একটা সামান্য ব্যাপারকে এতখানা বাড়াইয়া তোলার জন্য তপনের উপর তপতী তিক্তই হইয়াছিল। মার ধমক খাইয়া অত্যন্ত বিরক্তির সহিত উত্তর দিল,—ওকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলেছি—শুনলে!
তপতী চলিয়া গেল। নিঃসহায় মাতা বি. এ. পাস মেয়ের কথা শুনিয়া বিস্ময়ে বাসিয়া রহিলেন।
শরাহত বিহঙ্গীর ন্যায় ব্যথিত-হৃদয়ে শিখা ও মীরা শুনিল তপনের মুখে তাহার ভাগ্যবিপর্যয়ের কাহিনী। মীরা উদাস দৃষ্টিতে দাদার মুখের পানে চাহিয়া আছে, আর শিখার দুই গণ্ড বহিয়া নামিয়াছে অশুর বন্যা! শিখাই কথা কহিল,
—তাহলে তোমার জীবনটা একেবারে পঙ্গু হয়ে গেল, দাদা?
—না ভাই এই-ই ভালো হয়েছে। আজ ঈশ্বরকে বলতে ইচ্ছে করছে :
এই করেছে ভালো…
এমনি করে হৃদয়ে মোর তীব্র দহন জ্বালো!
আমার এ ধূপ না পোড়ালে…
শিখা তপনের ব্যথা করুণ গান সহিতে পারিল না, মুখে হাত চাপা দিয়া বলিল,–থামো দাদা, তোমার পায়ে পড়ি, থামো! তোমার ঈশ্বর তোমার থাক—আমাদের তাঁকে দরকার নেই। যে নিষ্ঠুর বিধাতা পবিত্র জীবনকে এমন করে নষ্ট—শিখা আর বলিতে পারিল না, ফোপাইয়া কাঁদিয়া উঠিল।
মীরা কহিল,–চুপ কর, শিখা—মানুষের কান্নায় ভগবান অবিচল! তার কাজ তিনি করবেনই।
বিনায়ক দূরে বসিয়া উহাদের কথোপকথন শুনিতেছিল; আগাইয়া আসিয়া বলিল–তাহলে কবে যাচ্ছিস? একুশেই যাবি তো?
-হ্যাঁ ভাই। আমি না-ফেরা পর্যন্ত তোদের কাজ যেন ঠিক চলতে থাকে। মীরা জিজ্ঞাসা করিল,–সেখানে তোমার কত দেরী হবে, দাদা! খুব বেশী!
-—তা জানিনে বোটি! এখন আমার কাজ সহজ হয়ে গেছে। আর তো কোন বন্ধন নেই। মুক্তি সে স্বেচ্ছায় চেয়ে নিল।—তোরা সুখে আছিস—আমি এবার সেখানে যতদিন থাকি না—খবর দেবো তোদর ভাবনা কেন?
মীরা চুপ করিয়া রহিল। শিখা পুনরায় প্রশ্ন করিল ক্রন্দন জড়িত কণ্ঠে—তুমি কি তবে দেশান্তরী হয়ে যাবে, দাদা?
–না, বোন্টি! আমার মাতৃভূমি বাংলা ছেড়ে যাবে কোথায়? আমি একনিষ্ঠা পত্নী চেয়েছিলাম–নিজে হয়তো একনিষ্ঠ হাতে পারিনি তাই বঞ্চিত হলাম। এবার যোগ্য হতে হবে।
–তুমি কি তাহলে তপতীকে এখনও ভালোবাসো দাদা?
—বাসি। আত্মবঞ্চনায় কোনো লাভ নেই। ভালবাসি বলেই তাকে অত সহজে মুক্তি দিতে পারলাম। তার বুকে বোঝা হয়ে থাকতে ইচ্ছে করলো না। আমার মনের আসনে ওর স্মৃতি আমি বহন করবো, শিখা, আমার চোখের জলে নিত্য ধুইয়ে দেবো সেই আসন।
–ও যদি আবার তোমায় ফিরে চায়, দাদা?—মীরা প্রশ্ন করিল তপনকে।
—সে আর হয় না, বোনটি। আমার সত্য চিরদিন অবিচল। কিছুর জন্য সে ভাঙে না। কিন্তু তোরা এমনি বসে থাকলে কি করে চলবে রে? চ সব, কাগজপত্রগুলো ঠিক করে ফেলি। বিনায়ক। তুই তোর কারখানা চালা ভাই, আমি আমার কাজের মধ্যে আত্মবিসর্জন করবো এবার।
বিনায়ক নতমুখেই দাঁড়াইয়া রহিল।
শিখা বলিল,–তোমার কাজটা কি দাদা?
