তপতীকে কিছু বলিবার জন্য ইতত করিতে দেখিয়া তপন কহিল-আমি সামান্য ব্যক্তি, নাম তপনজ্যোতি।
মেয়েটি হাসিয়া বলিল,–তপন মানে সূর্য-উনি কিন্তু বরাবর বড়লোক; কখনও সামান্য নন।
—আমি বড়লোক? কিসে বুঝলেন?
—ঠিক বুঝেছি। যে প্রকাণ্ড গাড়ীখানা!
—গাড়ী দেখেই বুঝি আপনারা বড়লোক ঠাওরান? আমরা, ছেলেরাও তাই শাড়ী দেখে বড়লোক ভাবি?
—ছেলেরা কিন্তু ভুল করে। কারণ, বাড়ী আর গাড়ীতে পয়সা লাগে—শাড়ীর দাম আর কত?
-ছেলেরা মেয়েদের সম্বন্ধে বরাবর ভুলই করে থাকে—কথাটা বলিয়া তপন নিঃশব্দে হাসিল।
—কেন? আপনি কিছু ভুল করেছেন নাকি মেয়েটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে কথাটা বলিল।
–না–আমি মেয়েদের এড়িয়ে চলি যথাসম্ভব।
—ভয় করে বুঝি?
–আগে করতো। এখন টিকা নিয়ে ফেলেছিবসন্ত আর হবে না।–মেয়েরা বুঝি আপনার কাছে বসন্ত।
—মারীভয়! তাকে কে ভয় না করে বলুন? প্রমাণ তো ইতিহাসে যথেষ্ট রয়েছে ট্রয়ের ধ্বংস, লঙ্কার দহন।
-কিন্তু ভালোও তো বাসেন দেখছি!
–বাসি। মানুষ যাকে ভয় করে, তাকে ভালোও বাসে। প্রমাণ ভূত। ভূতকে ভয় করি বলেই তার গল্প অবধি শুনতে ভালবাসি আমরা। কিন্তু ভূতকে এড়িয়ে যেতে চাই।
আপনার যুক্তি কাটাতে না পারলেও কথাটা ঠিক মেনে নিতে পারছিনে।
–আমি নিরুপায় বলিয়া তপন নমস্কার জানাইল।
অতি সাধারণ কথাতেও তপন যথেষ্ট দক্ষতা দেখাইতে পারে, তপতী আজই প্রথম তপনকে লইয়া বেড়াইতে আসিয়াছে; দেখিল, সুশিক্ষিত কলেজের মেয়েদের সহিত আলাপে তপনের কোথাও জড়তা নাই। কেন তপতী এতদিন উহাকে লইয়া বেড়াইতে আসে নাই? তপনকে লইয়া তো তাহাকে অপদস্থ হইতে হইত না।
মোটরে গিয়া তপতী চালকের আসনে বসিল। সন্ধ্যায় ক্লান্ত পাখিদল কুলায ফরিতেছে। তপন সেই দিকে চাহিয়া আপন জীবনের কথা ভাবিতেছে—আর তপতী ভাবিতেছে উহার সহিত ভাব করিবার কী কৌশল আবিষ্কার করা যায়। হঠাৎ তপতী ব্রেক কসিয়া থামাইয়া দিল। নির্জন নিস্তব্ধ পথের দুধারে ফুটিয়া আছে অজস্র বন্য কুসুম—তপতী নামিয়া তাহাই কতকগুলি তুলিয়া লইল আঁচলে। একটা পুষ্পিত শাখা ছিঁড়িয়া তপনের গায়ে মৃদু আঘাত করিয়া বলিল,—আপনি চালান, আমি ফুল পরবো—তপতী উঠিতেই তপন নিঃশব্দে চালকের আসনে সরিয়া গিয়া গাড়ী ছাড়িয়া দিল।
