মিঃ অধিকারী তাহাকে সমর্থন করিয়া বলিল,–গোঁড়ামি দিয়েও আধুনিকদের বশ করা যায় দেখা যাচ্ছে!
রেবা এতক্ষণ চুপ করিয়াই ছিল—সুযোগ বুঝিয়া খিল খিল করিয়া হাসিতে হাসিতে বলিল, বশ কাকে হতে দেখলেন আপনারা? কথাটার নূতনত্ব আমাদিগকে একটু চমকে দিয়েছে মাত্র। ভেবে দেখতে গেলে, তপনবাবু সেই প্রাচীন কুসংস্কারের জগদ্দল পাথরটাই তপতীর ঘাড়ে বসাতে চান, বোঝা যাচ্ছে। অর্থাৎ উনি চান, তপতী তার সমাজ-সংস্কার, শিক্ষা-দীক্ষা সব বিসর্জন দিয়ে ওর সঙ্গে সেই ঘোমটা-টানা বৌ হয়ে থাক। যত অনাসৃষ্টি কাও লোকটার।
মিঃ সান্যাল কহিল,–নিশ্চয়ই তাই, নইলে ঐ সহধর্মিণী হওয়া কথাটা তুলবে কেন? সহধর্মিণীর যুগ আর নেই বাপু সখীত্বের যুগ চলছে
উহারা যাইবার জন্য উঠিয়া দাঁড়াইল। তপতী কোন কথাই বলিল না, যদিও রেবার কথাগুলি তাহার বুকে গভীর আলোড়ন তুলিয়াছে। সকলে চলিয়া যাওয়ার পরেও তপতী বসিয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিল–সমাজ-সংস্কার ছাড়িলে তো তাহার চলিবে না, তপনকে লইয়া কি সে বনে গিয়া বাস করিবে? তপন যদি আমাদের সমাজে না মিশতে পারে তবে তো তপতীর পক্ষে ভয়ঙ্কর বিপদের কথা! তপতী প্ল্যান আঁটিয়া রাখিল আগামী পরশু তাহার সহপাঠিনী টুকুর বিবাহে তপনকে সঙ্গে লইয়া সে বরাহনগর যাইবে। তপনকে তাহাদের সমাজের যোগ্য করিয়া লইতেই হইবে, নতুবা তপতীর উপায় নাই।
নির্দিষ্ট দিনে দুপুর বেলা ৩পন খাইতে আসিতেই মা বলিলেন,–আজ খুকীর এক বন্ধুর বিয়ে বাবা, ওর সঙ্গে তোমায় যেতে হবে সন্ধ্যেবেলা বুঝলে?
তপন ভাতের গ্রাসটা গিলিয়া কহিল,আমি নাইবা গেলাম মা! আমার যে অন্যত্র কাজ রয়েছে। আগে বললে সময় করে রাখতাম আমি।
—সে কাজ পরে করো, বাবা! মা সস্নেহে আদেশ করিলেন–
–তা হয় না, মা আমি কথা দিয়েছি-আমার কথা আমি রাখবোই। একটা উপহার আমি এনে দেবো, আপনার খুকীর সেটা নিয়ে গেলেই হবে। আমার না যাওয়ায় ক্ষতি হবে না।
তপতী আড়ালেই ছিল।–তপন যাওয়াটা এড়াইয়া যাইতেছে দেখিয়া সম্মুখে আসিয়া বলিল,–যেতে—ভয় করে বললেই সত্যি বলা হয়। না-যাবার হেতু?
তপনের খাওয়া হইয়া গিয়াছিল, ৩পতীর কথাটার জবাবমাত্র না দিয়া সে আঁচাইবার জন্য বাহিরে চলিয়া গেল। রুদ্ধ অপমানে তপতীর সর্বাঙ্গ কণ্টকিত হইয়া গেল। একে তো আজ যাচিয়া তপনের সহিত যাইতে চাহিয়াছে,—তার উপর মাকে দিয়া সে-ই অনুরোধ করাইয়াছে, আবার নিজে আসিয়া প্রস্তাব করিল, আর ঐ ইতর কিনা ভদ্রভাবে একটা জবাব পৰ্য্যন্ত দিল না! তপতীর প্রশ্নটাও যে ভদ্রজনোচিত হয় নাই, ইহা তাহার উষ্ণ মস্তিষ্কে প্রবেশ করিল না। তপনের পিছনে গিয়া সে আদেশের সুরে কহিল,—যেতেই হবে বুঝেছেন?
