসে —আমাকে বিবাহিতা বলে পরিচয় দেবার কি দরকার এখানে—মা-বাবা কোনো উত্তর দেন নাই। তপতী মিস চ্যাটার্জী নামেই সম্বােধিতা হইতেছে। মিঃ রায়ও তাহাই জানিয়া রহিলেন।
কয়েদিনের মধ্যেই মিঃ রায়-এর অসামান্য বাকপটুতা, অনুপম সঙ্গীত কুশলতা এবং বিলাতী ধরণধারণের গুণে তপতীর জুবাক্রান্ত মনটা শীতলতার দিকে নামিতে লাগিল। রোজই তাহারা দল বাঁধিয়ে বেড়াইতে যায়—পাহাড়ের গাম্ভীর্য, ঝরণার চাপল্য, পাইন বনের শ্যামল সুষমা চোখ জুড়াইয়া দেয়, মন ভরাইয়া তুলে।
পূজার সময় শিলং-প্রবাসী বাঙালীগণ একটি অভিনয়ের ব্যবস্থা করিয়াছেন; তপতী দুদিনেই তাহার নেত্রী হইয়া পড়িল। এসব কাজে সে চিরদিন দক্ষ। তাহার পটুতা মিঃ রায় দুই চোখ ভরিয়া দেখেন আর বলেন-দি এঞ্জেল অব পাইন-বন-দি ডিভাইন নাইটিংগেল …
তপতী রুমাল দিয়া তার গায়ে হাল্কা আঘাত করিয়া বলে নটি বয়!…
অভিনয়ের আয়োজন সমারোহে চলিতেছে; বিজয়ার দিন অভিনয়। কল্যাণী দেবী কহিল, মিস চ্যাটার্জীর সঙ্গে মিঃ রায়ের বিয়ের দৃশ্যটা বড্ড হাসির।
–কেন?–প্রশ্ন করিল তপতী।
—মিঃ রায় বিলেতে কিছু করে এসেছেন কিনা, কে জানে।
–অভিনয়ে তার কি ক্ষতি হবে?–তপতী রুস্বরে প্রশ্ন করিল।
–অভিনয়টা মাঝে মাঝে সত্য হয়ে ওঠে কিনা?—কথাটা বলিয়া কল্যাণী হাসিল।
—আপনার কথাটাকে সত্যের মর্যাদা যদি উনি দেন, কল্যাণী দেবী, তাহলে আমি আপনাকে নিজের খরচে বিলেত পাঠাব এনকোয়ারী করতে বলিলেন মিঃ রায়।
মিঃ রায়ের এই কথায় সবাই হাসিল।
কল্যাণী কহিল,—আপনি তো বেশ চালাক। আমার কথাটাকে ঘুরিয়ে ওর কাছে প্রপোজ করে বসলেন? বুদ্ধি আপনার সত্যি হাকিমের মতো।
অতসী কহিল,হাকিমের আর দরকার হবে না, হুকুম তামিল করবেন এবার থেকে।
তপতী একক্ষণ চুপ করিয়াই ছিল; হঠাৎ একটু তীক্ষ্মস্বরেই কহিল,–ঠাকুরদা বলতো—যার বিয়ে তার মনে নেই, পাড়াপড়শীর ঘুম নেই? আপনাদের দেখছি সেই অবস্থা! কিন্তু আমার একটা কথা আছে।
সমস্বরে প্রশ্ন হইল—কি?
—বিয়ের দৃশ্যটা বাদ না দিলে নাটকের মর্যাদা থাকবে না। বিয়ের বন্ধনে ঐ নায়কনায়িকাকে বাঁধা যায় না। নাট্যকার বিয়ের কথাটা মোটে লেখেননি।
–নাটকটা ভালো বলেই আমরা নিয়েছি। কিন্তু পুজোর দিন একটা করুণ নাটক!
তপতী তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল,–এই জগতে বহু মানুষের মনে ওর থেকে ঢের বেশী করুণ নাটকের অভিনয় হচ্ছে
প্রস্তাব পাস হইয়া গেল। অর্থাৎ তপতীর কথার প্রতিবাদ করিতে কেউ উৎসাহ দেখাইল না। তপতীর এরকম কথার উদ্দেশ্য কিন্তু মিঃ রায় বুঝিলেন না। মিলনের দৃশ্যটা তিনিই লিখিয়াছেন। তাহার লিখিত অংশটুকুকেই তপতী পরিত্যাগ করিল কেন?
