আলোচনাটা গম্ভীর হইয়া উঠিতেছে, তরল করিবার জন্য একজন কহিল,–আপনি এতকাল আমাদের কাছে আসেননি কেন বলুন তো? ভয়ে?
অপরাধটা তপতীরই। সে তপনকে লইয়া অসিবার জন্য কোনদিন আগ্রহ প্রকাশ করে নাই। তপন কি বলে, শুনিবার জন্য সে উৎসুক হইয়া উঠিল। তপন হাসিয়া উত্তর দিল—অত্যন্ত বেমানান ঠেকবে বলে। পলাশফুল বনেই থাকে—মার্কেটের কাচের ঘরে ওকে মানায় না।
কথাটায় তপনের বিনায়াতিশয্যের সহিত তীক্ষ্ম ব্যঙ্গ মিশিয়া আছে।
—আমরা বুঝি কাচের ঘরে থাকি।আমাদের এমনি অসম্মান করবেন নাকি আপনি?—মেয়েটি বলিল।
–ঐ ভয়েই তো আসিনি। আপনাদের সম্মান এবং অসম্মানের দেওয়ালগুলো এত ঠুনকো যে ঢুকতে ভয় করে। অতি সাবধানে টেলিফোন করে বলতে হয়-চার ডজন গোলাপ, দু ডজন ক্রীসান্থীমাম, পাঁচ ডজন কস্মস্…।
তপনের বলার ভঙ্গীতে অনেকেই হাসিয়া উঠিল। কিন্তু যে মেয়েটি অসম্মানের কথা তুলিযাছিল, সে বলিল বিদ্রূপ করিয়া—আর বনে গিয়ে আপনার ঘাড় মটকে আনতে হয়, কেমন?—তপন নিঃশব্দে হাসিল। মেয়েটি পুনরায় বলিল,—আমরা যে কাচের ঘরের সাজানো ফুল, সেটা আপনি প্রমাণ করুন, নইলে ছাড়ছি না।
–না-ছাড়লে অসুবিধা হবে না, কাচের ঘরে ঢুকতে সাধ হয় মাঝে মাঝে।
–তা হলে এবার ঢুকে পড়লেন—কেমন? মেয়েটি তপনকে ঠকাইয়াছে।
আমার ঢুকবার অনুমতি দিয়ে এবার কিন্তু আপনিই প্রমাণ করলেন যে, এটা কাচের গর।–তপন হাসিল।
মেয়েটি আপনার বাক্যজালে জড়িত হইয়া এমন নির্বোধের মতো ঠকিয়া গেল দেখিয়া সকলেই বলিল—যা যা, কথা কহিতে জানিস নোলজ্জিত হইয়া মেয়েটিও হাসিতে লাগিল! তপতীর অন্তর আনন্দে শিহরিয়া উঠিতেছে। এই তপন–তাহার স্বামী যাহার নহিত কথায় পাল্লা দিতে পারে এমন মেয়ে এখানে একটিও নাই?
মিঃ অধিকারী এবং মিঃ বোস আসিয়া দর্শন দিলেন তপনের আসনের পার্শ্বে। মিঃ বোস ব্যঙ্গ করিয়া বলিয়া উঠিলেন,—পূজোর সঙ্গে পার্টির মিক্সচারের ঋষি-সূত্রটা কি তপনবাবু?
কিছুমাত্র ইতস্তত না করিয়া তপন উত্তর দিল,–মোগলের সঙ্গে খানা-খাওয়া।
মিঃ বোসকে পরাজিত দেখিয়া মিঃ অধিকারী আরম্ভ করিলেন,—টিকির মাহাত্মাটা একটু বর্ণনা করবেন, তপনবাবু-আপনার পাঁচালী থেকে?
সদাহাস্যময় তপন তৎক্ষণাৎ আরম্ভ করিল,–
টিকির মাহাত্মকথা করিব বর্ণন,
অবধান করো সব টিকিহীন জন!
টিকিটি রাখিবে যেবা জয় হবে তার,
টিকি না-থাকায় হারে জজ-ব্যারিষ্টার!
