-কিন্তু আমি সেটা প্রার্থনা করছি। আমি চাইছি আপনার বন্ধুত্ব।–ক্ষমা করবেন মিঃ বোস–আমি জীবনে অসত্য কথা উচ্চারণ করিনি; আমার অভিধানের অত্যাগ সহনো বন্ধু সঠিক অর্থে আপনাকে পাচ্ছিনে–আপনাকে বন্ধু ভাবা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না।
মিঃ বোস নীরব হইয়া গেলেন। অপমানিত বোধ করলেন তিনি। মুখখানি তাহার কালো হইয়া গেল। তপন পুনরায় কহিল, হয়তো আপনি দুঃখ পাচ্ছেন, কিন্তু উপায় কি বলুন? আমার নীতি জগতের কিছুর জন্যই বদলায় না। আপনার সঙ্গে আমার আলাপ মাত্র দুদিন পড়লো আজই। এর মধ্যে এমন কিছু হয়নি যে, আমার বিরহে আপনি বুক ফাটাবেন বা আপনার জন্য আমি বুক ফাটাবো। অবশ্য, বন্ধু না বলে আলাপী বলা যেতে পারে!
মিঃ বোস যেন বিদ্রূপ করিবার জন্য বলিলেন—এরকম বুক ফাটা বন্ধু আপনার কজন আছেন, মিঃ গোস্বামী?
বিদ্রূপটাকে গ্রাহ্যমাত্র না করিয়া তপন উত্তর দিল,–বেশী তো পাওয়া যায় না, মাত্র একজন আছে।
—আশা করি তিনিও আপনার মতো সংস্কৃত সূত্র মিলিয়ে বন্ধুত্ব করেন?
–তিনি কী করেন, আমার তো জানার দরকার নেই, মিঃ বোস। আমি যা করি তাই আপনাকে বললাম–তপন উঠিয়া গিয়া তপতীর ললাট-আহৃত ক্ৰীষ্টার তৈলাক্ত পদার্থটা গঙ্গার জলে ধুইতে বসিল।
মিঃ বোস চাহিলেন তপতীর দিকে সহাস্যে। স্মিতমুখে বলিলেন এমন অদ্ভুত গোঁড়ামী আর দেখেছেন, মিস চ্যাটার্জি? ধন্য আপনার ধৈৰ্য্য, ওর সঙ্গে এতক্ষণ বসে রয়েছেন।
–আপনার অধৈৰ্য্য বোধ হয়ে থাকে তোত চলে যান–বলিয়া তপতী উঠিয়া বসিল এবং তপনের অত্যন্ত নিকটে গিয়া বলিল,–চলন, বাড়ী যাই-—ভালো লাগছে না এখানে।
নিস্পৃহের মতো তপন গাড়ীতে আসিয়া বসিল, তপতী পাশে বসিয়াই বলিল,–চলুন, খুব জোরে চালাবেন না লক্ষ্মীটি! ভয় করে।
মিঃ বোস যে ওখানে তখনও বসিয়া আছে তপতী লক্ষ্যমাত্র করিল না। সারা পথ সে তপনের বাম বাহুতে মাথা রাখিয়া চুপ বসিয়া রহিল-তপন একটা কথাও কহিল না, একবারও জিজ্ঞাসা করিল না তপতীর ব্যথাটা সারিয়াছে কিনা।
গাড়ী গেটে ঢুকিতে দেখিয়া তপতী মাথা তুলিল। বুকের আটকানো নিশ্বাসটা যেন তাহাকে রিক্ত-সৰ্বস্ব করিয়াই বাহির হইয়া যাইতেছে!
পরদিন কলেজ হইতে ফিরিতেই মা বলিলেন,–আয় খুকী, কিছু রান্না কর দেখি?
তপতী কুষ্ঠিতপদে আসিয়া কহিল,—আজ থাক মা–ও ভাববে, তুমি আমায় প্ররোচিত করেছ, নিজের ইচ্ছায় আমি রান্না করিনি-দুদিন যাক তারপর রাঁধবো।
মা কথাটার মূল্য উপলব্ধি করিলেন।
তপতী কহিল,—ও তো রবিবারে যাবে, মা, শনিবার একটা পার্টি আছে, ও না গেলে কিন্তু আমি যাবো না—লোকে বড় কথা বলে।
—তা তুই বলিনে কেন? অত লাজুক তো তুই নোস্ খুকী?
