তপন উঠিয়া কখন খাইতে গিয়াছে। তপতীও বুঝিতে পারিয়াই খাবার ঘরে আসিয়া দাঁড়াইল! মা তাহার মুখের পানে চাহিয়া কহিলেন,–খেয়ে একটু ঘুমে গিয়ে, মা-মা। মৃদু হাসিলেন।লজ্জায় তপতী লাল হইয়া উঠিল। মা হয়তো ভাবিয়াছেন, তপনের সহিত তপতী রাত্রি-জাগরণ করিয়াছে। মাথা নিচু করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল তপতী। কথাটা সত্য হইলে আজিকার লজ্জাটা তপতীর আনন্দেরই দ্যোতক হইতে পারিত; কিন্তু সত্য নয়। কবে যে সত্য হইবে তাহাও তপতী জানে না। তাহার শ্বাস ভারী হইয়া উঠিল। তপতীর দিকে না চাহিয়াই তপন কহিল,–অধ্যয়ন একটা তপস্যা, মা ভালো করে ওকে পড়তে বলুন–
—হাঁ বাবা, পড়ছে তত, আর তুমি কি করবে, বাবা?—মাতা হাসিয়া প্রশ্ন করিলেন।
তপন হাসিয়াই জবাব দিল,–অজরামরবৎ প্রাজ্ঞবিদ্যামর্থঞ্চ চিন্তয়েৎ। ও বিদ্যার চিন্তা করুক, মা, আমি অর্থ চিন্তা করছি। ওর তো অর্থের অভাব নেই।
-তোমার বুঝি বড্ড অভাব? মা প্রশ্নটা করিলেন অভিমানহত স্বরে।
–অর্থেব অর্থটা অত্যন্ত ব্যাপক, মা, তার অভাব আমারও আছে বৈকী। ধরুন—পুরুষার্থ, পৌরুষার্থ, পরমার্থ অর্থের মানে তো শুধু টাকা নয়।
মা চুপ করিয়া রহিলেন; তপতী মাকে লক্ষ্য করিয়াই যেন অত্যন্ত নিম্নস্বরে কহিল,অনর্থের মূল হয় অর্থটা সময় সময়
ব্যবহার না জানলেই হয়। ব্যবহারের গুণে বিষও অমৃত হয়ে ওঠে—উত্তরটা তপনই দিল।
তপতী চুপচাপ বসিয়া ভাবিতেছে—তপন তাহার কথায় উত্তর দিয়াছে। আরো কিছু কথা বলিয়া দেখিবে কি, তপতীর উপর উহার মনের ভাব কিরূপ? বলিল,—অনেক সময় বিষকেও আবার অমৃত বলে ভ্রম হয়।
–বিষকে বিষ বলে চিনবার শক্তিটা মানুষ লাভ করে জন্মার্জিত সংস্কার থেকে, আর শিক্ষা দ্বারা অর্জন করে তাকে অমৃতরূপে ব্যবহার করার শক্তি।
মা উহাদের কথোপকথন শুনিতেছিলেন; আনন্দিত স্বরে প্রশ্ন করিলে,—বিষ আর অমৃতে তাহলে তফাৎ কোথায় বাবা?
–শুধু ব্যবহারে, মা, আর কোন তফাত নেই। সব-ভালো আর মন্দর অতীত এই বিশ্বের প্রত্যেকটি অণু। দেশ ভেদে, কাল ভেদে, পাত্র ভেদে সে বিষ হয়, আবার অমৃত হয়; যেমন-নারী, কোথাও বিলাসের ধ্বংসমূৰ্ত্তি কোথাও কল্যাণী মাতৃমূর্তি।
তপনের খাওয়া হইয়া গিয়াছে, উঠিয়া যাইতেছিল, তপতী কহিল ধ্বংসমূর্তিকে কল্যাণী-মূৰ্ত্তি করে গড়ে তোলার ভার থাকে শিল্পীর হাতে।
-হ্যাঁ। কিন্তু শিল্পীর নিষ্ঠুর ছেনীর আঘাত লইবার জন্য মূৰ্ত্তিকে প্রস্তুত থাকতে হয় বলিয়াই তপন চলিয়া গেল। কিন্তু কী সে বলিয়া গেল। তপতীকে কি তাহার নিষ্ঠুর ছেনীর আঘাত সহ্য করিতে হইবে? হয় হোক,তপতী সহ্য করিবে। কথায় কথায় যে-লোক বাক্যের এমন ফুলঝুরি ফুটাইতে পারে, অত্যন্ত সহজ ভাষায় অতিশয় আন্তরিকতা দিয়া যে বলিতে পারে—আমি শিল্পী আমি তোমায় ভালবাসি বলিয়াই আমার নিষ্ঠুর অস্ত্রাঘাতে তোমায় নিখুঁত করিয়া তুলিব, তপতী তাহার হাতে আত্মসমর্পণ করিয়া ধন্য হইয়া যাইবে আসুক ঐ রূপকার, আঘাতে আঘাতে তপতীর সমস্ত কুশ্রীতা ঝরাইয়া দিক, ফুটাইয়া তুলব তপতীর সারা দেহ-মনে অপরূপের মহিমান্বিত ঐশ্বৰ্য্য!
