গাড়ীর দরজা খুলিয়া তপন নামিয়া পড়িল। তপতী বিস্মিতা, ব্যথিতা, বিপন্না বোব করিতে লাগিল। আপনাকে এতখানি অসহায় তাহার কোনদিন মনে হয় নাই। চাহিয়া দেখল, তপন গঙ্গার জলের ধারে গিয়া দাঁড়াইয়াছে। তপতীও নামিল এবং একটা আকন্দগাছ হইতে ফুলগুচ্ছ ছিঁড়িয়া তপনের গায়ে ছুঁড়িয়া দিতে দিতে কহিল-ফুলের ঘায়ে মুচ্ছা যায় তার নামটি কি! বলুন তো?
তপন পিছন ফিরিয়াই দাঁড়াইয়া রহিল। তপতীর এই নির্লজ্জ ন্যাকামী তাহার চিরসহিষ্ণু অন্তরকেও অসহিষ্ণু করিয়া তুলিতেছে। যে নারী দিনের পর দিন বিবাহিত স্বামীর অন্তরকে অপমানে বিদীর্ণ করিয়া দিয়াছে—একবার ফিরিয়া দেখে নাই কতখানি শাণিত ক্ষরণ হইল, যে স্বেচ্ছায় অন্য পুরুষের অঙ্গে শয়ন করিয়া স্বামীর কাছে মুক্তি মাগিয়া লয়—আজ আবার কোন সাহসে সে স্বামীর সঙ্গে রঙ্গ করিতে আসে!
ইহাই কি আধুনিকার প্রগতি! কিন্তু তপন কাহাকেও আঘাত করে না—তপতীকেও কিছু বলিল না।
তপতী আশা করিয়াছিল, তাহার কবিতার উত্তরে তপন বলিয়া উঠিবে—তার নাম তপতী। কিছুই তপন বলিল না, এমন কি মুখ ফিরাইল না দেখিয়া তপতী অত্যন্ত মুষড়াইয়া পড়িল। তাহার এতক্ষণকার ব্যবহার মনে করিয়া লজ্জায় তাহার মরিয়া যাইতে ইচ্ছা হইতে লাগিল। নিরুপায়ের শেষ অবলম্বনের মতো সে শুধু বলিল,–বসবেন না একটু?
তপন নীরবে আসিয়া একটু দূরেই বসিল। সবুজ তৃণমণ্ডিত মাঠে একান্ত আত্মীয় দুইটি মানবের একান্ত নীরবতা বুঝি প্রকৃতিকেও পীড়িত করিতেছে—কোথায় একটা পাপিয়া ডাকিয়া উঠিল-পিউ কাহা? তপতী নির্ভুলভাবেই বুঝিয়াছে, তপন আর কথা কহিবে না! উপায়হীনা তপতী উঃ বলিয়া সেই ঘাসের উপরই তপনের হাঁটুর কাছে মাথা রাখিয়া শুইয়া পড়িল।
হয়তো সত্যিই উহার কষ্ট হইতেছে! কারুণ্য কোমল তপন সস্নেহে হাত দিল তপতীর ললাটে। মাথা ধরার কিছুমাত্র লক্ষণ নাই, দিব্যি শীতল স্নিগ্ধ স্পর্শ কপাল, রগ-দুটি যথাসম্ভব স্বাভাবিক ভাবেই টিপটিপ করিতেছে। এই মিথ্যাবাদিনী ছলনাময়ী নারীকে তপন বিবাহ করিয়াছে! ঘৃণায় তাহার সর্বাঙ্গ শিহরিয়া উঠিল! কিন্তু কিছুই সে বলিল না, তপতীর শীতল মসৃণ কপালে তাহার নিপুণ অঙ্গুলি চালনা করিতে লাগিল। আরামে তপতীর চক্ষু বুজিয়া আসিতেছে। এক এক বার সে ভাবিতেছে তপনের হাঁটুর উপর মাথাটা তুলিয়া দিলে কেমন হয়—কিন্তু থাক, অতটা বাড়াবাড়ি দরকার নাই—যদি নিজেই তুলিয়া লয় তো আরো ভালো হইবে।
–নমস্কার—
০৯. তপতী সবিস্ময়ে চাহিয়া দেখিল
তপতী সবিস্ময়ে চাহিয়া দেখিল মিঃ বোস তপনকে নমস্কার করিতেছে। তপতীকে চোখ খুলিতে দেখিয়াই কহিল,–মাসিমার কাছে শুনলাম আপনার মাথাব্যথা, তাই এলাম সন্ধান করে করে। কেমন, বোধ করছেন এখন? অ্যাসপিরিন খাবেন?
