মা হাসিয়া করিলেন,—শুনেছো বাবা, ওকে আজ যেন নিয়ে যেয়ো–
তপন মৃদুস্বরে কহিল, আজ থাক, মা, আমার ছোট বোনটিকে আজ একটু দেখতে যাব–যদি বলেন তো কাল সিনেমায় যেতে পারি।
রাগে তপতীর সর্বাঙ্গ কপিতে ছিল। তাহার অসংযত মন বিদ্রোহের সুরে ঝঙ্কার দিয়া উঠিল,—থাক, কাল আর যেতে হবে না! বোনকে নিয়ে থাকুন গে! বোনের বাড়ি থাকলেই পারতেন!
মা ধমক দিয়া উঠিলেন, কী সব বলছিস, খুকী? চুপ কর।
-থামো তুমি মা-কাজিন-এর উপর অত দরদের অর্থ তুমি বুঝবে না। তুমি থামো।
তপন চায়ের কাপটা চুমুক দিতে যাইতেছিলনামাইয়া রাখিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। মা, ব্যস্ত হইয়া কহিলেন, উঠলে যে বাবা, বসো!
তপন বাহিরে যাইতে যাইতে শুধু বলিল,–আপনার খুকীকে বলে দেবেন মা, আমি আধুনিক যুগের তরুণ নই—আমার বোন বোনই!—তপন সিঁড়ি দিয়া নীচে নামিবার পথ ধরিল। মা বিপন্না বোধ করিয়া কি করিবেন ভাবিয়া পাইতেছেন না।
তপতী রুখিয়া নীচে নামিতে নামিতে পিছন হইতে তপনকে বলিল,–যান চলে যান, আসবেন না আর।
তপন ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল,–আমি চলে যাই এই কি চান আপনি?
-হ্যাঁ, চাই-চাই—চাই, আজই চলে যান, এক্ষুণি চলে যান।
তপনের দুই চোখে সীমাহারা বেদনা ঘনাইয়া উঠিল, নির্বাক স্তব্ধভাবে সে দাঁড়াইয়া আছে।
ব্যঙ্গ করিয়া তপতী বলিল,—দুলাখ তো নিয়েছেন, আবো কিছু যদি পারেন তো দেখেছেন–কেমন?
বিস্মিত তপনের কথা ফুটিল; কহিল,শ্যামসুন্দর চাটুজ্যের নাতনী সামান্য দুলাখ টাকার সন্ধানও রাখেন দেখছি?
ক্রোধে আত্মহারা তপতীর অভিজাত্যে আঘাত লাগিল। সক্রোধে সে জবাব দিল-শ্যামসুন্দরের নাতনীর বাবাকে কোনো জোচ্চোর ঠকিয়ে দুলাখ টাকা নিয়ে যাবে,
এ সে সইবে না মনে রাখবেন। যাবার আগে টাকার হিসেব দিয়ে যাবেন যেন।
উত্তরের অপেক্ষা না করিয়া তপতী চলিয়া আসিল। মা ভাবিয়াছিলেন তপতী তপনকে ডাকিতে যাইতেছে, কিন্তু তাহাকে একা ফিরিতে দেখিয়া বা ব্যাকুলভাবে প্রশ্ন করিলেন,–তপন কই খুকী?
–জানিনে—চুলোয় গ্যাছে। বলিয়া তপতী আপন ঘরে চলিয়া গেল।
বিপন্না মাতা উহাদের কলহের কারণ খুঁজিয়া পাইতেছেন না। খুকীর ঘরে আসিয়া তিনি পুনরায় প্রশ্ন করিলেন,—কি বলে গেলো রে, না খেয়েই গেল যে!
তপতীর রাগ তখনও পড়ে নাই, তথাপি সংযত কণ্ঠেই উত্তর দিল;—আসব এক্ষুণি–ভাবছো কেন তুমি।
—কি সব বলিস বাবু তুই রাগের মাথায় ওরকম বিশ্রী কথা কেন তুই বলিস খুকী? তপতী এবার আর রাগ দমন করিতে না পারিয়া কহিল,–বেশ করেছি, বলেছি! কী এমন বললাম যে, না খেয়ে গেলেন—ভারী তো…!
