ওবেলা দেখা যাইবে ভাবিয়া তপতী মালাটা রাখিয়া আহারাতেকলেজে চলিয় গেল। তপন তাহার দেওয়া মালার কদর কি বুঝিবে ভাবিয়া মনকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্ট করিল, কিন্তু বারম্বার মনে হইতেছেনা বুঝিবার কারণ নাই। তপন অশিক্ষিত নয়র অনেকের চেয়ে বেশী শিক্ষিত।
এই কয়েক মাসের ঘটনাগুলো আলোচনা করিতে গিয়া তপতীর ভয় করিতে লাগিল কী দুঃসহ অপমানই না তপতী করিয়াছে তপনকে! ও যদি একটু রাগিয়াই থাকে, তাহারে অন্যায় কিছুই হইবে না। কিন্তু রাগিয়াছে কিনা তাহারই বা প্রমাণ কই।
বৈকালবেলা তপতী মার কাছে আসিয়া খাবার তৈরী করিতে বসিল। বহুদিন আনে নাই-মা যেন কৃতার্থ হইয়া গেলেন। ভাবিলেন তপনকে খাওয়াইবার জন্য খুকী তাহা রান্নাঘরে আসিয়াছে। মা তাহাকে নিরামিষ চপকাটলেট তৈয়ারীর মশলা যোগাই দিলেন। তপনের জন্য রান্না করিতে তপতীর লজ্জা করিতেছিল, তাই বলিল,—মিঃ বোসকে আসিতে বলেছি, মা একটু আমিষও রাঁধবো।
মা বিষাদিত হইয়া উঠিলেন। খুকী আজও তপনের জন্য কিছু করে না। কিন্তু তাহা কিইবা বলিবার আছে? তপতী রান্না চড়াইয়া লুকাইয়া মিঃ বোসকে ফোন করিল চ খাইতে আসিবার জন্য।
মিঃ বোস আসিবার পূর্বেই আসিল তপন। মা বলিলেন,—বোস সাহেব তো এখনও এল না খুকী, তপনকে খেতে দে
এখনি এসে পড়বে, মা—একুট বসতে বলল, তপতী আবদার ধরিল। তপন কিছু বলিল না। নিঃশব্দে বসিয়া রহিল। মিঃ বোস আসিতেই সুসজ্জিত সকালের মালাটা বাঁ হাতে জড়াইয়া বাহিরে আসিল নমস্কার করিতে। মিঃ বোস নমস্কার করিয়া বলিলে হাসিমুখে,–সুন্দর! আপনাকে এমন চমৎকার মানিয়েছে আজ!
বসুন বসুন! ওসব বাজে কথা কইতে হবে না বলিয়া তপতী একটা কৃত্রিম ধম দিয়া খাবারের প্লেট আগাইয়া দিল দুজনকেই। তপন নীরবে নতমুখে একটুকরা ভাঙ্গিয় যেন চুষিতে লাগিল। মা চলিয়া গিয়াছিলেন–তপতী নিজেই যখন খাওয়াইতেছে, তখ তাহার আর থাকার কী দরকার। তপতী লক্ষ্য করিল তপনের না-খাওয়া। মিঃ বোস না কথা বলিতেছেন—হঠাৎ যেন তার চমক ভাঙিল, এমন ভাবে বলিয়া উঠিলেন,—ও নমস্কার সেদিনকার ব্যবহারটার জন্য আমি লজ্জিত। মাফ করুন!
বিস্মিত তপন বলিল,–মাফ চাওয়ায় কী কারণ ঘটলো বুঝলাম না তো।
—সেদিন না জেনে আপনাকে একটা অন্যায় কথা বলে ফেলেছিলাম।
–ওঃ সেই ইডিয়েট! তাতে কি হয়েছে? আমি কিছু মনে করিনি! নমস্কার।
তপন উঠিয়া পড়িল। তপতী ভাবিতে লাগিল, তপনের জন্য খাবার করিতে আসি। সে তপনের অসম্মানকারীকেই তাহার পাশে খাইতে বসাইয়াছে, কথাটা তপতীর আদে মনে ছিল না। মিঃ বোসকে না ডাকিলেই হইত। তপন হয়তো সেজন্যই খাইল না।
মা আসিয়া দেখিলেন তপন চলিয়া গিয়াছে। বলিলেন–কিছুই সে খায়নি রে! ওসব ভালবাসে না তপন। রুটি-জেলি দিলিনে কেন?