মানুষ গড়ার কাজ, বোনটি–তোমাদেরও সাহায্য চাই। পৃথিবী থেকে মানবতার সাধারণ সূত্রটি লোপ পেতে বসেছে। আমি শুধু দেখিয়ে দিতে চাই, পশু থেকে মানুষ কোথায় ভিন্ন। পাশবত্ব আর মানবত্বের মাঝখানে সে সূক্ষ্ম ব্যবধান রেখা রয়েছে, তাকেই স্পষ্টতর করা হবে আমার কাজ।
—তোমর জ্যোতির্গময় বইখানা হিন্দুস্থানী ভাষায় অনুবাদিত হয়ে পুরস্কার পেল, আর বাংলাদেশে মোটে বুঝলেই না, এদেশের মানুষকে কি দিয়ে তুমি গড়বে, দাদা?
বিদেশ থেকে গড়া আরম্ভ করবো। যে কোন বিষয়কে অশ্রদ্ধার চোখে দেখা বাঙালীর স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। এ স্বভাব সহজে যাবার নয়। কিন্তু আয় তোরা—তপন সকলকে লইয়া অগ্রসর হইল।
বিনায়ক মৃদুস্বরে কহিল, আমিও সঙ্গে গেলে হোতনা তপু? একা যদি অতদূর?
–হ্যাঁ একাই যাবোসঙ্গী যার হবার কথা ছিল সে যখন সরে গেল…
শিখা আবার কাঁদিয়া ফেলিল। তাহার নারীচিত্ত তপনের বেদনার গভীরতাকে মাপিতেছেনা। শান্ত শুদ্ধ তপন বারংবার বিচলিত হইয়া উঠিতেছে কোন্ অসহনীর যন্ত্রণায়, শিখা যেন তাহা নিজের বুকেই অনুভব করিতেছে।
অত্যন্ত করুণ কণ্ঠে সে কহিল,–লক্ষ্মী দাদা আমার, আজম্ম ব্রহ্মচারী তুমি-আমাদের ভগ্নী স্নেহ নিয়েই কি তুমি চালাতে পারবে না?
–ঠিক চলে যাবে, দিদি, কিছু না থাকলেও চলতো–নিরবধি কাল কোথাও আটকায়।
–কিন্তু তুমি বড় ব্যথা পেয়েছ, দাদা!
–নিজের জন্য নয়, বোনটি—ওর জন্য। ও কেমন করে এতবড় জীবনটা কাটাবে।
–ও আবার বিয়ে করবে।
—আহা, তাই করুক—ও বিয়ে করে সুখী হোক, শিখা, আমি কায়মনে আশীর্বাদ করছি।
–কিন্তু দাদা তুমি এবার আত্মপ্রকাশ করো-ও বুঝুক, কী ধন হারালো।
ছিঃ বোনটি। ওর উপর কি আমার প্রতিহিংসা নেবার কথা? ও-যে আমার—এ কথা আর কেউ না জানলেও আমি জানি।
–তাহলে তুমি মুক্তি দিলে কেন, দাদা? তোমাকেইবা ও চিনলো না কেন?
-ওর শিক্ষা ওকে বিকৃত করেছে, শিখা, মুক্তি না দিলে ও কোনদিন আমায় চিনবে না। অনেকদিন তো অপেক্ষা করে দেখলাম। ওকে ওর মা বাবা যেভাবে গড়েছেন, তেমনিই তো সে চলবে। তবে সে যদি আমার হয় তাহলে আমি তাকে পাবোই। একটা জন্ম কেন তার জন্য লক্ষ-জন্ম আমি অপেক্ষা করতে পারবো।
—তুমি তাহলে আত্মপ্রকাশ করবে না?
না। তাহলে তো এখুনি ও আমায় চাইবে। আর সে চাওয়া হবে—আমাকে নয় আমার মৰ্য্যদাকে। তেমন করে ওকে পেতে আমি চাইনে। আমি দরিদ্র তপন, মুখ তপন, ভণ্ড এবং অর্থলোভী তপন—এই তার ধারণা। এ ধারণাটা বদলাবার চেষ্টাও সে করলো না; কারণ, সে সর্বান্তকরণে আমাকে অমনি ভেবে ত্যাগ করতে চায়।