মা ভাবিলেন দম্পতীর কলহ, চিরশান্ত তপন নিশ্চয়ই বাগ করিয়া যায় নাই। কিন্তু ভয় তাহার জাগিয়াই রহিল মনের মধ্যে।
বেলা প্রায় বারোটার সময় টেলিফোনের ঘণ্টা বাজিয়া উঠিতেই উৎকণ্ঠিতা তপতী ছুটিয়া গিয়া ফোন ধরিল। মা-ও তখনি আসিয়া পাশে দাঁড়াইলেন! তপতী শুনিল পুরুষকণ্ঠে কে বলিতেছেন—তপনবাবু আজ বাড়ি ফিরবেন না, কাল সকালে ফিরবেন।
-কেন? কোথায় থাকবেন? তপতী প্রশ্ন করিল।
কিন্তু উত্তরদাতা ফোন ছাড়িয়া দিয়াছে।
মা ব্যাকুলকণ্ঠে কহিলেন,–কে ফোন করছে রে? তপন?
-হ্যাঁ, আজ আসবে না, বোনের বাড়ি থাকবে বলিয়া তপতী চলিয়া যাইতেছিল, পুনরায় ফিরিয়া কহিল,–রাগ করেনি মা, কাল ঠিক আসবে আমায় বললে; ভেবো না তুমি।
মা নিশ্চিন্ত হইলেন কিনা বোঝা গেল না, কিন্তু তপতী ধরা পড়িবার ভয়ে পলায়ন করিয়া ভাবিতে লাগিল—কোথায় আর যাইবে, যাইবার জায়গা তো ঐ ফুটপাত, আর তপতীরই বাপের দুই লক্ষ টাকা—টাকার হিসাব দিতে হইলেই চক্ষু চড়কগাছ হইয়া যাইবে। ও ভাবিয়াছে, যাইবে বলিলেই তপতী ভয়ে কাঁদিয়া পড়িবে পায়ে! তপতীর অদৃষ্টে তাহা কখনও লেখে নাই, কিছুতেই না, তপতীর হাসি পাইল! তাহার পিতামহের গোড়ামী কম ছিল না, কিন্তু তাহার পিছনে ছিল যুক্তি—তিনি ছিলেন অসাধারণ পণ্ডিত। আর তপন কতকগুলি বাছা বাছা বুলি কপচাইয়া ভাবিয়াছে তপতীর অন্তর জিনিয়া লইল! অত সহজ নয়—তাহা হইলে আর ভাবনা ছিল না।
বিকালে বস্ত্রাদি পরিবর্তন করিয়া তপতী মিঃ ব্যানার্জি ও মিঃ সান্যালের সহিত বেড়াইতে বাহির হইল যথারীতি।
পরদিন সকালেই তপন ফিরিয়া আসিল ক্লান্ত বিষণ্ণ মুখশ্রী লইয়া।
তপতীর সহিত তাহার কি কথা হইয়াছিল, মা কিছুই জানিতেন না; তিনি তপনকে স্বাগত সম্ভাষণে সস্নেহে বলিলেন,–শরীর ভলো তো বাবা! বড্ড শুকনো দেখাচ্ছে?
হ্যাঁ, মা, শরীর ভালোই আছে—খেতে দিন কিছু-বলিয়া তপন খাইতে বসিল।
তপতী আপন ঘরে বসিয়া দেখিল, তপন ফিরিয়াছে এবং নির্লজ্জের মতো খাইতেছে। অদ্ভুত এই লোকটা। এতবড় অপমান করার পরেও সে নির্বিকার? কোন্ মহান উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সে এইরূপ অপমান সহিতেছে, তপতীর আর তাহা অজানা নাই। ভালো, উহার ভণ্ডামীর শেষ কোথায় দেখা যাক।
দিন দুই তপনের আর কোন খোঁজ না-লইবার ভান করিল তপতী। সে দেখিতে চাহিতেছে, তপনের দিক হইতে কোন আবেদন আসে কিনা। কিন্তু তপন পূর্বের মতোই নির্বিকার, আসে, খায়, চলিয়া যায়! তৃতীয় দিনে তপতী ভীষণ উত্তপ্ত হইয়া উঠিল। এমন করিয়া সে আর পারে না! তপন আসে, খায়, মার সহিত পূর্বের ন্যায় দুই-একটা কথা যাহা কহিত তাহাও বন্ধ করিয়া দিয়াছে। দুইদিন তপতী সুযোগ খুঁজিয়া ফিরিয়াছে, সুবিধা হয় নাই। তপন যেন আপনাকে একেবারে অবলুপ্ত করিয়া দিয়াছে—অথচ নির্লজ্জের মতো খাওয়া আর থাকাটা তো তেমনই রহিল। এতই যদি উহার সম্মান-জ্ঞান, তবে চলিয়া গেল না কেন? তপতী নিশ্চয় জানে যে-কোন লোক নিতান্ত অপদার্থও, এই অপমানের পর চলিয়া যাইত। তপনের না-যাওয়ার কারণটা এতদিনে বেশ ধরা পড়িয়া গিয়াছে। তপতী সেদিন আগুনের খেলা খেলিয়া বসিল।
