—আসছি বলিয়া তপতী আপনার ঘরে চলিয়া গেল। তপনের কথা বলার আশ্চৰ্য্য ভাঙ্গিটি আজ তপতীকে যেন ভাঙ্গিয়া গড়িতেছে। এই সুকুমার দর্শন যুবকটি মুখ, উহাকে তপতী উৎপীড়িত করিয়াছে, অপমানিত করিয়াছে,অতিষ্ঠ করিয়াছে,—তথাপি সে যায় নাই! কিন্তু কেন যায় নাই, সে কথা ভাবিতে গিয়াই তপতী আর একবার শিহরিয়া উঠিল। সত্যই কি তপন অর্থলোভী? সত্যই কি সে তপতীর জন্য এত অত্যাচার সহ্য করে নাই, তুচ্ছ অর্থের জন্যই করিয়াছে? ভাবিতে ভাবিতে তপতীর অন্তর ব্যথায় টন্ করিয়া উঠিল। হে ঈশ্বর! যদি তপতী কখনও তোমায় ডাকিয়া থাকে, তবে বলিয়া দাও তপতীর জন্যই তপন এত অপমান নীরবে সহ্য করিয়াছে। এইটাই যেন সত্য হয় তপতী তাহার জীবনে আর কিছুই তোমার নিকট চাহিবে না।
মায়ের দ্বিতীয় ডাকে ক্লান্ত তপতী যখন খাইতে আসিল, তখনও তাহার চোখের পাতা ভিজিয়া রহিয়াছে। মা ব্যাকুল হইয়া বলিলেন,—কি হল রে, মা! কাদছিস?
অনেক তীর্থ ঘুরে এলাম মা, ঠাকুরদার সঙ্গে সেই গিয়েছিলাম। আজ তিনি নাইবলিতে বলিতে তপতী অজস্র ধারায় কাঁদিয়া ভাসাইয়া দিল। বি এ. পড়া শিক্ষিত মেয়ের এরূপ অসাধারণ দুর্বলতা দেখিয়া মা বিস্মিত হইলেন, কিন্তু আনন্দিত হইলেন ততোধিক। তপতী আবার তাহার পূর্বের তপতীর মতোই হইয়া উঠিতেছে? চোখের জলে মানুষের মনের ময়লা ধুইয়া যায়—তপতী আবার সুন্দর হইয়া উঠুক, তাহার তপতী নাম সার্থক হোক!
মায়ের কল্যাণাশীষের স্পর্শে তপতীর অন্তর সেদিন জুড়াইয়া গেল।
০৭. তপতী বি. এ. পরীক্ষায় সে পাশ করিয়াছে
পরদিন সকালেই তপতী আয়োজন করিল বন্ধুদিগকে ভোজ দিবার। বি. এ. পরীক্ষায় সে পাশ করিয়াছে, সঙ্গীত-প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পাইয়াছে, এবং সর্বোপরি যাহা সে লাভ করিয়াছে—তাহা তপনের সঠিক পরিচয়! এমন দিনে সে খাওয়াইবে না তো কবে খাওয়াইবে? তপতী টেলিফোনে সকলকে নিমন্ত্রণ করিল এবং মাকে বলিল,—ওকে বলে দিয়ো মা, সবার সঙ্গে বসে যেন আজ খায়—
মা হাসিয়া কহিলেন—নিজে বলতে পারিস্ নে খুকু? কি লাজুক মেয়ে তুই!
–না মা, ও ছুতো করে এড়িয়ে যায়—জানো তো, কি রকম দুষ্টু!
তপতী চলিয়া গেল। মার কাছে তপনের সম্বন্ধে দুষ্টুমির আরোপ তাহাকে লজ্জিতই করিয়াছে। তাহার নারী-হৃদয় ঐ কথাটুকু বলিয়াই যে এত তৃপ্তিলাভ করিতে পারে, তপতী তাহা কখনও ভাবে নাই। হউক লজ্জা, তথাপি তপতীর আনন্দ যেন মাত্রা ছাড়াইয়া গেলে!
