বিস্ময়ের সুরে তপন বলিল, কেন মা, আপনি যেদিন যা দিয়েছেন খেয়েছি তো? তবে আমি পরিমাণে কম খাই।
মা পুনরায় কহিলেন, কিন্তু বাবা, খুকী সেদিন যা-কিছু রান্না করলে, তুমি খেলে না।
তপন অকস্মাৎ গম্ভীর হইয়া গেল! বাহিরে তপতী সাগ্রহে কান খাড়া করিয়া আছে, তপন কি বলে শুনিবার জন্য। তপন ধীরে ধীরে বলিল, কথাটার জবাব দিতে চাইনে মা, ব্যথা পাবেন আপনি।
বিস্মিতা মাতা ব্যাকুল হইয়া কহিলেন,–তা হোক বাবা, তুমি বলো,–বলল কিজন্যে তুমি খাওনি? বলল, শুনতে চাই আমি–
-মার মনে ব্যথা দেওয়া উচিত নয়, মা–তাই বলতে চাইছি নে।
না বাবা, তোমায় বলতেই হবে।-মার নির্বন্ধাতিশয্য বাড়িয়া গেল!
নিরুপায় তপন কোমল কণ্ঠে কহিল,–আপনার খুকী তো আমার জন্য কিছু কোনদিন রান্না করেনি,—মা-যেদিন যা-কিছু করেছে, সবই তার বন্ধুদের জন্য। আর আমার বোন আমার জন্য পাটিসাপ্টা তৈরী করে আঁচল ঢেকে বসে থাকে—যেতে দুমিনিট দেরী হলে চোখের জলে তার বুক ভেসে যায়। তার সঙ্গে আপনার খুকীর তুলনা করবেন না, মা—সে তো প্রগতিশীল তরুণী নয়, ভাইএর বোন সে–
মা একেবারে মুক হইয়া গেলেন। বাহিরে তপতীর অন্তর বিপুল বিস্ময়ে স্তম্ভিত হইয়া গিয়াছে! এতবেশী সেন্টিমেন্টাল ও! এত তীক্ষ্ম লক্ষ্য উহার!
কিছুক্ষণ সামলাইয়া মা কহিলেন,—খুকী বড় ছেলেমানুষ, বাবা-–বোঝে না।
কলহাস্যে ঘরের বিষাক্ত হওয়াটা উড়াইয়া দিয়া তপন অতি সহজকণ্ঠে কহিল,–আমি কি বলেছি, মা, সে বুড়ো মানুষ। আপনি তো বেশ উল্টো চার্জে ফেলেন। খাওয়া হইয়া গিয়াছে, তপন উঠিয়া আপনার ঘরে চলিয়া গেল।
পরদিন সকালে আসিয়াই তপন করুণ কণ্ঠে কহিল,কাল আপনাকে কথাগুলো বলে মনে বড় কষ্ট পেয়েছি মা—সত্যি বলুন, আপনি দুঃখ পাননি?
—তুমি আমার বড় উপকার করেছ, তপন, দুঃখ পাবার আমার দরকার ছিল।
-খুব বড় কথা বললেন, মা–দুঃখ পাবার মানুষের দরকার থাকে। এই পৃথিবীতে দুঃখের চাকায় আমাদের মন-মাটি মানুষের মূর্তিতে গড়ে ওঠে। তাই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন:
বজ্রে ভোলো আগুন করে আমার যত কালো
তপন খাইতে আরম্ভ করিল। মা দেখিতে লাগিলেন, দরজার আড়ালে তপতীর অঞ্চলপ্রান্ত দুলিতেছে। ডাকিলেন, আয় খুকী-খাবি আয়।
তপতী আসিতে আজ সঙ্কুচিত হইতেছে। মা বলিলেন, লজ্জা দেখো মেয়ের! আয়। ও কাল কি বললো জানো বাবা, তপন? বললো, তোমার জামাইএর জন্য খাবার করবো বলতে আমার লজ্জা করে-জামাই তোমার বোঝে না কেন?