তপতী উত্তর দিবার পূর্বেই মিঃ বোস বলিলেন,–খেতে শেখান, মাসিমা–মেয়েকে যে জলে ফেলে দিয়েছেন।
রাগে মার সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া যাইতেছিল, নিতান্ত ভদ্রতার খাতিরে তিনি শুধু চুপ করিয়া বহিলেন।
তপতী কিন্তু কহিল,—থাক—আপনাদের তুলতে ডাকা হবে না।
নিজে তপতী ভাবিতেছে, তাহাকে জলেই ফেলিয়া দেওয়া হইয়াছে; কিন্তু অন্যের মুখে সেকথা তপতী আর শুনিতে চাহে না।
মিঃ বোস শোধরাইয়া লইবার জন্য বলিলেন,—কথাটা আমি খারাপ ভেবে বলিনি—আহার-বিহার, আচার-আচরণ না শিখলে সমাজে মিশবেন কি করে। তার জন্যেই বলছিলাম।
মিঃ বোস অতিথি, তাই তপতী চুপ করিয়াই রহিল; কিন্তু আজ তাহার মনে হইতেছে, পরের মুখে তপনের নিন্দা শুনিতে তাহার আর ভালো লাগে না।
অসুস্থতার ছুতা করিয়া তপতী মিঃ বোসের সহিত সেদিন আর বেড়াইতে গেল না।
০৮. তপনের মনের গঠন
তপনের মনের গঠন হয়তো কিছু অদ্ভুত। সে কোনদিন কাহাকেও আঘাত করে না—এমন ক আঘাতের প্রতিঘাত করে না। ইচ্ছা করিলে তপতীকে সে আঘাত করিয়া চূর্ণ করিয়া দতে পারিত, কিন্তু কাহাকেও আঘাত দিয়া কিম্বা জোর করিয়া ভালবাসা আদায় করিবার লোক তপন নহে। সে আপনাকে পরিপূর্ণ মনুষ্যত্বের মধ্যে বিকশিত করিতে চায়-ইহাই তাহার সাধনা। তাহার বিষয়-বৈরাগী মন শুধু চাহিয়াছিল একজন সাথী, যাহাকে সে জীবনের পথে দোসর ভাবিতে পারে। কিন্তু অদৃষ্ট তাহার অন্যরূপ। দুঃখ সে পাইয়াছে, কন্তু সে-দুঃখ সহিবার শক্তিও তাহার আছে।
আজ রিক্ত সর্বস্ব হইয়া মন প্রসারিত হইয়া পড়িল জনকল্যাণের বিপুলায়তনে। মুক্তির মধ্যে সে খুঁজিয়া পাইল বন্ধনের ইঙ্গিত। সকালে খাইতে বসিয়া তপন কহিল,—আমি একুশে শ্রাবণ একটু মাদ্রাজের ওদিকে যাব, মা, কন্যাকুমারিকা তীর্থের দিকেও যেতে হবে।
–মাদ্রাজ?–অতদূরে তোমার কি কাজ, বাবা? মা ম্লানমুখে প্রশ্ন করিলেন।
তপন হাসিয়া বলিল,–দূর আর কোথায় মা? তারপর একটু থামিয়াই বলল,–
সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী
রেখেছো বাঙালী করে মানুষ করোনি!
তপতী চা খাইতেছিল। কথাটা সে শুনিয়া কিছু উন্মনা হইলা পড়িল।
–কতদিন দেরী করবে, বাবা? মা সাগ্রহে প্রশ্ন করিলেন।
–দেরী একটু হবে বইকি, মাকাজটা শেষ করবো তবে তো?
আর কোনো কথা না বলিয়া তপন চা-পান শেষ করিল—এবং উঠিয়া বাহিরে চলিয়া গেল।
তপতী একটু ইতস্তত করিয়া মাকে জিজ্ঞাসা করিল,—ও মুখ্য মানুষ, মাদ্রাজে গিয়ে কি করবে, মা? আমাদের অফিসের কাজ কিছু?
–কি করে জানবো, বাছা, তুই তো জিজ্ঞেস করলেই পারিস। আর মুখ ও মোটেই নয়, এটা এতদিনেও বুঝতে পারলিনে তুই। তোর বাবা ওর কাজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
