সময় আব কাটিতে চাহে না–কতক্ষণে ডাক আসিবে। তপতী জানে তপন তাহাকে চিঠি লিখিবে না কিন্তু মার পত্রে খবরটা জানা যাইবে। অতদূর রাস্তা, ইন্টার ক্লাসে গিয়াছে, ভালোয় ভালোয় পৌঁছাইলেই ভালো।
মা ডাকিলেন,–আয় খুকী-চিঠি এসেছে, পড়—
তপতী পড়িল,—মা আপনার শ্রীচরণাশীৰ্বাদে নিরাপদে এসে পৌঁছেছি; আছি সমুদ্রের কিনারে। এ নীড় কালই ছাড়তে হবে। গতরাত্রে শুনেছি সাগরের অশান্ত করোল; মনে হচ্ছিল, দুহিতা ভারতের দুর্দশায় বিগলিত-হৃদয় মহাসিন্ধুর আর্তনাদ বুঝি আর থামবে না।
আমার কোটি কোটি প্রণাম জানবেন। ইতি-তপন।
সামান্য কয়েকটি লাইন মাত্র। কিন্তু তপতীর মনে হইল, দুহিতা ভারতের দুর্দশায় বুঝি কোনো হৃদয়-সমুদ্র-ক্রন্দনে উদ্বেলিত হইয়া উঠিয়াছে। মাকে চিঠিখানা ফিরাইয়া দিয়া তপতী আসিয়া বিছানায় লুটাইয়া পড়িল।
বিকালে ঝি আসিয়া সংবাদ দিল—মিঃ ব্যানার্জী, মিঃ বোস, মিঃ অধিকারী ইত্যাদি সব আসিয়াছেন। তপতী যাইতে পারিবে না বলিয়া দিল। মা মেয়েকে একটু অন্যমনা করিবার জন্য বলিলেন,–যা না, মা একটু গল্প কর গিয়েনা-হয় খেলা করগে একটু–
তপতী অকস্মাৎ উত্তপ্ত হইয়া উঠিল। বলিল, যাবো না, যাও!
মা তাহার মনের অবস্থা বুঝিয়া নীরবেই চলিয়া গেলেন। ভাবিতে লাগিলেন সেই তপতী, যে দিনরাত হাসিখুসি আর গল্প লইয়া মাতিয়া থাকিত, সেই কিনা স্বামী বিরহে একেবারে ভাঙিয়া পড়িয়াছে।
তাঁহার আনন্দ হইল, হাসিও পাইল। ভাবিলেন, তপন খুকীকে আলাদা পত্র নাদেওয়ায় উহার অভিমানটা হয়তো বেশী হইয়াছে। যা রাগী মেয়ে। তপন যে খুব ব্যস্ত রহিয়াছে সেখানে, ইহা খুকী কেন বুঝিতেছে না।
কিন্তু দিনের পর দিন চলিয়া যাইতেছে, প্রায় পনের দিন কাটিল, না-আসিল খুকীর চিঠি, নাবা মার চিঠি। মা-ও এখন ভাবিতেছেন। স্বামীকে তিনি জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলেন, তিনিও তপনের কোনো পত্র পান নাই। তপতীকে ডাকিয়া কহিলেন,—তোকে কি বলে গেছে রে খুকী?
—মাস দুই দেরী হবে, বলেছে, মা। তপতী মৃদুস্বরে উত্তর দিল।
মা তাহার মুখের দিকে চাহিয়া দেখিলেন, তপতী অত্যন্ত বিমনা হইয়া পড়িয়াছে। মেয়ে কষ্ট পাইতেছে ভাবিয়া মা আর কোনো কথা তুলিলেন না।
তপতীর কিন্তু মনে পড়িয়া গিয়াছে মীরার কথাটা—-দাদাকে আমার দেশান্তরী করে দিল! সত্যিই কি তাই? সত্যই কি তপন আর আসিবে না? তারই জন্য কি মীরা সেদিন অত কান্নায় ভাঙিয়া পড়িতেছিল? হয়তো তাই-—হয়তো তপতীকে সত্য-সত্যই তপন মুক্তি দিয়া গিয়াছে!
