তপতীর কণ্ঠস্বরে মা অত্যন্ত ভীত হইয়া পড়িলেন। প্রশ্ন করিলেন,—এমন করে কথা বলছিস্ : চিঠি না-পেলে কি অত করে কাদে?
—ঠাকুরদা আমায় ঠকায়নি, মা-ঠকায়নি গো, ঠকায়নি!–বলিতে বলিতে তপতী ছুটিয়া গিয়া পড়িল পিতামহের প্রকাণ্ড অয়েল পেন্টিংটার পদপ্রান্তে।
বিমূঢ়া মাতা কিছুই বুঝিতে না পারি ব্যথিত মনে দাঁড়াইয়া রহিলেন। স্নেহময় পিতা ছুটিয়া আসিয়া হাজার প্রশ্নে তপতীকে বিভ্রান্ত করিতে চাহিলেন–কিন্তু তপতীর মুখ হইতে শুধু একটিমাত্র কথাই বাহির হইল,–ও আর আসবে না মা, আসবে না…।
দিনের পর দিন করিয়া দীর্ঘ দুইমাস অতীত হইয়া গেল, না আসিল তপন, না-বা তাহার চিঠি। প্রতীক্ষমান তপতী ম্লান হইতে ম্লানতরা হইয়া উঠিয়াছে। বিশুষ্কা বিবর্ণা হইয়া উঠিয়াছে তাহার রক্তাভ কপোলতল। তপতী আশা ছাড়িয়া দিয়াছে তপনের, মিঃ চ্যাটার্জীও আর আশা করেন না, কিন্তু তপতীর মা এখনও আশায় বুক বাঁধিয়া আছেন—তপন তাহার ফিরিয়া আসিবে। এমন ছেলে, হৃদয়ে যাহার অতখানি কোমলতা, সে কি তাহার বিবাহিত পত্নীকে ত্যাগ করিতে পারে! নিশ্চয় ফিরিয়া আসিবে। হয়তো কোনো বিপাকে পড়িয়াছে। হয়তো অসুস্থ হইয়াছে—হয়তো…না, মা আর অধিক ভাবিতে পারেন না।
তপতীকে প্রশ্ন করা বৃথা; সে কাদে না পর্যন্ত, উদাসদৃষ্টিতে মাঠের দিকে চাহিয়া থাকে। বাবা একদিন ডাকিয়া বলিলেন,—চল্ খুকী পূজার বন্ধে শিলং যাই, নুতন বাড়িটা দেখসনি তুই–!
তড়িতাহতের মতো তপতী চমকিয়া উঠিল। ঐ বাড়িতে তাদের মধুচন্দ্রিমা যাপনেব কথা ছিল। নিষ্ঠুর নিয়তির পরিহাস কি?
বুদ্ধিমতী তপতী বুঝিতে পারিয়াছে, পিতামাতার হৃদয়ে যে কী দারুণ শেল বিধিয়াইছে। তপন তো যাইত না তপতী যে তাহাকে তাড়াইয়া দিয়াছে, একথা কেমন করিয়া সে বলিবে! শত অপমান সহ্য করিয়াও তপন যায় নাই, গিয়াছে নিতান্ত নিরূপায় হইয়া। কিন্তু যেদিন সে গেল, সেদিন তো তপতী তাহাকে চাহিয়াছিল। তপনের মতো আশ্চর্য বুদ্ধিমান ছেলে কেন সে কথা বুঝিল না!
চিন্তার কুল-কিনারা নাই। কলেজ হইতে ফিরিয়া সেই-যে তপতী ঘরে ঢোকে, আবার বাহির হয় রাত্রে খাইবার সময়। বেড়াইতে যাওয়া বন্ধ করিয়াছে, কাহারও সহিত কথা পর্যন্ত বলিতে চাহেনা। মা সেদিন বহু কষ্টে তাহাকে বাহির করিয়া লেকে বেড়াইতে লইয়া গেলেন। তপতী জলের ধারে গিয়া বসিতে যাইতেছে, হাসির শব্দে চাহিয়া দেখিল, শিখা এবং মীরা বসিয়া আছে অদূরে একটা বেঞ্চে। তপতী ভালো করিয়া চাহিয়া দেখিল মীরাই বটে। মাকে বলিল, ঐ শিখার কাছে বসে রয়েছে, মা ওর বোন।–মাতা সাগ্রহে বলিলেন,–আয় তবে দেখি—আয় শীগগীর-মা তপতীকে টানিতেছেন। কিন্তু তপতীর ভয় করিতেছে। যদি মার সম্মুখেই মীরা তাহাকে অপমান করে! করিবেই তো! তপতী যাইতে চাহিতেছে না। মা কিন্তু টানিয়া লইয়া গেলেন। তপতী ধীরে ধীরে করুণ কণ্ঠে ডাকিল শিখা? উভয়েই চকিত চাহিল। শিখা দৃষ্টি নত করিয়া বলিল—আয় বোস।–মীরা কিন্তু উঠিয়া দাঁড়াইল। মা বলিলেন,–তুমি তপনের বোন? তোমার দাদার খবর…
–তার তত আর কিছু দরকার নেই। মেয়ের বিয়ে দিন-গে আবার। দাদা এসে মুক্তিপত্রটা রেজেষ্টারী করে দেবেন, যেদিন বলবেন আপনারা।
মা একেবারে আকাশ হইতে পড়িলেন,–সেকি কথা মা! কী বলছো তুমি?