তপতীর চোখে দুইবিন্দু জল টলমল করিয়া উঠিল, তাড়াতাড়ি সে চলিয়া গেল মা কাছ হইতে। আশ্চর্য্য! এমন না হইলে মা-বাবা উহাকে কেন এত ভালবাসিবেন? তপত কেন এতকাল দেখে নাই? কেন সে বন্ধুদের কথা শুনিয়া আপনার সর্বশ্রেষ্ঠ ধনকে এম করিয়া অবহেলা করিয়াছে!
কালই মাদ্রাজ চলিয়া যাইবে। আজ বিকেলে উহাকে পার্টিতে লইয়া যাইতে হইবে দেখিবে সকলে, তপতীর স্বামী অপরূপ, অত্যাশ্চর্য্য!
বিকেলে সুসজ্জিত তপতী অপেক্ষা করিতেছিল, তপন আসিতেই তাহাকে পাক বসাইয়া স্বয়ং গাড়ী চালাইয়া চলিল। মুখখানি তাহার হাসিতে দীপ্ত হইয়া উঠিয়াছে, রঞ্জিৎ হইয়া গিয়াছে তাহার অন্তর আজ প্রেমের রক্তিমায়। যথাযোগ্য সম্বৰ্ধনার সহিত তপন। তপতীকে বসনো হইল। তপন ভাবিতেছে, তাহাকে এভাবে এখানে লইয়া আসিবার ক কারণ থাকিতে পারে তপতীর পক্ষে! তপতী কি আজ এতকাল পরে তাহাকে ভালবাসিতে আরম্ভ করিল নাকি! না-লোকের কথা বলা বন্ধ করিবার জন্যই তপতী খেলা খেলিতেছে! আপনার প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার জন্য তপতীর মতো মেয়ে সব করিতে পারে। কিন্তু তপতীর অদাকার আচরণ অত্যন্ত আন্তরিক। তপন নীরবে ভাবি লাগিল।
একটি মেয়ে বলিল,–আপনি নিরামিষ খান–এখানে অসুবিধা হবে না তো?
–না, কিছু না। মাংস ছুঁলেই আমার জাত যায় না।
—তাহলে খান না কেন? গোঁড়া তো আপনি নন দেখছি।
—অনেকগুলো কারণ আছে না-খাবার। তার মধ্যে বৈজ্ঞানিক কারণটা হচ্ছে—বহু যুগ ধরে সিদ্ধকরা খাদ্য খেয়ে আর শাকশজি খেয়ে মানুষের পাকস্থলী বেশী মাংস খাবার যোগ্যতা হারিয়েছে। যে-কোন মাংসাশী জন্তুর পাকস্থলীর সঙ্গে মানুষের পাকস্থলীর তুল করলেই সেটা বোঝা যাবে।
–অন্য কারণটা কি?
—পৃথিবীতে ফল-মূল-শস্যের তো অভাব নেই—মাংস খাওয়া নিষ্প্রোয়োজন, অন্তত আমাদের গরম দেশে অলস কৰ্ম্ম-জীবনে দরকার হয় না মাংস খাবার।
–মাংস কিন্তু শরীরে শক্তি সঞ্চয় করে!
–ওটা ভুল ধারণা। ঘোড়ার থেকে বেশি শক্তি নেই বাঘের; থাবা থাকলে ঘোড়ার সঙ্গে যুদ্ধে বাঘ নিশ্চয় হেরে যেত। ঘোড়া মাংস খায় না।
তপনের যুক্তির উৎকৃষ্ট সকলকে আকৃষ্ট করিল। মেয়েটি বলিল,—আরো কোনো কারণ আছে কি আপনার মাংস না-খাবার?
হ্যাঁ, মনের সাত্ত্বিকতা ওতে ক্ষুন্ন হয়। মনকে যারা লালন করতে চায় মানুষের মতো করে, এই উষ্ণ দেশে তাদের মাংস না খাওয়াই উচিত। পার্থিব চিন্তার ধারা হয়তো ওতে বিকৃত না হতে পারে কিন্তু পৃথিবীর ওপারের বিষয়ও চিন্তা করে এমন লোকের অভাব নেই।
