একটি তরুণী বলিল,—রিয়েলি! রসিকতা করতে এসে রাগ করা চলে না। আপনারা ফুল বলায় উনি কত সুন্দর করে জবাব দিলেন, আর উনি এমন কিছুই বলেননি যাতে আপনাদের চটে যাওয়া চলে।
মিঃ অধিকারী এতক্ষণে বুঝিলেন, চটিয়া যাওয়া তাহার অন্যায় হইয়াছে। কহিলেন, আপনাকে এরকম কথা বললে আপনি কী করতেন?
তপন বলিল, আমার বোকা বুদ্ধিতে চা আর চপ বেশী করে খেয়ে লাকী হতাম।
তপনের মুখের ভাব ও কথার ভঙ্গীতে সকলেই হাসিয়া উঠিল।
মিঃ বোস কহিলেন,—আচ্ছা, যেতে দিন—আসুন, চা-ই খাওয়া যাক আর এক কাপ।
একটি মেয়ে বলিল, তা হলে আপনি সত্যই চালাক হতে চান?
মিঃ অধিকারীর মুখখানা তখনও গম্ভীর ছিল; বলিলেন,—দিন, খেয়েছি কিন্তু–
তপন হাসিয়া কহিল,—কিছু কিন্তু না, মিঃ অধিকারী, অধিকন্তুটা অনেক সময় আরাম দেয়। যেমন ধরুন—চশমার উপর সান্-গ্লাস, চিবুকের নীচে নেকটাই; পাঞ্জাবীর উপর চাদর, চামড়ার উপর উল্কী, চায়ের উপর চাদমুখ…।
হাসিতেছে সকলেই। মিঃ অধিকারীও আর না হাসিয়া পারিল না। স্মিমুখে কহিলেন,—রিয়েলি, বাংলা ভাষাটা আপনার আশ্চৰ্য্য রকম আয়ত্তে
মিঃ বোস কহিলে,—কিন্তু উনি আমাদের বন্ধু হতে চান না—সো স্যরি।
–সার্টেনলি হি উইল বি। নইলে আমরা ওঁকে ছাড়বো না—মিঃ অধিকারী কহিলেন।
তপতী নীরবে চা খাইতেছে। ইচ্ছা করিয়াই যে কঠিন পরিস্থিতির সে সৃষ্টি করিয়াছিল, তাহা হইতে সে মুক্তিলাভ করিল এতক্ষণে। তপতীর মনে এখনও ইহারা যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করিয়া আছে। তপন বুঝিল, ইহাদের এতটুকু অসম্মান আজও তপতী সহিতে পারে। আর তপনের বেলায়?–আমাকে এবার যেতে হবে, অনুগ্রহ করে অনুমতি দিন! পন আবেদন করিল।
–না-না-না, ভারী সুন্দর লাগছে আপনার কথা, এখনি কেন যাবেন?
তরুণীর দল তপনকে ছাড়িতে চাহে না।মিঃ অধিকারী ও মিঃ বোস ঈর্ষাপরায়ণ হইয়া উঠিতেছেন। তাহাদিগকে অসম্মান করিয়াই লোকটা তরুণীমহলে খাতির জমাইয়া ফেলিতেছে! মিঃ বোস কহিলেন, কারও কথায় ওঁর নীতি বদলায় না শুনেছি। অনুরোধ বৃথা!
মিঃ অধিকারীও কথাটায় সায় দিয়া কহিলেন, কাজের মানুষদের আটকাতে নেই। তরুণীদের একজন চটিয়া বলিল,–আপনারা চান যে, উনি চলে যান, নয়?-রাগটা সামলাইতে গিয়া মিঃ বোস ও মিঃ অধিকারী চুপ হইয়া গেলেন!—সমস্ত অবস্থাকে সামলাইবার জন্য তপতী কহিল,না রে, কাজ আছে—যাই আমরা।
–তুই থাম তো তপি! ওকে এতকাল কিসের জন্য লুকিয়ে রেখেছিলি বল?