কহিল টিকির কথা বেচারা তপন,
টিকিতে বাঁধিয়া নিয়ো রমণীর মন।
হা হা করিয়া তরুণীর দল কলহাস্যে সভা মুখরিত করিয়া তুলিল। মিঃ অধিকারী ও মিঃ বোস রোষে ফুলিয়া উঠিতেছিলেন—মিঃ বোস কহিলেন,—অত উৎফুল্ল হবেন না। ইংরাজীতে একটি কথা আছে, ফুস রাশ ইন হোয়্যার এঞ্জেল্স…মিঃ বোস থামিলেন।
ক্রোধে তপতীর দুই চক্ষু জ্বলিয়া উঠিতেছে। তাহার স্বামীকে তাহারই সম্মুখে ইহারা ফুল বলিবে এবং তাহা তাহারই জন্য? কিন্তু তপন জবাব দিল, দেবদূতরা বেশী সাবধানী, তাদের পথ গোনাগাঁথার গলিতে, আর বোকাদের পথ দরাজ বড় রাস্তা–তাই এসব ব্যাপারে বোকারাই জয়ী হয় চিরদিন। জয়ী না হলেও তারা মরতে পিছোয় না, চালাক দেবদূতদের মতো লাভ আর লোকসান খতিয়ে দেখবার বুদ্ধি তাদের নেই।
মুখের মতো জবাব হইয়া গিয়াছে। নির্ভীক তপন নিঃসঙ্কোচে নিজেকে বোকা মানিয়া লইয়াই যাহা জবাব দিল, তরুণীর দল তাহার প্রশংসা না করিয়াই পারে না।
জনৈকা মহিলা কহিলেন—আপনি বোকা? চালাক কে তবে!
—যাদের লাক চা-চকোলেট আর চপ খেয়ে দিনে দিনে ফুলে ওঠে। তপন উত্তর দিল।
কথাটার মধ্যে যে হুল ছিল, তাহার বিষ তপতীকে পর্যন্ত কুণ্ঠিত করিয়া দিল। মিঃ অধিকারী দাঁড়াইয়া উঠিলেন; বলিলেন,–আপনি আর আমাদের চা-চপ খেতে ডাকবেন না, তপতী দেবী, উনি সইতে পারেন না বোঝা যাচ্ছে
তপতী অত্যন্ত লজ্জিত হইয়া বলিল,–আমি বড় লজ্জা পেলাম, মিঃ অধিকারী আমিই আপনাদের কাছে মাপ চাইছি এর জন্যে।—তপতী হাতজোড় করিল।
যেন কোন মহার্ঘ্য বস্তু লাভ করিয়াছে, তপন এমনি ভাবে হাসিয়া উঠিল; বলিল, আমিও মাপ চাইছি, মিঃ অধিকারী। কিন্তু রসিকতা করে আঘাত করতে এলে প্রতিঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত, এই কথা আমাদের বোকার অভিধানে লেখে। আর আমি শুধু প্রমাণ করে দিলাম যে, বোকা অসুররা মাঝে মাঝে জয়লাভ করলেও স্বর্গরাজ্য পরিণামে দেবতাদেরই, কারণ বোকা অসুররা সেটা রক্ষা করতে পারে না—এ কথা জেনেও তারা স্বর্গরাজ্য লাভের জন্য হাত বাড়ায়—বোকা কিনা, তাই! স্বর্গ কিন্তু দেবতাদের পথ তাকিয়েই থাকে।
মিঃ অধিকারী ও মিঃ বোস খুসী হইয়া উঠিয়াছেন তপতীর সহানুভূতি পাইয়া। তপন বলিয়া চলিয়াছে তখনও,—আপনারা আমার এই ইচ্ছাকৃত অপরাধটা ক্ষমা না করলেও জয়ী আপনারাই।
তপন কী বলিতে চাহিতেছে ঠিক বুঝিতে না পারিয়া মিঃ অধিকারী ও মিঃ বোস তাকাইয়া রহিলেন। তপতী কিন্তু অত্যন্ত চঞ্চল হইয়া উঠিল। কেন সে মরতে সহানুভূতি দেখাইতে গেল! মিঃ অধিকারীরা চটিলে তাহার কি বহিয়া যাইবে? কিছু একটা বলা উচিত ভাবিয়া সে বলিল, খাওয়ার খোঁটা দেওয়া খুব অন্যায়।
তপন কহিল,—চা-চপ-খাদকদের চালাক আর লাকী বলায় কোনো ব্যক্তিকে খোঁটা দেওয়া হয়, আমার ধারণা ছিল না!
–অন্য ক্ষেত্রে হয়তো কথাটা দোষের নয়, এক্ষেত্রে অত্যন্ত অভদ্র শোনাচ্ছে। তপন নির্বিকার চিত্তে তপতীর কথার উত্তরে মিঃ অধিকারীকে হাসিয়া কহিল,–ভদ্র তো আমি নই, মিঃ অধিকারী-বুদ্ধিও নেই। আমার কথাটা তো আপনাদের সুবুদ্ধি হেসেই উড়িয়ে দিতে পারতো।
