—হোলই বা তোমার নিজের কাজ। টাকা নাওনইলে আমি বড় দুঃখ পাবো।
তপন বড়ই বিপন্ন বোধ করিতে লাগিল। সত্য বলিলে মা বেশী দুঃখ পাইবেন। এই স্নেহশীলা নারীর ব্যথা চোখের সম্মুখে তপন দেখিতে পারে না,–কী জবাব দিবে? ক্ষণেক ভাবিয়া বলিল,নিজের কাজটা নিজের টাকায় করা কি বেশী পৌরুষের কথা নয়, মা? সন্তানগর্ব তাতে তো মায়ের বাড়াই উচিত-তপন হাসিয়া উঠিল।
মা নিরুত্তর রহিলেন। এ কথার পর কিছু বলতে যাওয়া চলে না। একটু ভাবিয়া কহিলেন,–কিন্তু থার্ডক্লাসে গেলে আমাদের যে অসম্মান হয়, বাবা! তোমার শ্বশুরের দিকটাও তো তোমার দেখা উচিত?
-–আচ্ছা মা সেকেন্ড ক্লাসে যাবো—কেমন, খুশী হয়েছেন?
মা চুপ করিয়া রহিলেন। তপতী বুঝিতে পারিল না, মা কেন টাকা লইবার জন্য তপনকে এত ব্যাকুল হয়ে সাধছেন। মার কোলের কাছে ঘেঁসিয়া সে কহিল,—পার্টিটার কথাও তুমি বলো মা।
তুই কেন বলতে পারিসনে, খুকী? শুনছো বাবা, শনিবার তোমাদের একটা পার্টি আছে-যেতে হবে তোমায়, বুঝলে?
—আমার না-গেলে হয় না, মা?-আমি তো কোনদিন যাইনি।
বাবা, যাও না বলে আমাদের কথা শুনতে হয়। লোকে বলে জামাইকে আমরা লুকিয়ে রেখেছি। তুমি তো লুকোবার মতো জামাই নও, বাবা আমাদের সম্মান তুমি রক্ষা করবে তো
তপন নীরবে খাইতে লাগিল। মা আবার বলিতে লাগিলেন, এখানে না-থাকলেও অবশ্য কথা ছিল না, কিন্তু বাড়িতে থেকেও তুমি সমাজে মুখ দেখাবে না, এ আমাদের বড় লজ্জার কথা। খুকী দুঃখ করে।
আচ্ছা, মা, যাবো—বলিয়া তপন উঠিল।
তপন বাহিরে যাওয়ার পর তপতী মাকে প্রশ্ন করিল,—কিছুই কি নিতে চায় না মা? টাকা নেবার জন্য তুমি এত সাধাসাধি কেন করছো?
–খুকী, কিছুই নেয় না। ওর দুশ টাকা মাসোহারার সব টাকাই আমার কাছে জমা রয়েছে, একটি পয়সা কোনদিন নেয়নি।
—তাহলে দুলাখ টাকা নিয়েছে, শুনলাম যে? সে কথা মিথ্যে?
–না। দুলাখ টাকা ও নিয়েছে, কিন্তু কি যে করলো সে-টাকা নিয়ে তার কোন খবর পাচ্ছি না আমরা। জিজ্ঞাসা করতেও ভয় হয়, বাছা–ও অদ্ভুত ছেলে। যদি অপমান করে বলে বসে–চল্লুম আপনার বাড়ি থেকে, তাহলে নিশ্চয় তখুনি চলে যাবে।
কি করে বুঝলে তুমি? টাকা দুলাখ নিশ্চয় নিয়েছে মা, নইলে ওর এইসব হিল্পী দিল্লী যাওয়ার খরচ জুটছে কোথা থেকে?
—ও টাকা সে নিজের জন্য নেয়নি, খুকী। আমায় কতবার বলেছে, আপনার স্নেহঋণ কি করে শুধবো তাই ভাবছি, মা, টাকা নিয়ে আর ঋণভার বাড়াতে চাইনে। কারও দান গ্রহণ করে না, কখনও মিথ্যা বলে না ও। একদিন এসে বলল-দিন মা ভাত। ভাত রান্না হয়নি বলে বললাম, ভাত তে, রাধিনি বাবা। তাতে বললে কি জানিস,—বললে রান্না তবে করুন, মা-নাহলে চাকরদের ভাত আনিয়ে দিন। ভাত খাব বলেছি, ভাতই খেতে হবে, নইলে মিথ্যা কথা বলা হবে। সেই রাত্রে চাকরদের ভাত ওকে দিতে হল খেয়ে আবার বললে, আপনার বাড়িতে চাকররা কেমন খায়, মা, সেটা দেখে নিলুম কেমন কৌশলে—আপনি বুঝতেই পারলেন না।
তপতী বিমূঢ়ের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিল; তারপর করুণ কণ্ঠে কহিল,—এসব কথা তুমি আমায় একদিনও তত বল নি, মা!
