তপতী চুপ করিয়া রইল। মা বিরক্ত হইয়াছেন। আর কোন কথা না বলাই উচিত। তপন যে মূর্খ নয় ইহা তপতীও জানে, আর জানে, মাদ্রাজ যাওয়ার অছিলায় আরো কিছু টাকা তপন বাগাইবে। তা নিক টাকা তাহার বাবার যথেষ্ট আছে, তপন তো সকলেরই মালিক হইবে একদিন, কিম্বা হয়তো সত্যই কোনো কাজ আছে। কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া তপতী কহিল–আমায় আজ একটু বেড়াতে নিয়ে যেতে বোললা, মা! আমি বললে ও এড়িয়ে যায়।
মা হাসিয়া বলিলেন,—আচ্ছা বলল দেবো। কিন্তু এড়িয়ে যেতে দিস কেন তুই?
উত্তর না দিয়া তপতী আসিল আপন ঘরে। বিকালে সে আজ তপনকে লইয়া বেড়াইতে যাইবে—দেখিবে তাহার অন্তরে তপতীর স্থান কোথায়। বৈকালিক জলযোগের জন্য তপন আসিবার পূর্বেই তপতী রক্তাম্বরা হইয়া অপেক্ষা করিতেছিল। তপন আসিতেই মা তাহাকে বেড়াইতে যাইবার জন্য বলিলেন,–খুকী বললে তুমি নাকি এড়িয়ে যাও বাবা—তাই আমাকে দিয়ে বলাচ্ছে।
—আচ্ছা মা যাচ্ছি। আমার কাজ থাকে, দুএকদিন আগে বললে সময় করে রাখি।
তপন গিয়া গাড়ীতে বসিল-তপতী আসিয়া বসিল পাশে। গাড়ী চলিতেছে। নির্বাক চোখের ঠুলিটার মধ্য দিয়া সোজা সামনের রাস্তায় দৃষ্টি প্রসারিত করিয়া দিয়াছে বামে যে একটা সুসজ্জিতা নারী অপেক্ষা করিতেছে, তাহার অস্তিত্বও যেন তপন ভুলিয়া গিয়াছে। তপতী উসখুস করিতে লাগিল। সোজা কোনো কথা জিজ্ঞেসা করিতেও তাহার বাধিতেছে, কথাই-বা কহিবে কিরূপে। যাহাকে সে অপমানে, আঘাতে বিদলিত করিয়া দিয়াছে, তাহার সহিত এভাবে বেড়াইতে আসাই তো চরম নির্লজ্জতা! কিন্তু তপন তো আসিল, এতটুকু অসম্মতি জানাইল না? অন্যদিনও সে আসিবে তাহার স্বীকৃতি ছিল—অথচ কোনো কথা বলে না কেন! বাঁ দিকে একটা রাস্তা চলিয়া গিয়াছে। তপতী আপনার ডান হাতটা তপনের দুই হাতের ফাঁকে চালাইয়া দিয়া স্টিয়ারিংটা ঘুরাইয়া দিতে দিতে বলিল,—এই দিকে যাবো–
অকস্মাৎ বাধাপ্রাপ্ত গাড়ীটার ঝোক সামলাইয়া লইয়া তপতীর নির্দেশমতো পথেই তপন গাড়ী চালাইল। একটু দূরে কয়েকজন কলেজের মেয়ে বেড়াইতেছে, স্থানটা বেশ ফাঁকা।
তপতী বলিল,–এখানেই নামা যাক একটু—কেমন?
তপন গাড়ী থামাইল। নিজে নামিয়া তপতী ভাবিল, তপনও নিশ্চয় নামিবে; কিন্তু তপন গাড়ীতেই বসিয়া আছে মাথা নিচু করিয়া। তপতীর কেমন লজ্জা করিতে লাগিল তপনকে সঙ্গে আসিতে বলিতে। সে খানিকটা চলিয়া গেল, কিন্তু কি ভাবিয়া ফিরিয়া আসিয়া বলিল,একা যাবো নাকি?
তপন নিঃশব্দে নামিয়া তাহার অনুগমন করিতেছে। তপতী যা-হোক একটা কিছু বলিবার জন্যই যেন বলিয়া উঠিল,—ঐগুলো বুঝি গাংচিল? নয়?
–হ্যাঁ–বলিয়াই তপন নীরব রইল।
এই নিষ্ঠুর ঔদাসিন্য তপতীর অসহ্য বোধ হইতেছে। তাহার কলকাকলির স্রোত রুদ্ধ হইয়া গিয়াছে যেন। তনকে কথা কহিবার অধিকার দেওয়ার পরও তাহার এতটা নীরবতা হেতু কী! তপতী আবার বলিল,–ঐ নৌকোটা কোথায় যাচ্ছে?