–লজ্জা নয়, মা, ও এড়িয়ে যায় নানা ছুতোয়—তুমি তো জানো না–বড্ড চালাক ও! আর দেখো মা, এবার যেন ও থার্ডক্লাসে না যায়, বলে দিয়ো তুমি—তপতী একটা বালিশের ওয়াড়ে ফুল তুলিতেছিল। মাকে বলিল,–এটা ওর বিছানার সঙ্গে দিতে হবে, মা, কী লিখবো বলো তো?
মা হাসিয়া বলিলেন—আচ্ছা মেয়ে তুই, কী লিখবি আমি তার কি জানি? নিজে না জানিস, ওকেই জিজ্ঞাসা করিস।
-–ও কথাই বলতে চায় না—গম্ভীর মেজাজ! ভয় করে আমার।
মোটে গম্ভীর নয়, খুকী তবে এই কদিন বোধ হয় একটু ব্যস্ত আছে, তাই—তপন আসিয়া ঢুকিল খাইবার জন্য। মা হাসিয়া বলিলেন, তুমি কেন এত গম্ভীর হচ্ছো বাবা, তপন? এর মধ্যে এমন বুড়ো তুমি কিছু হওনি! বড্ড কাজের মানুষ হয়েছে, না? কথা বলো না কেন?
উচ্চহাস্য করিয়া তপন বলিল,–আমাদের বয়সের কাটাটা আপনার ঘড়িতে ঠিক আপনার প্রয়োজন মতোই চলেনা মা? কিন্তু কী কথা শুনতে চান–বলুন?
—যে কোন কথা বলল, বাবা—গম্ভীর-হওয়া তোমার মানায় না।
আচ্ছা—মা যদি তুই আকাশ হতিস, আমি চাঁপার গাছ—
তোর সাথে মোর বিনি-কথায় হোতি কথার নাচ!
শুনলেন কথা: আপনি আকাশ তো আছেই, আমি চাপা গাছ হতে পারবে বলে মনে হচ্ছে-বোশেখের খররোদে ফুটবে আমার ফুল, যখন আর সব ফুলের মেলা শেষ হয়ে যাবে, সাঙ্গ হয়ে যাবে বাসন্তী-উৎসব।
–মা তপনের বেদনাহত চিত্তের সন্ধান জানেন না; কিন্তু তপতীর অন্তর আলোড়িত করিয়া আজ অসাগর উদ্বেলিত হইয়া উঠিতেছে–কষ্টে আত্মসংবরণ করিয়া সে দাঁড়াইয়া রহিল। তপন স্মিতমুখেই খাইতে বসিয়াছে।
মা বলিলেন,–মাদ্রাজে যাবে বাবা, তোমার বিছানাপত্র সব ঠিক করতে হবে। খুকী একটা ওয়াড় তৈরী করছে কী লিখবে, ওকে বলে দাও তো।
–কিছু তো দরকার নেই বিছানা আমার ঠিক আছে। কিছু লাগবে না, মা!
কোথায় ঠিক আছে, বাবা! তোমার বোনর বাড়ি? তাহলে ওয়াড়টাই নিয়ে শুধু। ঘরের জিনিস বাইরে কেন নিয়ে যাব, মা–বাইরের জিনিস ঘরে আনাই তো দরকার।
তপতী অত্যন্ত বিষণ্ণ হইয়া উঠিল! তাহার পাণ্ডুর মুখশ্রী দেখিয়া মা অত্যন্ত কষ্টবোধ করিলেন, কিন্তু তপনের সহিত বেশী কথা বলিতে তাঁহার ভয় করে। আজন্ম সত্যনিষ্ঠ এই ছেলেটি একবার না বলিয়া বসিলে চেষ্টাতেও হাঁ হইবে না। অন্য কথার জন্য মা বলিলেন,–এবার কিন্তু তোমার রিজার্ভ-গাড়ীতে যেতে হবে, বাবা, কথা শুনো মায়ের।
-ওরে বাপরে! রিজার্ভ-গাড়ীতে তো রোগী আর ভোগীরা যায়, মা! আমি ভোগী তোনই-ই, আপনার আশীর্বাদে রোগও নেই কিছু আমার।
–দুষ্টুমি কোরো না, বাবা, আজই গাড়ী রিজার্ভ করে গিয়ে; টাকা নিয়ে যাও।
—আমি তো অফিসের কাজে যাচ্ছি না, মা। নিজের কাজে যাচ্ছি।
