মিঃ ব্যানার্জিকে লইয়া সিঁড়ির পাশের ঘরে একটা সোফায় তপতী বসিয়া বেহালা বাজাইতেছে—তপন এখনি আসিবে, তাহাকে দেখানো দরকার যে, তপনের থাকা-না থাকায় বা রাগ-অভিমানে তপতীর কিছুই আসে যায় না।
ঠিক সাড়ে পাঁচটায় তপন প্রবেশ করিল। মিঃ ব্যানার্জি কহিলেন, ভালো আছেন? টিকি-ই দেখা যায় না!
—টিকি নেই, ধন্যবাদ-বলিয়াই তপন পাশ কাটাইয়া চলিয়া যাইতেছিল, তপতী বেহালার ছড়িটা দিয়া তপনকে খোঁচাইয়া কহিল,—ভদ্রভাবে জবাব দিতে পার না উল্লুক!
—আঃ করেন কি মিস চ্যাটার্জি! বলিয়া মিঃ ব্যানার্জি তাহার হাতটা ধরিলেন।
তপন চোখের কোণে দৃষ্টিপাতও করিল না, ধীরে ধীরে সিঁড়ি বাহিয়া উপরে উঠিতেছে—শুনিতে পাইল তপতী বলিতেছে,—ওকে লাথি মারলে যাবে না, জুতো মারলেও যাবে না–সত্যি কি না মেরে দেখুন।
তপনের হৃৎপিণ্ডে কে যেন একসঙ্গে লক্ষ লক্ষ হুল ফুটাইয়া দিয়াছে। ধীরে ধীরে সিঁড়ির কয়েকটা ধাপ নামিয়া আসিয়া তপন পূর্ণদৃষ্টিতে তপতীর মুখের দিকে চাহিয়া প্রশ্ন করিল—আপনি কি আমার কাছে মুক্তিই চাইছেন?
তপতী নিজের মাথাটা মিঃ ব্যানার্জির কাঁধে রাখিয়া মৃদুহাস্যে বলিল,চাইছি দাও তো? দেখি তোমার কত ঔদার্য্য!
সত্যি চাইছেন?-তপন পুনরায় প্রশ্ন করিল।
মিঃ ব্যানার্জির একখানা হাত নিজের মসৃণ ললাটে ঘষিতে ঘষিতে তপতী ঝঙ্কার দিয়া কহিল,–হাঁ-হাঁ-হাঁ, চাইছি! দাও আমায় মুক্তি। পারবে দিতে?
—দিলাম। আজ থেকে আপনি মুক্ত, আপনি স্বতন্ত্র, আপনি স্বাধীন…
তপন সিঁড়ি বাহিয়া উপরে উঠিয়া গেল।–তপতীর তৎক্ষণাৎ মনে পড়িল—ঐ অদ্ভুত লোক, যে দুই টাকার পাখি চার টাকার কিনিয়া আকাশে উড়াইয়া দেয়, তাহাকে বিবাহ বন্ধন হইতে মুক্তি দিয়া গেল! তপতীর সহিত তাহার আর কোনো সম্বন্ধ রহিল না। নানা-না, তাহা কি হইতে পারে? তপতীকে সে বিবাহ করিয়াছে। এত সহজে মুক্তিলাভ সম্ভব নয়। ওটা একটা কথার কথা। ও তো এখনি আবার বাইরে যাইবে, তখন জিজ্ঞাসা করিবে তপতী দুই লক্ষের উপর আরো কত টাকা সে গুছাইয়াছে।
মিঃ ব্যানার্জি কহিলেন,–লোকটার ধাপ্পা দেবার শক্তি অসাধারণ।
তপতী এতক্ষণে আবিষ্কার করিল, সে এখনও মিঃ ব্যানার্জির কোলে পড়িয়া আছে। এখনি কেহ দেখিয়া ফেলিবে তাড়াতাড়ি উঠিয়া বাজনাটা লইয়া বসিল।
