—বিয়ে যদি না করে? শ্যামসুন্দর চাটুজ্যের নাতনীর দ্বিতীয় বিবাহ সহজ হবে না।
—আমি তার কি করবো, শিখা! আর, কঠিনই বা কেন হবে? ওর বাবার একমাত্র মেয়ের সুখের জন্য নিশ্চয় করবে। তবে তপতী যদি নিজেই বিয়ে না করে তো অন্য কথা।
—তাহলে কি করবে তুমি?
—কিছু না, শিখা–আমার সঙ্গে তার এ-জন্মের সম্পর্ক চুকে গেছে। আমি কায়েমমনসাকথা বলি ছলনা করি মুক্তি দেবার ভণ্ডামী আমি করি না। প্রয়োজন হলেই রেজিষ্টারী করে দেব।
সকলে অফিস-ঘরে আসিল।
স্নেহাস্পদ জামাতাকে বাড়ি হইতে চলিয়া যাইতে বলায় মা যে অত্যন্ত ক্ষুন্ন হইয়াছে, তপতীর তাহা বুঝিতে বিলম্ব হয় নাই। কিন্তু তপন তো সত্যই চলিয়া যাইতেছে না? আশ্চর্য, এতবড় অপমানটা সে সহিয়া গেল! যাইলেই বরং তপতী বাঁচিয়া যাইত। বিদেশে থাকিলে লোকের কাছে তবু বলা যায়, বাড়িতে নেই। ঘরে থাকিয়াও পার্টিতে যোগ না দিলে লোকে যে কথা বলে! পার্টিতে যোগ দিবার যোগ্যতা যে উহার নাই, লোকে তো তাহা বোঝে না।
তপতী স্থির করিল, তপনকে অপমান সে আর করিবে না, যাহা খুশী করুক, তপতীর অদৃষ্টে স্বামীসুখ নাই—কি আর করা যাইবে! তপনকে লইয়া ঘর করা তাহার অসাধ্য।
তপতী তিন-চারদিন একবারও এদিকে আসে নাই। তপন নিয়মিত সময়ে আসে খায়—এবং চলিয়া যায়—ইহার সংবাদ পত্রী রাখিয়াছে। ঐ নির্লজ্জ লোকটা আবার মুক্তি দিবার ছলে তাহাকে শাসাইতে আসে,—বলে, তুমি মুক্ত স্বাধীন স্বতন্ত্র। লজ্জা বলিয়া
কোন বস্তু কি উহার অভিধানে একেবারে লেখে না! কিন্তু সেদিন অত কাদিল কেন? তপতী উহার কোনোই কিনারা করিতে পারিল না ভাবিয়া।
পঞ্চম দিন সকালে সে আসিয়া মাকে বলিল,–আমি তাহলে আজই ভর্তি হচ্ছি গিয়ে, মা, এম এ ক্লাসে।
তপন খাইতেছিল। মা তাহাকে প্রশ্ন করিলেন,–তুমি কি বললা বাবা, তপন?
তপন উত্তর দিল-আমার মতের কি মূল্য, মা। ওর যা ইচ্ছে করবে। তবে অর্থাভাবে আমি পড়তে পারি নি, অর্থ থাকতেও কেউ না পড়লে আমার দুঃখ হয়।
–না বাবা, পড়ুক-বলিয়া মা তপতীকেও খাইতে দিলেন।
তপতী ভাবিতে লাগিল, সে পড়িবে শুনিয়া তপন খুশীই তো হইল। পড়াশুনার দিকে উহার আগ্রহ বেশীই আছে। মাকে বলিল,আমার কখানা বই কিনতে হবে, না—দোকানে একা যেতে চাইনে।
–বেশ তো তপন সঙ্গে যাক। যাও তত বাবা, ওর সঙ্গে একটু। গাড়ী বার করো।
–আচ্ছা মা যাচ্ছিবলিয়া তপন উঠিল। গ্যারেজ হইতে গাড়ী আনিয়া দাঁড় করাইল। বেশ-বাস করিয়া তপতী আসিয়া উঠিল তপনের পাশেই। তপন নীরবে গাড়ী চালাইতেছে। মুখে তো কথা নাই-ই; এমন কি মুখখানা যথাসম্ভব নীচু করিয়া এবং ঘাড় ফিরাইয়া বহিয়াছে। তপতী নির্নিমেষ নেত্রে তাহার লতানোনা চুলগুলোর পানে চাহিয়া রহিল! না, তপন মুখ তুলিল না! গাড়ী গিয়া দাঁড়াইল পুস্তকের দোকানের সামনে। তপতী নামিয়া দোকানে ঢুকিল, তপন বসিয়া রহিল গাড়ীতেই। বই কিনিয়া তপতী ফিরিয়া আসিল। গাড়ীতে বসিয়াই বলিল,
–একটু মার্কেটে দরকার ছিল—কথাটা বাতাসকে বলা হইলেও তপন মার্কেটের সম্মুখে গাড়ী থামাইল। নামিয়া তপতী পিছন দিকে চাহিল, ইচ্ছা—তপন আসুক! কিন্তু ডাকিতে তাহার লজ্জা করিতেছে। এত কাণ্ডের পর তপনকে ডাকা সম্ভব হয় কেমন করিয়া। দোকানে ঢুকিয়া সে একটি কর্মচারীকে বলিল তপনকে ডাকিয়া আনিতে। তপন গাড়ী ছাড়িয়া আসিয়া দাঁড়াইল। তপতী সাহস করিয়া কহিল একটি কর্মচারীকে, কোন সেন্টটা নেবো ওঁকে দেখান তো?