অত্যন্ত জোরে হাসিয়া উঠিল মীরা, কহিল—আপনার খেলুড়ে মেয়ে বুঝি কিছুই বলেনি আপনাকে। বেশ, বেশ, আমি বলে দিচ্ছি। আপনার মেয়ে আমার দাদার কাছে মুক্তি চেয়ে নিয়েছে—স্থির চিত্তেই—যাকে বলে কুল ব্রেনে। দীর্ঘ সাতমাস ধরে দাদা তাকে ভাববার সময় দিয়েছিল আর সেই সাতমাস আপনার গুণবতী কন্যা আমার দেবতার মতো দাদাকে নিজে অপমান করেছে, বন্ধু দিয়ে অপমান করিয়েছে, শেষকালে একজন বন্ধুর কোলে শুয়ে দাদার কাছে চেয়ে নিয়েছে মুক্তি। যান, এখন সেই বন্ধুটিকে কিম্বা যাকে ইচ্ছে জামাই করুন গিয়ে।—মীরা খানিকটা দূরে চলিয়া গেল। শিখা নির্নিমেষ নেত্রে চাহিয়া আছে তপতীর দেহের সমস্ত রক্ত যেন শ্বেতবর্ণ ধারণ করিতেছে। মার কিছুক্ষণ সময় লাগিল সমস্ত ব্যাপারটা বুঝিতে, কিন্তু তপতীর এই দুই মাসের আচরণ তাহাকে চকিত করিয়া দিল—ইহা সত্য, অতিরঞ্জন নহে।
–খুকী!—মা ডাকিলেন। তপতী সাড়া দিতে পারিতেছে না।—এমন সর্বনাশ তুই করেছিস, খুকী? বল—উত্তর দে।—তপতী কাঁপিতেছিল শিখা তাহাকে জড়াইয়া ধরিল। অস্থির হইয়া মা মীরাকে গিয়া ধরিলেন,তোমার দাদা কি ফিরেছে, মা।
-না, ফিরতে দেরী আছে। কিন্তু তার ফেরায় আপনার আর কী কাজ? আমার দাদা আপনার মেয়ের মোগ্যপাত্র নয়; যোগ্যপাত্র দেখুন গিয়ে–
কী কথা বলিবেন, মা খুঁজিয়া পাইতেছেন না। মীরাকে এতটুকু চটানো তার ইচ্ছা নয়। অত্যন্ত সাবধানে তিনি বলিলেন,–মুক্তি চাইলেই কি হয় মা? আমরা ওকে তপনের হাতে দিয়েছি—ও ছেলেমানুষ—যদিই-বা–
মীরা আবার সজোরে হাসিয়া উঠিল,–ছেলেমানুষ! বেশ মা, আপনার ছেলেমানুষ খুকীকে জিজ্ঞাসা করুন তো, রাত বারটার সময় ক্যাসানোভায় বসে জনৈক বন্ধুর সঙ্গে ধর্মান্তর গ্রহণ করার মতলব আঁটা কোনদেশী ছেলেমানুষী?
তপতী রুদ্ধশ্বাসে মীরার কথা শুনিতেছিল; সরোষে কহিল,–মিথ্যা।
–চুপ কর শয়তানী। আজন্ম সত্যসিদ্ধ তপনের বোন শ্রীমতী মীরা কোনকালে মিথ্যে বলে না। ডাইরীতে তারিখ অবধি লিখে রেখেছি, তোদের দুজনের ফটো পর্যন্ত ভোলা হয়ে গেছে। আর চাস্ প্রমাণ।