তপতী কোনো উত্তর দিবার পূর্বেই তপন হাসিয়া কহিল,–অচল টাকা বার করা বোকামী-লুকিয়ে রাখতে হয় নিতান্ত ফেলে দিতে না পারলে।
তপন উঠিল; তপতীর মন আচ্ছন্ন করিয়া ধ্বনিয়া উঠিল বেদনার সুর। তপনকে সে অচল টাকাই মনে করিয়াছে। বারম্বার আঘাত করিয়াছে হাতুড়ী দিয়া নখের কোণায় বাজাইয়া দেখে নাই।
গাড়ী চলিতে চলিতে তপন একটা কথাও বলিতেছে না। তপতীর মন বিষাদ সাগরে ড়ুবিয়া যাইতেছে। কেন সে মিঃ অধিকারীদের সহানুভূতি দেখাইতে গেল? যে-কোন অবস্থা-বিপৰ্যয়কে অনায়াসে আয়ত্তে আনিবার শক্তি যে তপনের অসাধারণ, ইহা তপতী আজ ভালো করিয়াই বুঝিয়াছে। তপন নিজেই তো সমস্ত সামলাইয়া লইল। বরং রসিকতা করিতে আসিয়া চটিয়া যাওয়ার জন্য মিঃ অধিকারী লজ্জাই পাইলেন। কিন্তু তপন কী ভাবিতেছে তপতীর সম্বন্ধে? হয়তো ভাবিতেছে, তপতী আজও উহাদের জান্য তপনকে অভদ্র বলে। এখনও তপতী উহাদের অসম্মান সহিতে পারে না। তপতীর মাথা ঠুকিয়া মরিতে ইচ্ছা করিতে লাগিল। কিন্তু এখন আর উপায় নাই।
গেটে গাড়ীটা ঢুকাইয়া দিয়া তপন পুনরায় বাহির হইয়া গেল।
প্রেম যখন অন্তরে সত্য-সত্যই জাগিয়া উঠে তখন অনেক কথাই বলি-বলি করিয়া বলা হয় না। সমস্ত রাত্রি তপতী জাগিয়া রহিয়াছে, এতটা সময় চলিয়া গেল, অথচ কিছুই তাহার বলা হইল না তপনকে। কতবার তপতী ভাবিল—ঐ তো ও-ঘরে তপন ঘুমাইতেছে, তপতী গিয়া ডাকিলেই পারে; কিন্তু লজ্জায় পা চলিতেছে না। এত কাণ্ডের পর তপতী আজ কি করিয়া তপনকে ভালবাসার কথা বলিবে। পিঞ্জরাবদ্ধ পাখির ন্যায় তাহার অন্তরাত্মা কাদিয়া ফিরিতেছে, তপতী আপনাকে নিঃশেষে তপনের কাছে মুক্ত করিয়া দিবার কোনো পথই খুঁজিয়া পাইতেছেনা! তপন যদি তাহাকে তাড়াইয়া দেয়! যদি বলে কেন এ ছলনা করিতে আসিয়াছ? তপতী সে অপমান সহ্য করিতে পারে; কিন্তু ৩পন হয়তো কিছুই বলিবে না, নীরবে শুনিবে এবং নির্লিপ্তর মতো চলিয়া যাইবে। তথাপি তপতী একবার চেষ্টা করিবেই; রাত্রিতে আর উঠাঁইবার কাজ নাই, ঘুমাক, সকালে সময় পাওয়া যাইবে নিশ্চয়।
প্রত্যুষে গান সারিয়া তপতী গিয়া দাঁড়াইল খাইবার ঘরে! মাও আসিলেন—তপনের জন্য খাবার প্রস্তুত করিতে হইবে।
–কাল পার্টিতে তপনকে দেখে সবাই কি বললো রে খুকী?–মাতার প্রশ্নের উত্তরে তপতী হাসিমুখে কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া রইল; তারপর বলিল,—সবাই খুব ভালো বললো।
মা মধুর হাসিয়া বলিলেন,–আমার কথা ঠিক তো? দেখ এবার–
তপতী কিছু বলিল না; হাসিমুখে লুচি বেলিতে লাগিল। তপন আসিয়া ঢুকিল। এত সকালে আসিবে, মা তাহা ভাবেন নাই। বলিলেন,–আটটার ট্রেন, বাবা, এত তাড়া কেন তোমার? ছটা তো বাজলো।
–সাতটায় বেরবো, মা,–খাবো, কাপড় পরো,একঘন্টা তো সময়। দিন!
তপন খাইতে বসিল! তাহার ললাটের ত্রিপুণ্ড রেখায় আজ রক্তচন্দনের আভা, পরণে ক্ষৌমাবস্ত্র, গলায় উত্তরীয়। তপতী বিমুগ্ধ বিস্ময়ে চাহিয়া রহিল এই অসাধারণ পবিত্রতার দিকে। তপন কথা বলিতেছে না দেখিয়া মা কহিলেন,–পৌঁছেই চিঠি দিয়ে বাবা, ভুলো যেন।