অনেকক্ষণ অতীত হইল, তপন নামিতেছে না কেন? আজ আর বাহিরে যাইবে না কি? আগ্রহান্বিতা, তপতী একটি ছুতা করিয়া উপরে গিয়া দাঁড়াইল তপনের রুদ্ধদ্বার কক্ষের জানালা-পার্শ্বে দেখিল পরম বিস্ময়ের সহিত, তপন, ভণ্ড, অর্থ লোভী তপন উপুড় হইয়া ফুলিয়া কাঁদিতেছে তাহার পূজার বেদীমূলে। উহার হইল কি? ও কি এমনি ভাবেই কাদিয়াই তপতীকে হার মানাইবে? এখনি মা দেখিবেন, বাবা জানিতে পারিবেন, একটা কেলেঙ্কারী বাধিয়া যাইবে। তপতীর ভয় করিতে লাগিল। এত অপমানেও যাহার এতটুকু বিমর্ষতা তপতী দেখে নাই, আজ অতি সামান্য কারণেই সে কেন কাঁদিতেছে। ওঃ, তপতী মিঃ ব্যানার্জির কোলে শুইয়াছিল বলিয়া উহার জেলাসি জাগিয়াছে। নিশ্চয়ই। হাসিতে তপতীর দম আটকাইয়া যাইবার জো হইল। মিঃ ব্যানার্জি-যাহাকে তপতী জুতার ডগায় মাড়াইয়া চলে। নীচে না গিয়া আপন ঘরে আসিয়া তপতী খুব খানিক হাসিল-ঐ লোকটাও তবে জেলাস হইতে পারে! আশ্চৰ্য্য, উহারও এ বোধ আছে নাকি। থাকিবে না কেন? ও তো নির্বোধ নয়। আপন স্বার্থসিদ্ধির জন্য অপমান সহ্য করিতেছে। তপতীকে ও নাকি স্বেচ্ছায় মুক্তি দিবে! তাহা হইলে আর ভাবনা ছিল না। ভালোই হইয়াছে ঈর্ষায় উহার অন্তরটাকে তপতীক্ষত-বিক্ষত করিয়া দিবে। দেখিবে তপতী কত সহ্যশক্তি উহার আছে।
তপতী মার কাছে গিয়া দাঁড়াইল। মা জিজ্ঞাসা করিলেন-তপন এখনও ফিরছে না কেনরে–জানিস কিছু?
মা জানেন না তপন ফিরিয়াছে। নিঃশব্দে আসিয়া তপনের দরজায় তপতী একটা জোর ধাক্কা দিল। তপন সম্বিত লাভ করিয়া যখন চোখ-মুখ মুছিয়া বাহিরে আসিল তখন তপতী সরিয়া গিয়াছে। মার সহিত কি কথা হয় শুনিতে হইবে, তপতী আড়ালে দাঁড়াইল। মা তপনের মুখ দেখিয়া বলিলেন কী হল বাবা! মুখ তোমার…
–বিশেষ কিছু না,, খেতে দিন।
খাবার দিতে দিতে মা আবার জিজ্ঞাসা করিলেন, সত্যি বলো, বাবা, কি তোমার হয়েছে-বড় ক্লান্ত দেখাচ্ছে তোমায়।
—এক জায়গায় একটু আঘাত পেয়েছি, মা—তা প্রায় সামলে নিলাম।
–কী আঘাত বাবা, কোথায় আঘাত লাগলো?—মা ব্যাকুল কণ্ঠে প্রশ্ন করিতে লাগিলেন।
–শারীরিক না মা—মানসিক; শারীরিক আঘাত আমি সবই প্রায় সইতে পারি মা, মানসিক সব আঘাত এখনও সইতে পারি না, তবু সয়ে যাবো, মা! আমার অন্তর–নহে তা পাষাণ-মত, তাহলে ফাটিয়া যেতো।
বুকের গভীর দীর্ঘশ্বাসটা তপন কিছুতেই ছাপিতে পারিল না!
এত কি হইয়াছে! তপতী আশ্চর্য হইয়া গেল। মা প্রায় কান্নাকরা কোমল কণ্ঠে কহিলেন,—হ্যাঁ বাবা, খুকী কিছু বলেছে?
-থাক মা—সব কথা মাদের বলা যায় না—দিন চা আর-একটু।
মা নিশ্চিত বুঝিলেন, খুকী তাহার কিছু বলিয়াছে। নতুবা তপন তো কোন দিন এমন বিহ্বল হয় নাই। আশ্চৰ্য্য চরিত্র ঐ ছেলেটির। তপন চলিয়া গেলে মা তপতীকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, কী তুই বলেছিস—বল খুকী আমার বড় ভাবনা হচ্ছে—
–ভাবনার কিছু নেই। তোমার অপদার্থ জোচ্চোর জামাইকে ঠেঙালেও তোমার বাড়ি ছেড়ে যাবে না—ভয় নেই তোমার–!
–খুকী!-মা ধমকাইয়া উঠিলেন!