নির্দিষ্ট সময়ে সকলেই আসিল—আসিল না শুধু তপন। তপতীর প্রশ্নের উত্তরে মা বলিলেন,–সাড়ে পাঁচটার আগে সে তো ফেরে না—ঠিক সময়েই ফিরবে।
নিরুপায় তপতী অন্যান্য সকলকে খাইতে দিল। সাড়ে পাঁচটায় তপন আসিতেই মা তাহাকে সকলের সঙ্গে বসাইয়া দিলেন। তপতী স্বহস্তে পরিবেশন করিল চপ-কাটলেট ইত্যাদি।
নিরুপায়ভাবে কিছুক্ষণ খাদ্যগুলির দিকে চাহিয়া থাকিয়া তপন কহিল মাংস খেতে আমি ভালবাসিনে—আমায় একটু রুটি-মাখন দিলে ভাল হয়।
মা বলিলেন,–একটু খাও বাবা, রুটি মাখন আজ নাই-বা খেলে? তুমি তো বৌদ্ধ নও যে অহিংস হচ্ছ।
তপন হাসিয়া বলিল,–মাংস না খেলেই অহিংস হয় না, মাংস তত খাদ্যই। ও খাওয়ায় হিংসাও হয় না। তবে আমার প্রয়োজনাভাব।
মিঃ ব্যানার্জি তপনকে আক্রমণের জন্যে যেন ওৎ পাতিয়া ছিলেন, কহিলেন,—-চপকাটলেট-ডিম খাওয়া কাঁটা-চামচেতে খাওয়া আধুনিক সভ্যতার অঙ্গ একটা–তপন চুপ করিয়া রহিল। উত্তর না পাইলে মিঃ ব্যানার্জি অপমান বোধ করিবেন ভাবিয়া মা বলিলেন,—ওর কথাটির জবাব দাও তত বাবা!
হাসিয়া তপন বলিল,–সভ্যতা কথাটা আপেক্ষিক, মা। বিলাতের লোক আমাদের অসভ্য বলে, আমরা আবার আমাদের থেকে অসভ্য বাছাই করে নিজের সভ্যতা প্রমাণ করতে চাই। দেশ আর পাত্র এবং রুচি ভেদে ওর পরিবর্তন হয়।
তপতী এতক্ষণ পরে হঠাৎ বলিয়া ফেলিল, মানুষকে যুগোপযোগী হতে হবে—তপন নির্লিপ্তর মতো বলিল—এটাও অপেক্ষিক শব্দ। আমার সমাজে এই যুগেই আমি বেশ উপযোগী আছি, আবার সাঁওতালরা তাদের সমাজে এই বিংশশতাব্দীতেই বেশ উপযোগী রয়েছে।
কিন্তু আপনি তো এসে পড়েছেন আমাদের সমাজে? মিঃ অধিকারী বঙ্গের সুরে কহিলেন।
আপনাদের সঙ্গে আমার পবিচয় আজই প্রথম, এর মধ্যে আপনাদের সমাজে এসে পড়লুম কেমন করে, বুঝলুম না তো?—তপন প্রশ্নসূচক ভঙ্গীতে চাহিল।
তপতীকে বিয়ে করে।–রেবা উত্তর দিল হাসির মাধুৰ্য্য দিয়া।
তপন কয়েক সেকেও নীরব থাকিয়া কহিল,আমার ধারণা ছিল—বিয়ে করে মানুষ তার নিজের সমাজেই স্ত্রীকে নিয়ে যায়। আপনাদের বুঝি উল্টা হয় জানতুম না তো!
এই তীক্ষ ব্যঙ্গোক্তি তপতীকে স্পর্শ করিল গভীরভাবে। জেলিমাখা রুটিটা তপনের, দিকে আগাইয়া দিতে দিতে সে কহিল,—সব স্ত্রী যদি সে সমাজে না মিশতে পারে? না সইতে পারে সে সমাজকে?
তপন নিঃশব্দে কাপের চা-টুকু পান করিয়া উঠিতে উঠিতে বলিল,—সে তবে স্ত্রী নয়, সহধর্মিণী নয়-সে শুধু বিলাস সঙ্গিনী। সব স্বামীরও তাকে সইবার ক্ষমতা না থাকতে পারে।
—তপন চলিয়া গেল সকলকে নমস্কার জানাইয়া। চির অসহিষ্ণু তপতী শান্তস্নিগ্ধ ঔদার্য্যে চাহিয়া রহিল তপনের গমন পথের পানে-দৃষ্টিতে তাহার কোন সুদূর অতীত যুগের উজ্জ্বলতা ছড়ানো।
অতিথিদের সকলেই চলিয়া যাইবার পরেও রহিল রেবা, মিঃ ব্যানার্জি, মিঃ অধিকারী, মিঃ সান্যাল। তপতী উঠি উঠি করিতেছে, ভদ্রতার খাতিরে পারিতেছে না। মিঃ ব্যানার্জি এবং অন্যরা যাহারা এতদিন তপনকে পাড়াগেঁয়ে গণ্ড মূর্খ বর্বর ভাবিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করিতেছিল, তাহারা আজ নিঃসংশয়ে বুঝিল, তপন মূর্খ তো নহেই, উপরন্তু উহার কথা বলার কায়দা অসাধারণ। উহারা বেশ বুঝিল—তপতী মুগ্ধ হইয়া গিয়াছে। কর্ণের শেষ অস্ত্র ত্যাগের মতো মিঃ ব্যানার্জি বলিয়া উঠিল,–পাঁচালি ছড়া পড়লেও অনেক কিছু শেখা যায়, দেখছি।