–তুই-যে কিছু খবর রাখিস না, তা আমি কেমন করে জানবো, বাছা?
তপতী আর কথা না বাড়াইয়া নিজের ঘরে চলিয়া গেল। ভুল তাহার হইয়া গিয়াছে অত্যন্ত সাংঘাতিক ভুল, সংশোধনের উপায় আছে কিনা কে জানে!
তপতী সারারাত্রি বসিয়াই কাটাইয়া দিল।
জীবনের ধারাই যেন বদলাইয়া যাইতেছে তপতীর। স্নান সারিয়াই সে আসিয়া দাঁড়াইল তপনের কক্ষের সম্মুখে! পূজারত তপন স্তোত্র পাঠ করিতেছে,শরণাগত দীনার্ত-পরিত্রাণপরায়ণে, সর্বস্যার্তিহরে দেবী নারায়ণি নমোহস্তুতে। তপতীও সঙ্গে সঙ্গে আবৃত্তি করিয়া গেল মনে মনে। এমনি কত-কিছুই সে তাহার ঠাকুরদার কাছে শিখিয়াছিল সবই প্রায় ভুলিয়া গিয়াছে। অথচ এই মহার্ঘ রত্নগুলি রহিয়াছে তাহারই স্বামীর কণ্ঠে। হ্যাঁ স্বামী! তপতীর যে আজ তপনকে স্বামী ভাবিতে অত্যন্ত তৃপ্তি বোধ হইতেছে। কেন কে এতদিন দেখে নাই তপনকে? কেন এতবড় ভুল করিল। ঐ-যে সুমিষ্ট কণ্ঠের প্রণতি ঝরিতেছে–
অম্ভোধরশ্যামলকুন্তলায়ৈ, বিভূতিভূযাঙ্গ-জটাধরায়,
হেমাঙ্গদায়ৈ চ ফণাঙ্গদায়, নমঃ শিবায়ৈ চ নমঃ শিবায়।।
কী অপরূপ সুন্দর ঐ শ্লোক-মালা! শেলী, কীটস, বায়রণ, টেনিসন সুন্দর সন্দেহ নাই কিন্তু ঐ যে–অরণ্যে শরণ্যে সদা মাং প্রপাহি, গতিস্তং গতিস্তং ত্বমেকা ভবানি—উহাই কি কিছু কম সুন্দর, কম আন্তরিকতাপূর্ণ!
তপতীর মনে হইল, ঠাকুরদা বাঁচিয়া থাকিলে তাহার আজ এই দুর্গতি হইত না। কিন্তু ঠাকুরদা তাহার কাজ যথাসম্ভব করিয়া গিয়াছেন, মোল বৎসর পর্যন্ত তিনি তপতীরে শিখাইয়া গিয়াছেন আৰ্য্যনারীর কর্তব্য–স্বামীর প্রতি, সংসারের প্রতি, সমাজের প্রতি। আধুনিক সমাজের সহিত সে পদ্ধতি হয়ত মিলে না কিন্তু তপতী সমন্বয় করিতে পারিল না কেন? কেন সে ঠাকুরদার এতদিনের শিক্ষা একেবারে ভুলিয়া গেল।
তপতীর মনে হইল তাহার পিতামাতাই ইহার জন্য দায়ী। একদিন তপতীর অন্তর ছিল শুষ্ক হোমাগ্নির মতো পবিত্র, আজ তাহা বাড়বাগ্নি হইয়া উঠিয়াছে। দুটাই অগ্নি, কিন্তু তফাৎ আছে; কত বেশী তফাত তাহা হোমশিখা যিনি না দেখিয়াছেন, তিনি বুঝিবেন না। তপতীর মনে পড়িল—জন্মদিনে তপন তাহাকে আশীর্বাদ করিয়াছিল—জীবনে তোমার হোমশিখা জ্বলে উঠুক—হয়তো আজ তাই হোমশিখা জ্বলিয়া উঠিয়াছে, কিন্তু ঋত্বিক তো আসিতেছে না! আসিবে, আসিবে, তপতীর জীবনে তাহার পিতামহের আশীর্বাণী ব্যর্থ হইবে না।