বিস্ময়ে হতবাক তপন দুই মুহূর্ত পরে উত্তর দিল,লজ্জার একটা সুমিষ্ট সৌরভ আছে, মা, আপনার খুকীর আচরণে এযাবৎ সেটা পাইনি। কিন্তু মা ও কথা এবার বন্ধ করুন! অপ্রিয় আলোচনা না করাই ভালো, মা।
–হ্যাঁ বাবা, থাক—পাছে কেঁচো খুঁড়তে কেউটে উঠিয়া পড়ে, ভয়ে মা আর কোন কথাই তুলিলেন না। তপন চলিয়া গেলে তপতীকে কহিলেন,—তোর কিন্তু এতোটুকু বুদ্ধি নেই খুকী, মিছেই লেখাপড়া শিখছিস।
তপতী আজ এই ভৎসনা মাথা পাতিয়া গ্রহণ করিল! তাহার জন্মজ্জিত সংস্কার আজ যেন তাহাকে চাবুক মারিয়া বুঝাইতেছে, আপনার স্বামীকে চিনিয়া লইবার ক্ষমতাটুকু পৰ্য্যন্ত সে এত বিদ্যাতেও অর্জন করে নাই। মার কথার বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ না করিয়া তপতী হাসিল–এবং আপন ঘরে গিয়া সারাদিন ভাবিয়া একটা প্ল্যান খাড়া করিয়া ফেলিল!
বিকালে জলযোগের জন্য তপন আসিতেই মা কহিলেন—খুকীর বড্ড মাথা ধরেছে, বাবা, ভীষণ কাতরাচ্ছে। ওকে একটু বেড়িয়ে আনো
-মাথা ধরেছে? কিন্তু আমার সঙ্গে বেড়িয়ে ও বিশেষ কিছু আনন্দ পাবে না, মা–ওর বন্ধুদের সঙ্গে যেতে বলুন না? গল্প করলে মাথা ধরা সেরে যাবে শিঘ্রী।
তপতী সোফায় শুইয়া সব শুনিতেছিল। নিতান্ত করুণ কণ্ঠে কহিল—থাক মা যেতে হবে না—ওর হয়তো কাজ আছে। না হোক বেড়ানো আমার–
তপন বিস্মিত হইয়া কহিল,—আমি না গেলে বেড়ানো হবে না কেন, বুঝতে পারছি, মা-রোজই তত বেড়াতে যায়।
তপতীর আর বলিবার মতো কথা ফুটিতেছে না। মা ব্যাপারটা বুঝিলেন। কহিলেন,—এতকাল ছেলেমানুষ ছিল, বাবা, চিরকাল কি আর বন্ধুদের সঙ্গে যায়?
তপন হো হো করিয়া হাসিয়া উঠিল। সুমিষ্ট হাসসা সারা বাড়িটা মুখরিত হইয়া উঠিল। বলিল—বেশ যা-হোক, মা, গতকালই বলেছেন, আপনার খুকী ছেলেমানুষ—আর আজই বড় হয়ে গেল! আপনার বাপের বাড়িতে তাই হয় বুঝি? ঝিঙে, বেগুন, করলা দুইবেলা কিন্তু বাড়ে, মা—আপনার খুকী কি তাহলে…
তপনের বলার ভঙ্গীতে খুকী অবধি হাসিয়া ফেলিল।
মা বলিলেন, দুষ্টুমি কোরো না, বাবা-যাও দুজনে বেড়িয়ে এসো গে—
-–আচ্ছা, মা–যথাদেশ-বলিয়া তপন গাড়ীতে আসিয়া উঠিল।
চল্লিশ, পঞ্চাশ, ষাট মাইল বেগে গাড়ী চলিতেছে। কাহারও মুখে কথা নাই। তপ বাঁ হাতে কপাল টিপিয়া বসিয়া আছে। তপনের দৃষ্টি দূর দিকচক্রে সমাহিত। হুড়-শূন্য গাড়ীর উপর দিয়া যেন ঝড় বহিয়া যাইতেছে। তপতী মাথাটা টিপিয়া বার দুই উঃ-আঃ করিল। তপন নির্বিকারে গাড়ী চালাইতেছে। তপতী মাথার চুলগুলো এলাইয়া দিল। তপনের চোখে-মুখে লাগিতেছে—তপন মুখটা সবাইয়া লইল। ঘাড়টা কাত করিয়া তপতী পিছনের ঠেসায় রাখিল, তপনের বাম বাহুতে তাহার মাথা ঠেকিতেছে—তপন নির্বিকারে গাড়ীর গতিটা বাড়াইয়া দিল। তপতী ওগো, মাগো বলিয়া মাথাটা তপনের বুকের অত্যন্ত নিটে তানিয়া ফেলিয়েছে—তপনের নিঃশ্বাস তাহার ললাট স্পর্শ করিবে—তপন অকস্মাৎ গাড়ীর গতি অত্যন্ত মন্দ করিয়া দিল, এবং একটু পরেই থামাইয়া ফেলিল। ঘাড় তুলিয়া তপতী চাহিয়া দেখিল, গঙ্গার কূলেই তাহারা আসিয়াছে।