তপতী আর অধিক ভাবিতে ভরসা পাইতেছে না। ভাবনার সূত্র ধরিয়া উঠিয়া আসিতেছে মিঃ ব্যানার্জি, মিঃ বোস, মিঃ সান্যাল-তপনকে অপমান করিতে তপতী যাহাদিগকে অস্ত্ররূপে ব্যবহার করিয়াছে। যাহারা বলিয়াছে,–তপন নির্লজ্জ, উহার মানঅপমান জ্ঞান নাই—তাহারাই আজ অজস্র অবহেলা সহ্য করিয়া তপতীর দরজায় ধরণা দেয়। আর তপন, প্রত্যেকটি কথায় যাহার অনুভূতির মণি-মাণিক্য ছড়াইয়া যাহার বিনয়ের মধ্যেও জাগিয়া থাকে যুগ-সঞ্চিত সংস্কারের আভিজাত্য, অপমানকে যে নীলকণ্ঠের মতো আত্মসাৎ করিয়া অমৃত বর্ষণ করিয়া যায়—সেই ঋষির মতো স্বামী তপনকে সে অপমান করাইয়াছে ঐসব পথের কুকুর দিয়া!…বেদনায় তপতীর অন্তর অসাড় হইয়া পড়িতেছে। কিন্তু কী করিবার আছে। ঠিকানা পর্যন্ত দিল না। বোনের ঠিকানাটাও জানিয়া লওয়া হয় নাই। তপতী চারিদিকেই অন্ধকার দেখিতে লাগিল।
মিঃ চ্যাটার্জী আসিয়া কহিলেন,—ওগো শুনছো, তোমার জামাই-এর কাণ্ড দ্যাখো—
তপতী তৎক্ষণাৎ কান খাড়া করিল। মা বলিলেন,–খবর পেয়েছ?
—না। খুকী চিঠি পায় নি?–মিঃ চ্যাটার্জী উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিলেন।
–না।–বলিয়া তপতীর মাতা একটা নিঃশ্বাস ফেলিলেন! পুনরায় বলিলেন,–কী কাণ্ড তবে?
–অফিসের একটা কেরানীর অসুখ ছিল প্রায় তিন-চারমাস। তপন তাকে হাসপাতালে পাঠিয়েছিল। আজ সে ফিরে এসে আমার পায়ে আছড়ে পড়ে বললে–তার অ্যানিমিক হয়েছিল, তপন তাকে নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে বাঁচিয়েছে।
—রক্ত!—তপতী শিহরিয়া পিতাকে প্রশ্ন করিল।
-হ্যাঁ রে–তুই জানিস না তাহলে। তারপর হাসপাতালে কত টাকা দিয়েছে, ঐ রকম রোগীদের কিনে রক্ত দেবার জন্যে। সেই দুলাখ টাকায় এসবই করেছে বোধ হয়। আমায় বলেছিল-ভালো কাজেই টাকাটা লাগাবো বাবা!
দুলাখ কেন, দশ লাখ তপন খরচ করুক সর্বস্ব বিলাইয়া দিক কিন্তু নিজের রক্ত কেন দিল! কবে সে করিল এ কাজ! তপতীর সারা মন ব্যথা কন্টকিত হইয়া আসিতেছে। কারুণ্যে শীতলতম স্রোতে অবগাহন করিতেছে, তাহার হৃদয়টা বুঝি বা ফাটিয়া চূর্ণ হইয়া যাইবে।
অনেকক্ষণ একা বসিয়া থাকার পর অকস্মাৎ তপতী উঠিয়া মার কাছে গিয়া বলিল,–ওর ঘরের চাবিটা দাও তো, মা?
মা চাবি বাহির করিয়া দিলেন। তপতী আসিয়া ঘরটা খুলিয়া ফেলিল! একটা ছোেট টেবিল রহিয়াছে, উপরে মোটা কাচের আবরণের প্যাড। কাচটার নীচে একখণ্ড কার্ড-এ কী লেখা আছে টানিয়া পড়িল তপতী—আমার বিদায়-অশু রাখিলাম, লহো নমস্কার!
তপতীর স্নায়ুতন্ত্রী অবশ হইয়া আসিতে লাগিল। সামলাইবার জন্য সে টেবিলের উপরেই মাথা খুঁজিয়া বসিয়া পড়িল তপনেরই চেয়ারটায়।
কতক্ষণ কাটিয়াছে খেয়াল নাই তাহার মা স্নেহভরা তিরস্কার করিয়া ঢুকিলেন-কি তুই করছিস, খুকী! স্বামী সবারই বিদেশে যায়, অমনি করে কাদে নাকি তার জন্যে? আয় খেতে আয়।
কাঁদিনি মা, যাচ্ছি–তুমি যাও—যাচ্ছি আমি—
