মা, চিঠি দেবো পৌঁছেই!
–খুকী তো স্টেশন যাচ্ছিস সী-অফ করতে?
–না মা, ও কিজন্যে কষ্ট করে যাবে? ফিরতে বেলা হয়ে যাবে অনর্থক। তাছাড়া আমি ট্যাক্সিতে যাচ্ছি, বাড়ির গাড়ী নিলাম না–বলিয়া খাইতে লাগিল। তপতী কিছুই বলিতে পারিল না।
বাকী যাহা বলিবার তপতী বলিবে ভাবিয়া মা আর কিছু বলিলেন না। তপন নীরবে খাইয়া উঠিয়া গেলে মা তপতীকে চা ও খাবার দিয়া বলিলেন,–সুটকেশগুলো গুছিয়ে দিয়েছিস?
দারুণ মানসিক উত্তেজনায় তপতীর সে কথা মনেই ছিল না।
—যাচ্ছি বলিয়া তপতী তাড়াতাড়ি খাইয়া তপনের ঘবে আসিল, সুটকেস গুছানো এবং চাবিবন্ধ রহিয়াছে। তপনের কাপড় পরাও হইয়া গিয়াছে, একটা চাকর তাহার জুতার ফিতা বাঁধিয়া দিল। অন্য একজন সুটকেস-দুইটি গাড়ীতে লইয়া গেল। তপনও বাহিরে যাইতেছে, সম্মুখে তপতীকে দেখিয়া বলিল আচ্ছা-চাম–নমস্কার। তপন চলিয়া গেল মাকে প্রণাম করিতে; পরে মিঃ চ্যাটার্জিকেও প্রণাম করিল—এবং নীচে নামিয়া গেল।
সম্বিৎলব্ধা তপতী ছুটিয়া নীচে আসিবার পূর্বেই তপনের গাড়ী ছাড়িয়া দিয়াছে।
কিছুই বলা হইল না…না, বলিতেই হইবে। তপতী তৎক্ষণাৎ একখানা গাড়ী আনাইয়া স্টেশনে ছুটিল। ট্রেন ছাড়িতে মাত্র কয়েক মিনিট বিলম্ব আছে। তপতী ছুটিতে ছুটিতে গিয়া প্ল্যাটফর্মে ঢুকিয়াই দেখিল-বোনটির হাত ধরিয়া তপতী দাঁড়াইয়া আছে। মনটা তাহার দ্বিধাগ্রস্ত হইয়া উঠিল ক্ষণিকের জন্য, কিন্তু সবলে সমস্ত দৌর্বল্য ঝাড়িয়া ফেলিয়া তপতী নিকটে আসিয়া দাঁড়াইল…মেয়েটা কাঁদিতেছে—উদ্বেল আকুল হইয়া কাঁদিতেছে। তপন বলিতেছে তাহাকে,—লক্ষ্মী বোনটি, এমন করে কাদে না—যাও, স্বামীর কাছে যাও, স্বামীর চেয়ে বড় বস্তু নারীজীবনের আর কিছু নেই, এই কথা তোকে আমি আজন্ম শিখিয়ে এসেছি—ওরে ধর ওকে!—একটি সুন্দর যুবক আগাইয়া আসিল। মেয়েটা কিছুতেই তপনকে ছাড়িতেছে না, হু হু করিয়া কাঁদিতেছে। তপন তাহার মাথায় হাত রাখিয়া কহিল,—ছি মীরা, এতকালের শিক্ষা আমার সব পণ্ড করে দিবি তুই? চুপ কর-আয়, ওঠ, ধরিত্রির মতো সহিষ্ণু হোস্—আকাশের মতো উদার হোস—সূর্যালোকের মতো পবিত্র পাকিস…।
গাড়ী ছাড়িতেছে। তপন পা-দানিতে উঠিয়া পড়িল। চোখের জলে কিছুই দেখিতে পাইতেছে না, তথাপি মেয়েটা তাকাইয়া আছে, অপসৃয়মান গাড়ীটার দিকে। তপতী যে এত কাছে দাঁড়াইয়া আছে উহাকে কেহ দেখিলই না।তপন এ মুখে ফিরে নাই, আর ইহারা তপতীকে চেনে না! কিন্তু কেন ও এত কাঁদিতেছে? মাদ্রাজ গেল, কয়েকদিন পরেই ফিরিয়া আসিবে, তাহার জন্য এত কান্নার বাড়াবাড়ি কেন। তপতী বিস্মিতা ও ব্যাকুল হইয়া উঠিল। কী গভীর কারণ থাকিতে পারে ঐ কান্নার? ধীরে ধীরে সরিয়া আসিয়া সে সহানুভূতি জানাইতে মীরার হাতটা ধরিতে গেল, চমকাইয়া মীরা কহিল,–কে আপনি? তৎক্ষণাৎ তপতীর মুখের পানে তাকাইয়া বলিল,–ও, লজ্জা করে না আমায় ছুঁতে-হাতখানা মীরা টানিয়া লইল।
তাহার স্বামী বলিল,–ছিঃ ছিঃ, ওরকম করে বলতে আছে?