এই নিতান্ত নির্লিপ্ততা তপতীর অন্তরকে জাগ্রত করিতেছে। তাহার আধুনিক মন ভাবিতেছিল ফুলগুলি তপন স্বহস্তে তাহাকে পরাইয়া দিবে, কিন্তু ও তপতীর সহিত অসহযোগ আরম্ভ করিল নাকি? তপতী বার বার চাহিয়া দেখিল–তপন অনড়–দৃষ্টি সম্মুখের দিকে হইতে একচুল নড়ে নাই। আপনার সুদীর্ঘ বেণীতে পুষ্পগুচ্ছ জিয়া তপতী বেণীটাকে এমনভাবে ফেলিয়া দিল যাহাতে তপনের বাম বাহুতে উহা পড়িতে পারে। তপন নির্বিকার। তপতী অসহিষ্ণু হইয়া উঠিতেছে। এই কঠিন পাষাণ-মূর্তিকে লইয়া সে করিবে কি? রাগই যদি তপনের হইয়া থাকে, তবে না-হয় দুচার কথা শুনাইয়া দিক-তপতী সহ্য করিবে। কিন্তু এই নীরবতা একান্ত অসহ্য। তপতী ঝাঁজিয়া বলিয়া উঠিল,কথা তো ভালোই বলতে পারেন চুপ করে কেন আছেন এখন।
–কথা না বলেও তো অনেক কথা বলা যায়—যেমন কথা বলে ঐ পুষ্পিত শাখা—
কিন্তু আমি শাখা নই, আমি মানুষ কথা বলবার জন্য আমার ভাষা আছে। আর ভাষাকে সুন্দর করবার জন্য আমি অনেক তপস্যা করেছি–
—আমার মৌনতাকে আমি সুন্দর করতে চাই—তাই হোক আমার তপস্যা।
—অর্থাৎ আমি যা চাই তার উল্টোটা, কেমন? চমৎকার।
তপন চুপ করিয়া রহিল। দিকে দিকে সন্ধ্যার মিন্ধ সুষমা গান গাহিয়া উঠিতেছে মৌন মহিমায়। মৌনতার এই সুগভীর সৌন্দৰ্য্য একান্ত প্রিয়জনের সান্নিধ্যেই যেন অনুভব করা যায়। তপতী অনেকক্ষণ ভাবিয়া বলিল,কাল আসতে হবে বেড়াতে, বুঝলেন? পালাবেন না যেন?
–কাল আমার বোনের বাড়ি যাবো, আসতে পারবো না।
তপতী বারুদের মতো জ্বলিয়া উঠিল। ঐ বোনটাই তপতীর সর্বনাশ করিতেছে। কোনরূপে ক্রোধ দমন করিয়া সে কহিল–আমি যাবো নিয়ে যাবেন আমায়? আমি দেখতে চাই, তার সঙ্গে আপনার সত্যিকার সম্পর্কটা কী।
তপন সজোরে গাড়ীটার ব্রেক কষিয়া থামাইয়া দিল। তপতী লাফাইয়া উঠিল স্প্রিংএর গদিতে। তপন ধীরে শান্ত স্বরে কহিল,তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা যাই হোক, মিস্ চ্যাটার্জি আপনার তাতে কিছুই যাবে আসবে না। অনর্থক আঘাত করায় কি আপনার লাভ হচ্ছে? আমার সঙ্গে সব সম্পর্কই তো আপনি ছিন্ন করেছেন। আজ আবার বলছি—আপনি মুক্ত, আপনি স্বতন্ত্র, আপনি স্বাধীন! আপনার উপর কোন দাবী আর রাখিনে। আশা করি, আপনিও আমার উপর রাখবেন না।
তপন তীরবেগে গাড়ীটা চালাইয়া দিল। তপতী বসিয়া রহিল বাক্যহারা ব্রততীর মতো।
বাড়ির প্রায় কাছাকাছি আসিয়া তপতী হঠাৎ বলিল, সত্যি তাহলে আপনি আমাকে মুক্তি দিয়াছেন?
-হ্যাঁ। আমি আপনার জীবন থেকে অস্ত গিয়েছি।
—অস্ত-সূর্যটি কিন্তু প্রতি সকালে উদিত হন—তপতীর ব্যঙ্গ তীক্ষ্ম হইয়া উঠিল।
—তার জন্য থাকে রাত্রির সুদীর্ঘ সাধনা—ধীরে উত্তর দিল তপন।
—ভালো! রাত্রি সাধনাই করবে!—তপতী আবার বিদ্রূপ করিল।
-আমি কিন্তু সূর্য নই। আমি দূর নীহারিকাপুঞ্জের এক নগণ্য নক্ষত্র, অস্ত গেলে বহু শতাব্দীর পরেও পুনরুদয়ের সম্ভাবনা কম থাকে।…
গাড়ী বাড়ি পৌঁছিল। তপন দরজা খুলিয়া তপতীর নামিবার পথ করিয়া দিল এবং সে নামিয়া গেলে নিজেও ধীরে ধীরে আপনার ঘরে প্রবেশ করিল।