তপন নিম্নকণ্ঠে উত্তর দিল,—ও সম্বন্ধে আমার কোনো অভিজ্ঞতা নেই।
আচ্ছা লোককেই তপতী সেন্ট বাছাই করিতে বলিতেছে। তপতীরই বোকামী। একটা লিলি লইয়া সে ফুলের দোকানে আসিল, পিছনে তপন। বিক্রেতা তপতীকে চেনে, বলিল–আসুন, কী ফুল দেবো? একটা ভালো গোড়ে দিই যুঁই এর?
—দিন। ভালো ফুল তো? বাসি হবে না নিশ্চয়ই?
আপনাকে দেবো বাসি ফুল। সেদিনকার মালাটা কি বাসি ছিল?
তপতী লজ্জায় রাঙা হইয়া গেল। অতি অল্পদিন পূর্বেই যে সে এখানে মালা কিনিয়াছে, তপন তাহা বুঝিতে পারিল। বেশী কথা না বাড়াইয়া সে মালা চাহিল এবং আড়চোখে তপনের দিকেই চাহিল। তপন নির্বিকার নিশ্চল দাঁড়াইয়া… মুখের ভাব তেমনি, চোখে ঠুলি। মালাটা তপনের হাতে দিতে বলিয়া তপতী আগাইয়া গেল, গাড়ীর দিকে। কাগজ দিয়া মালাখানি জড়াইয়া দিলে তপন তাহা আনিয়া তপতী ও তাহার মধ্যকার স্থানে রাখিয়া গাড়ী চালাইল। তাহার মুখের ভাবের কিছুমাত্র ব্যতিক্রম হয় নাই কপালে এতটুকু কুঞ্চনরেখা পড়ে নাই। গতিশীল গাড়ীটাকে নিরাপদে লইয়া যাইবার জন্যই যেন তাহার সব মনটাই সংযুক্ত। তপতী আশ্চর্যান্বিত হইল। এতক্ষণ তপতী পাশে বসিয়া আছে, তপন একবার তাহিল না পৰ্য্যন্ত! এতটা ঔদাসিন্যের হেতু কি? কিম্বা উহার স্বভাবই এমনি! তপতীকে একবার দেখিলে ফিরিয়া দেখিতে ইচ্ছা করে, এ খবর তপতীর অজানা নাই। কিন্তু এই লোকটার কি তপতীকে দেখিতেও কিছুমাত্র আগ্রহ জাগে না। কিম্বা সেদিনকার ব্যাপারটায় এখনও সে রাগ করিয়া আছে।
গাড়ী আসিয়া পৌঁছিল! তপতী নামিয়া যাইতেই তপন দারোয়ানকে কহিল আমি একটা নাগাদ ফিরবো, মাকে বলল। সে আবার বাহিরে চলিয়া গেল পায়ে হাঁটিয়া; ট্রামে চড়িবে হয়ত। তপতীর হাতের মালাটা তাহাকে পীড়িত করিতেছিল। কি করিবে সে উহা লইয়া আর? তপনকে দিবার জন্য সে উহা কেনে নাই! কিন্তু গাড়ীতে আসিবার সময় ইচ্ছ হইয়াছিল মালাটা উহাকেই দিবে এবং ফেরৎ পাইবে; কিন্তু সাহসে কুলাইল না। মাল লইয়া আজ আর করিবে কি সে? এখনি কলেজে যাইতে হইবে।