—তা তো জানিনে।
তপন কি প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা একটিও বলিবে না? নৌকোটা কোথায় কোন চুলোয় যাইতেছে, কে তাহা জানিতে চায়! তপন কেন বোঝে না?–মানুষের যাত্রাপথও এমনি—কোথায় যাবে জানে না–তপতী পুনর্বার হাসিমুখেই বলিল।
তপন কোনোই উত্তর দিল না। নিঃশব্দে হাঁটিতে লাগিল। তপতী ক্রমশ উত্তপ্ত হইয়া উঠিতেছে। কথাই যদি না বলে তো সঙ্গে বেড়াইবে কিরূপে! কিন্তু হয়তো তপন এখনও বাগিয়া আছে। অপমানটা তত কম হয় নাই! তপতী কথার মোড় ঘুরাইবার জন্য সোজা প্রশ্ন করিল, মাদ্রাজে কদিন দেরী হবে?
ঠিক বলতে পারিনে–মাস দুই তো নিশ্চয়ই।
দুমাস! এতদিন কি করিবে সে? কিন্তু প্রশ্ন করিলে যদি তপন ভাবে তাহার কর্মের অযোগ্যতা লইয়া তপতী ব্যঙ্গ করিতেছে। তপতী আর প্রশ্ন করিল না। কিন্তু তপনের রাগ করার প্রমাণ সে পাইতেছে না। কী কথা আরম্ভ করিবে তপতী? কিছুক্ষণ ভাবিয়া প্রশ্ন করিল,–জামাকাপড়গুলো তো আর একটু ভালো করলেই হয়?
তপন মৃদুস্বরেই উত্তর দিল,—জীবনে অনেক কিছু না পেয়ে প্রাপ্ত বস্তুর উপরও আর শ্রদ্ধা নেই!
তপতী রাগিয়া উঠিল, ভণ্ডামীর আর জায়গা নেই যেন! কিন্তু রাগ চাপিয়াই হাসিয়া বলিল,–ওঃ বুদ্ধদেব! ত্যাগ শেখা হচ্ছে?—তপতীর কণ্ঠে সুস্পষ্ট ব্যাঙ্গের সুর ধ্বনিয়া উঠিল।
বিস্ময়ের সুরে তপন কহিল,–বুদ্ধদেব তো কিছু ত্যাগ করেননি। তিনি তার পিতার ক্ষুদ্র রাজ্য ছেড়ে অগণ্য মানবের হৃদয়-সিংহাসনে রাজ্য বিস্তার করেছেন। ত্যাগ কোথায়?
বিমূঢ় তপতী কিছুক্ষণ স্তব্ধ রহিল তপনের দিকে তারপর বলিল—ত্যাগ তবে কাকে বলে?
ত্যাগ বলে কোনো বস্তু তো নেই। আমরা যাকে ত্যাগ বলি, সেটার মানে এড়িয়ে যাওয়া। আর সত্যকার ত্যাগ মানে বন্দীত্ব থেকে মুক্তি অর্থাৎ বিস্তার, ক্ষুদ্র থেকে বৃহতে, লঘিষ্ট থেকে গরীয়ানে।
তপতীর বিস্ময় বাড়িয়া উঠিতেছে। প্রতি কথায় তপনের মুখ হইতে একি বাণী ঝঙ্কারিয়া উঠে! তপতী এতটা পড়িয়াছে—এমন করিয়া তো ভাবে নাই। এই লোক কি মূর্খ হইতে পারে? অশিক্ষিত হইতে পারে? তপতী আরো কি কথা বলিবে ভাবিতেছে।
কয়েকটি কলেজের মেয়ে আসিয়া তপতীকে নমস্কার জানাইয়া বলিল,—ভাল তো মিস চ্যাটার্জি।
তপনের সম্মুখে সে তাহাকে মিস বলিয়া সম্বােধন করায় তপতীর লজ্জা করিতে লাগিল, কিন্তু আরো কিছু অঘটন ঘটিবার আশঙ্কায় সেতাড়াতাড়ি—ভালোই আছিবলিয়া দূরে চলিয়া যাইতে চায়।
একটি মেয়ে তপনকে লক্ষ্য করিয়া, হাসিয়া প্রশ্ন করিল,–আপনার সঙ্গীর পরিচয়টা।