মুখ ধুইয়া মশলা কয়টা মুখে ফেলিবার পূর্বে তপন অতি ধীর শান্তকণ্ঠে উত্তর দিল,–যেতে পারবো না—মাফ চাইছি–
উত্তর দিয়াই তপন চলিয়া গিয়াছে, তপতী যখন বুঝিল, তখন যুগপৎ ক্রোধ এবং অপমান তাহাকে দগ্ধ করিয়া দিতেছে।
সন্ধ্যার পূর্বেই তপন একটি ভেলভেটের কেসে একটি মূল্যবান ব্রোচ কিনিয়া মার হাতে দিয়া বলিল,–এইটা নিয়ে গেলেই আমার না যাওয়ার অসৌজন্য হবে না, মা। মুখ্য-সুখ্য মানুষ, আমার না যাওয়াই ভালো।
–হ্যাঁ, ভালোই—তপতীও তাহা সমর্থন করিল এবং তপনের বদলে তাহার প্রদত্ত উপরাহটা লইয়া বিবাহ বাড়ি চলিয়া গেল। সেখানে বহু লোকের উপহৃত দ্রব্যের মধ্যে তপনের দেওয়া ব্রোচটা তুলিয়া দেখা গেল লেখা আছে : আপনাদের জীবন বসন্তের বনফুলের মতো বিকশিত হোক, বর্ষার জলোচ্ছাসের মতো পরিপূর্ণ হোক—শরতের শস্যের মতো সুন্দর আর সার্থক হোক!…
তপনের আশীর্বাণী। যিনি পড়িলেন, তিনি পণ্ডিত ব্যক্তি। কহিলেন—বেশ আশীর্বাদটি, বৎসবের শ্রেষ্ঠ তিনটি ঋতুর আশিস যেন ঐ কথা কটিতে ভরে দিয়েছে! চমৎকার লাগলো।
তপনের না-আসার জন্য অনেকেই ক্ষুন্ন হওয়া সত্ত্বেও তাহার আশীর্বাদের প্রশংসা করিল সকলেই। দুচারজন কিন্তু বলিতে ছাড়িল না—জামাই মূর্খ, তাই তপতী সঙ্গে আনে না। ও আশিস কাউকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে।
কথাটা তপতী শুনিল; লজ্জায় সে রাঙা হইয়া উঠিতেছে, কিন্তু বলিবার মতো কথা আজ তার জুটিতেছে না। যত শীঘ্র সম্ভব সে পলাইয়া আসিল।
সমস্ত রাত্রি তপতীর ভালো নিদ্রা হইল না। গত সন্ধ্যায় বিবাহ বাড়িতে সে রীতিমতো অপমানিত হইয়াছে। তপন কেন তাহার সঙ্গে গেল না? ভালো ইংরাজি জানে না সে, নাই বা জানিলতপতী সামলাইয়া লইত। মাছ-মাংস খায় না বলিলেই কাটা-চামচের হাঙ্গামা ঘটিত না। তপনের না যাইবার কী কারণ থাকিতে পারে? কোনদিনই সে কোথাও যায় নাই অবশ্য তপতীও ডাকে নাই। কিন্তু ডাকিলেও যাইবে না, এমন কি গুরুতর কাজ তাহার থাকিতে পারে? বিদ্যা তো আতি সামান্য। সারা দিন-রাত্রি কী এতে তাহার কাজ? না যাইবার অছিলায় সে ঐভাবে ঘুরিয়া বেড়ায় কাহারও সহিত দেখা করিতে চাহে না। তপতী আজ নিঃসংশয়ে বুঝিল—কতকগুলি পাকাপাকা কথা তপন বলিতে পারে, ভদ্রতা বা অভদ্রতা, অপমান বা সম্মান সম্বন্ধে তার কোন ধারণা নেই। তাহাকে এই বাড়িতে থাকিতে হইতেছে তাহার উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্যই। সে বুঝিয়াছে তপতীকে সে পাইবে না, এখন টাকাই তাহার লক্ষ্য। কিন্তু কাল তো তপতী তাহাকে আত্মদান করিতে প্রস্তুতই ছিল, তথাপি তপ কেন গেল না? তপতীর আন্তরিকতার অভাব সে কোথায় দেখিল?
ভোরে উঠিয়াই তপতী স্নান করিয়া এলোচুল ছড়াইয়া বসিল খাইবার ঘরে। তাহার অঙ্গের স্নিগ্ধ সুরভি ঘরের বাতাসকে মন্থর করিয়া তুলিয়াছে। পূজা করিয়া তপন চা খাইতে আসিল! মা দুজনকে খাবার দিয়া বসিয়া আছেন। তপতী যেন আপন মনেই বলিল,আজ বিকেলে আমি সিনেমায় যাবো, নিয়ে যেতে হবে আমায়।