মীরা সরোষে গর্জিয়া উঠিল,–জুতোর ঠোক্করে নাক ভেঙে দেব না। দাদাকে আমার দেশান্তরী করে দিল, আবার লাভার-এর দেওয়া আংটি হাতে পরে সী-অফ করতে এসেছে। চলো, চলো-ওর মুখ দেখলে গঙ্গানাইতে হয়!—মীরা তৎক্ষণাৎ স্বামীর হাত ধরিয়া টানিয়া লইয়া চলিয়া গেল।
যে কথা কেহ কোনদিন বলে নাই, বলিবার কল্পনা পর্যন্ত করিতে পারে না, মীরা তাহাই বলিয়া গিয়াছে। তপতীর সমস্ত আভিজাত্য সমস্ত অহঙ্কার ধরার ধুলায় লুটাইয়া দিয়া গেল। লাভার-এর দেওয়া অংটিহাতে পরে…তপতী শিহরিয়া আপনার বাম হাতের অনামিকার দিকে চাহিল-মিঃ অধিকারীর প্রদত্ত আংটির হীরকখণ্ডটি জ্বলজ্বল করিতেছে জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো। আপনার অজ্ঞাতসারেই তপতী আংটি খুলিয়া ফেলিল।
তপন যাহা কোনদিন বলে নাই, মীরা তাহাই নিতান্ত সহজে বলিয়া দিল! বিরুদ্ধে তপতীর কিছু বলিবার নাই। আজ দীর্ঘ পাঁচমাস সে ঐ আংটি পরিয়া আছে। তপতীর চরিত্রের বিরুদ্ধে ঐ জ্বলন্ত জাগ্রত প্রমাণকে লুপ্ত করিবার শক্তি আজ আর কাহারও নাই।
মৃত্যু-পাণ্ডুর তপতী আসিয়া গাড়ীতে উঠিল।
—ওর বোনের ঠিকানাটা তুমি জানো মা? তপতী মাকে প্রশ্ন করিল।
–না রে–কেন, তুই জানিস নে? দেখিনি তাকে তুই?—মা প্রতিপ্রশ্ন করিলেন।
–দেখেছি সেদিন স্টেশনে! কিন্তু ঠিকানা জানবার আগেই চলে গেল।
–বড্ড অন্যায় হয়ে গেছে মা! ওকে একদিন তোর গিয়ে আনা উচিত ছিল।
—তুমিও তো বললানি মা, আজ বলছে অন্যায় হয়েছে।—তপতীর কণ্ঠস্বর ব্যথা করুণ শুনাইতেছে।
স্বামী বিরহ-বিধুর কন্যার কথা শুনিয়া মা সস্নেহে বলিলেন,—তপন ফিরে এলেই যাবি একদিন,আজ বোধ হয় তার চিঠি পাবি তুই।
বিষণ্ণা তপতী বিশুষ্ক মুখে চলিয়া গেল। সে চিঠি পাইবে! এতবড় ভাগ্য সে অর্জন করে নাই আজও। এই দীর্ঘ সাতদিন প্রতিটি মুহূর্ত তপতীর অন্তর ধ্যান করিয়াছে তপনের মূর্তি–কিন্তু তাহার অত্যন্ত দেরী হইয়া গিয়াছে। শুধু দেরী হইলেই হয়তো ক্ষতি হইত না, তপতীর অন্তঃসারশূন্য অহঙ্কার তপনকে বিদীর্ণ করিয়া দিয়াছে, বিচ্ছিন্ন করিয়া দিয়াছে তপতীর অন্তর হইতে তাহার অন্তরতমকে। ভাবিয়া ভাবিয়া তপতী ক্লান্ত হইয়া পড়িতেছে। তাহার পুণ্যশ্লোক ঠাকুরদা যেন তাহাকে চোখ রাঙাইয়া বলেন,—অ্যাতো শেখালাম, খুকী—সব পণ্ড করে দিলি!” কিন্তু কেন সে এত ভাবিতেছে? তপন তো কয়েকদিন পরেই ফিরিয়া আসিবে। মীরা বলিয়াছে তাহাকে অত্যন্ত কুৎসিৎ কথা, কিন্তু তপন তো কোনদিন কিছু বলে নাই। যেদিন সে মিঃ ব্যানার্জীর কোলে শুইয়া তপনের কাছে মুক্তি-ভিক্ষা চাহিয়াছিল, সেদিন…হা, সেদিন কিন্তু তপন অসহ্য বেদনায় লুটাইয়া পড়িয়াছিল।