তপতীকে বাড়ী পৌঁছাইবার পথে একখণ্ড শিলাসনে বসিয়া তিনি প্রশ্ন কবিলেন, বিয়ের দৃশ্যটা কেন বাদ দিলেন, মিস চ্যাটার্জী?
তপতী আর্টের দোহাই দিয়া কহিল,–ও বই কেন ধরলেন? আর কি বই ছিল না? জ্যোতি গোস্বামীর বই অভিনয় করা অত্যন্ত কঠিন।
বহুদিনের বিরহের পর প্রিয় মিলনের দৃশ্যটা ভালই জমতো।
না, জমতো না। যাদের এতটুকু কলারস জ্ঞান আছে, তারা বলবে নাটকটাকে খুন করা হয়েছে।
কিছুক্ষণ মিঃ রায় চুপ করিয়া রহিলেন। বহুদিন তিনি বিলাতে থাকায় বাংলা সাহিত্য সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানেন না; প্রশ্ন করিলেন, জ্যোতি গোস্বামী পুরুষ না মেয়ে? খুব ভালো লেখে বুঝি?
জানি না। কিন্তু লেখে অদ্ভুত। বই এর নামও অদ্ভুত মুক্তির বন্ধন।
মিঃ রায় আশ্বস্ত হইলেন। আর্ট না ক্ষুন্ন করার জন্যই বোধ হয়, তপতী তাহার লিখিত অংশটি হাঁটিয়া দিল, তপতীর হাতের মালা তিনি সেদিন পাইবেন না। বাট ইফ গ্রেশাস গড্ উইলস..
বাড়ি ফিরিয়া আপন কক্ষে একাকী বসিয়া তপতী ভাবিতে লাগিল, মিঃ রায় বেশ সুন্দর ছেলে। উহাকে বিবাহ করা যাইতে পারে, অবশ্য তার পূর্বে তপনের সহিত বিবাহ-বিচ্ছেদটা আইন-সিদ্ধ করা দরকার। যে আশা সে এতকাল পোষণ করিয়াছে, তপনকে তাড়াইয়া তাহাই ফলবতী হইয়া উঠিল! এ ভালোই হইল। তপনের মতো একজন নিতান্ত গোঁড়া অদ্ভুত-প্রকৃতির লোক লইয়া সে করিবে কি? তাহার বর্তমানের শিক্ষা-দীক্ষা মোটেই তপনের উপযুক্ত নয়। মিঃ রায়ই তাহার ভালো।
কিন্তু এত তাড়াতাড়ি করিবার কি আছে? কলিকাতা গিয়া আগে বিবাহ বিচ্ছেদটি পাকা করিয়া লওয়া যাক—তারপর মিঃ রায়কে আরো একটু ভালো করিয়া বোঝা যাক, এম, এ পড়াটাও শেষ হইয়া যাক—পরে দেখা যাইবে।
মিঃ রায় কিন্তু বড়ই ব্যস্ত হইয়াছেন। আজই তো তিনি প্রায় বলিয়া ফেলিয়াছেন। ইহার মূলে শুধুই কী তপতীর রূপগুণ? না, আরো কিছু আছে, তাহার বাবার টাকা, যে, টাকা জন্য তপনকে তাড়াইয়া দিয়াছে তপতী! কিন্তু এ ভাবনাও ভাবিয়া লাভ নাই। যে তাহাকে বিবাহ করিবে, সেই তাহার বাবার টাকা পাইবে। মিঃ রায় কৃতবিদ্য ব্যক্তি, তিনি তো অশিক্ষিত তপন নন! টাকার তোয়াক্কা তিনি নিশ্চয়ই রাখেন না! মুখে পাউডারের পাফটা আর-একবার বুলাইয়া লইয়া ৩গতী মার কাছে আসিল।
মা কন্যার পরিবর্তন লক্ষ্য করিতেছে, কহিলেন,–ততার গলায় ইংরাজী গানগুলো বেশ মিষ্টি লাগে, খুকী! কটা শিখলি?
—শিখেছি তিন চারটা। মিঃ রায়ের শেখাবার পদ্ধতিটা বেশ মা, চটপট শেখা যায়।
মা খুশী হইয়া কহিলেন, বেশ ছেলেটি। কথাবার্তা চালচলন চমৎকার। তপতী বিদ্রূপ করিয়া কহিল, তোমার তপনের চেয়ে নাকি! মা ব্যথিত হইয়া কহিলেন, তার কথা কেন, খুকী। সে তো সব ছেড়ে চলে গেছে।
