সমস্ত রাত্রিটাই দুশ্চিন্তায় কাটিয়া গেল তপতীর। চিন্তার পর চিন্তার তরঙ্গ যেন আছড়াইয়া পড়িতেছে তাহার মনের উপকুলে। তপনের সহিত তাহার এই কয়মাসের ব্যবহার স্মৃতিসাগর মথিত করিয়া তপতী কুড়াইয়া ফিরিতেছে—কিন্তু যতদূর দৃষ্টি যায়, যাহা কিছু দেখে, সর্বত্রই তপন নির্বিকার, নির্দোষ সে না হইতে পারে কিন্তু নির্লিপ্ততা সে অক্ষুন্ন রাখিয়াছে! তপতীর বারম্বার অসম্মানের আঘাতেও তপন অবিচল রহিয়া গিয়াছে—আর আজ সেই আঘাতগুলিই তপতীর অপরিসীম লজ্জার কারণ হইয়া দাঁড়াইল।
তপন তাহাকে মুক্তি দিয়াছে? সত্যিই কি সে আজ তপনের সহিত বিবাহ বন্ধন হইতে মুক্ত? বেশ ভালো কথাই তো। কিন্তু কেন যেন আনন্দ.আসিতেছে না। এতদিন যে লোকটিকে কেন্দ্র করিয়া তপতী তাহার দুঃখের বিলাসকুঞ্জ রচনা করিতেছিল, আজ যেন সে কুঞ্জ সমূলে ধ্বসিয়া গিয়াছে। অবাধ অসীম বিস্তারের মধ্যে আজ তপতী যাহাকে ইচ্ছা গ্রহণ করিতে পারে—তপন আর কিছুই বলিবে না। সে বলিয়াছে—তপতীর উপর তাহার আর কোনো দাবী নাই। নিতান্ত নিস্পৃহের ন্যায় সহজ সুরেই তপন আজ কথা কয়টা বলিয়াছে। সত্যই কি তাহাকে মুক্তি দিয়াছে তপন? হ্যাঁ দিয়াছে। তপতী মুক্তি চাহিয়াছিল—শুধু চাহিয়াছিলই নয়, মিঃ ব্যানার্জির কাধে মাথা রাখিয়া তপনকে নিঃসংশয়ে বুঝাইয়া দিয়াছিল, তাহাকে সে চাহে না—তাহাকে সে গ্রাহ্য করে না। এতদিনের এত আঘাতেও যে তপন এতটুকু বিচলিত হয় নাই, সেদিন সেই তপন শরাহত মৃগশিশুর মতো কাদিয়াছে,—অজস্র উদ্বেলিত অশ্রুধারায় প্রক্ষালিত করিয়া দিয়াছে তাহার পূজার বেদীমূল, আর তপতী নির্লিপ্ত নিষ্ঠুরতায় সে কান্না দেখিয়াছে—বিদ্রূপ করিয়াছে, বিরক্ত হইয়াছে।
তপনকে আজ বলিবার মত তপতীর আর কি থাকিতে পারে? হয়তো ক্ষমা চাহিবার অধিকারটুকুও তাহার লুপ্ত হইয়া গেছে। হাঁ, তপতী আজ সত্যই মুক্ত, স্বাধীন, স্বাতন্ত্র। কিন্তু তপন আজও রহিয়াছে কেন? সুদীর্ঘকাল বারম্বার অপমান সহ্য করিয়াও যে-লোক এ গৃহ ত্যাগ করে নাই, সে নিশ্চয়ই এত সহজে তপতীকে ত্যাগ করিবে না। না-না-না-তপতী বৃথাই ভাবিয়া মরিতেছে।
আশ্বস্ত হইয়া তপতী খানিকটা ঝিমাইয়া লইল। তপনের চলিয়া যাওয়াটা তাহার পক্ষে কত বড় ক্ষতি ইহা সে ঠিক বুঝিতে পারিতেছে না; কিন্তু তাহার থাকায় যে কিছু লাভ আছে; ইহা যেন তপতীর আজ বার বার মনে হইতেছে মাবাবা উহাকে স্নেহ করেন সে নিশ্চয়ই এই বাড়িতেই থাকিবে। আপাতত তপতীকে ভয় দেখাইবার জন্য বলিয়াছে—মুক্তি দিলাম। মুক্তি অত সহজ কিনা? এ-তো আর চার টাকায়-কেনা পাখি নয়! আর যদিই বা মুক্তি দেয় তো ক্ষতিটা কি? তপতী উহার জন্য কাঁদিয়া মরিয়া যাইবে না। বাড়িতে আছে, থাক—আরো কিছু টাকা লইতে চায়, লউক! তপতী উহাকে আর বিরক্ত করিবে না। দুজনেই তাহারা আজ হইতে স্বাধীনভাবে চলিবে।