মিঃ বোসের এত কথার জবাবে তপতী কিছু না বলিয়া পুনরায় চোখ বুজিল। তাহার অত্যন্ত রাগ হইতেছে—কি জন্য আসে সেই মিষ্টার বোস? সে স্বামীর সহিত বেড়াইতে আসিয়াছে, মাথা ধরুক আর মরিয়া যাক–তিনি দেখিয়া লইবেন; মিঃ বোরে অ্যাসপিরিন লইয়া দরদ দেখাইতে আসিবার কী প্রয়োজন। কিন্তু তপতীর সঙ্গে সঙ্গে মনে হইল—কাটার যে জাল সে এতকাল ধরিয়া নিজের চারিদিকে বয়ন করিয়াছে, তাহা হইতে মুক্তি পাইতে হইলে হাতপা এক-আধটু ছড়িয়া যাইবেই। অন্য কোনো অঘটন ঘটিবার আশঙ্কায় তপতী কথাই কহিল না। চতুর মিঃ বোস তপতীর মনের ভাব বুঝিয়া ফেলিলেন। হ্যাঁ, মাঝে মাঝে স্বামীর সহিত বেড়াইতে আসিলে লোকে মন্দ বলিবে! তপতীর আজিকার অভিনয় একটা বিশেষ ধাপ্পা। কহিলেন,
—ওয়েল, মিঃ গোস্বামী, আমি আবার মার্জনা চাইছি আপনার কাছে।
—কি হেতু?—-তপন পরম ঔদাসীন্যের সহিত প্রশ্ন করিল।
–সেইদিনকার ব্যাপারটার জন্য সত্যিই আমি লজ্জিত।
তপনের মনটা একেই তো তপতীর লজ্জাকর অভিনয়ে তিক্ততায় ভরিয়া ছিল, তার উপর মিঃ বোসের আগমনের সঙ্গে এবং দ্বিতীয়বার ক্ষমা চাওয়ার সঙ্গে চতুরা তপতীর কোনো উদ্দেশ্য যুক্ত আছে কিনা সে বুঝিতে পারিতেছে না–যথা সংযত হইয়াই উত্তর দিল, সে কথা আর নাই বা বললেন, মিঃ বোস। আর অপরাধ তো আপনার কিছু নয়—ওর পিছনে ছিল যার সমর্থন, অপরাধ যদি কিছু ঘটে থাকে তো, সে তার। কিন্তু যারই হোক—আমি সর্বান্তঃকরণে ক্ষমা করছি। বার বার এক কথা বলার দুঃখ থেকে আমায় রেহাই দিন—এই মিনতি করছি আমি।
তপতীর মাথাটা ভূমি হইতে উর্ধ্বে উঠিয়া পড়িল। তপন এমনি করিয়া ভাবিতে পারে। মিঃ বোসের কৃত আচরণের অন্তরালে রহিয়াছে তপতীর সমর্থন! তপনের মননশীলতাকে তপতী আজ কি বলিয়া মিথ্যা প্রমাণ করিবে? আর, মিথ্যা তো নয়! তপতীর সমর্থন না। পাইলে মিঃ বোসের সাধ্য কি যে তপনের অসম্মান করে। তপতী চাহিল তপনের মুখের দিকে। মুখ অন্যদিকে ফিরানো রহিয়াছে—তপতী বুঝিল, সে মুখে রাগ বা দ্বেষের কোনো চিহ্ন নাই।
মিঃ বোস বড় থতমত খাইয়া গিয়াছিলেন! একটু সামলাইয়া কহিলেন, আপনাকে আমরা ভুল বুঝেছিলাম, মিঃ গোস্বামী। আজ কিন্তু সত্যিই আপনাকে আমরা বন্ধুভাবে পেতে চাই–নাউ উই মাষ্ট বি ফ্রেন্ড।
তপন চুপ করিয়া রহিল। তপতীর মাথায় হাত তাহার সমানে চলিতেছে।
—চুপ করে আছেন যে মিঃ গোস্বামী? আমার বন্ধুত্ব আপনি স্বীকার করলেন তো?
-আমি অত্যন্ত দুঃখিত, মিঃ বোস–আপনার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব কি করে সম্ভব হতে পারে। আমি দীন, দরিদ্র, নগন্য, অশিক্ষিত মানুষ-আপনারা অভিজাত; আপনার সঙ্গে বন্ধুত্বের কথা বলা আমার পক্ষে অপ্রাসঙ্গিক নয় শুধু, অসম্ভব