তপতী হাসিয়া ফেলিল। তপন তো তাহার স্বাধীনতায় কোনদিন হস্তক্ষেপ করে নাই। তপতী চিরদিনই স্বাধীনা আছে, এবং থাকিবে।
ভোর হইয়া গিয়াছে। বীতবৰ্ষণ আকাশের কোমল আলোক তপতীর চোখে বড় সুন্দর লাগিতেছিল। উঠিয়া সে স্নান করিয়া ফেলিল। তারপর ধীরে ধীরে আসিয়া দাঁড়াইল বারান্দায়; তপনের ঘরের দিকে চাহিয়া দেখিল দরজা খোলা। ত্ৰ তপতীত্বরিতে আসিয়া দেখিল তপন পূজায় বসিয়াছে। তপনের পিছন দিকটা তপতী বহুবার দেখিয়াছে কিন্তু মুখ ভালো করিয়া দেখে নাই। আত্মবিস্মৃতা তপতী ঘরে ঢুকিয়া পড়িল, জীবনের এই প্রথম। প্রেমাভিসারের এই ক্ষুদ্র আয়োজনটুকুতেই হয়তো তার অনেক সময় ব্যয় হইয়া যাইত, কিন্তু আজ একান্ত অকস্মাৎ তাহা ঘটিয়া গেল।
তপনের দুই আঁখি ধ্যানক্তিমিত। শ্মশুগু মুণ্ডিত সুন্দর মুখমণ্ডল ব্যাপিয়া রহিয়াছে যে শান্ত সৌম্য শ্রী, তাহাতে তপতী বুদ্ধদেব ছাড়া আর কিছুই বলিতে পারে না। তপতী দাঁড়াইয়া রহিল। তপনের মানসিক্ত চুল হইতে তখনও জল ঝরিতেছে। তপতীর ইচ্ছা করিতেছে আপনার বুকের অঞ্চল দিয়া তপনের মাথাটি মুছিয়া দেয়।
তপন চক্ষু মেলিয়াই বিস্মিত হইল। অত্যন্তই সহজ সুরেই প্রশ্ন করিল, কিছু বলতে চান?
–না–কিছুনা বলিয়া বিমূঢ় তপতী দাঁড়াইয়া রহিল; প্রণাম শেষ করিয়া তপন চলিয়া গেল খাইবার জন্য মার কাছে, এবং খাইয়া বাহিরে।
সমস্ত দিনই তপন ঘুরে ফিরিল না। সেই সকালে গিয়াছে—তপতী অত্যন্ত উসখুস করিতেছে, মাকে জিজ্ঞাসা করিতে তাহার লজ্জা করিতেছিল বিকালে নিশ্চয় জল খাইতে আসিবে। কিন্তু বিকাল হইয়া গেল, ছয়টা বাজিল, তপন আসিল না। হঠাৎ তাহার মনে পড়িল কাল তপন বলিয়াছিল বোনের বাড়ি যাইবে। তবে কি আজ আর মোটেই আসিবে না? মিঃ ব্যানার্জি প্রভৃতি বন্ধুগণ তপতীকে বহুক্ষণ হইতে ডাকিতেছেন-নিরাশ হইয়া তপতী নীচে নামিল।
মিঃ বানার্জি কহিলেন, কী ব্যাপার? যক্ষবধুর মতো চেহারা যে মিস চ্যাটার্জি?
–আমি মিসেস গোস্বামী—আজ থেকে মনে রাখবেন–বলিয়া তপতী ওধারে ফুলবীথিকায় চলে গেল।
মিঃ অধিকারী ডাকিয়া কহিলেন,—খেলবেন না একটু?
না–তপতীর কণ্ঠস্বর এত দৃঢ় শুনাইল যে সকলেই থামিয়া গেল।
রাত্রি সাড়ে নয়টায় ফিরিয়া আসিল তপন। মা প্রশ্ন করিলেন,—কি কি খেলে, বাবা বোনের বাড়িতে?
—এই—পাটিসাপ্টা, সরুচাকলী, পানিফলের কি সব—আরো কত-কি খেলাম-মা—
তপতী আড়ালে দাঁড়াইয়া শুনিতেছে। মা কহিলেন,—বেশ বাবা বোনের বাড়ি তো বেশ খাও–আর এখানে খেতে দিলেই বলবে, ভালবাসিনে, মা!–
