বহুস্থান ঘুরিয়া সকলেই প্রায় ক্লান্ত হইয়া বাসায় ফিরিতেছে,একটা স্থানে কতকগুলি লোক জটলা করিতেছে দেখিয়া তপতীর দল গাড়ী থামাইল। এক বাঙালী ভদ্রলোক একটি পাখি কিনিতে চান; তিনি কহিলেন,—আমি দুটাকা দেবোতৎক্ষণাৎ অন্যদিকে যে উত্তর দিল সবিস্ময়ে চাহিয়া তপতীর দল দেখিল, সে তপন;-বলিল, আমি চার টাকা দিচ্ছি! তপনের পরিহিত পোশাক ধূলিমলিন, গায়ে এত ধুলা লাগিয়াছে যে প্রায় চেনা যায় না। সারাদিন রোদে ঘুরিয়া মুখকান্তি মলিন এবং অসুন্দর হইয়া উঠিয়াছে, ঐ ক্লান্ত বিষণ্ণ মুখশ্রীকে তাহার অঞ্চল দিয়া মুছাইয়া দিতে ইচ্ছা করিতেছিল! তপন বলিল,–দাও পাখিটা। সে চারটা টাকা দিয়া পাখিওয়ালার নিকট হইতে পাখিটা লইল। একটু বয়স্ক হইলেও ভারী সুন্দর রং প৭িটার। ধরা পড়িয়া মুক্তির জন্য পাখিটা করুণভাবে কাঁদিতেছে আর ডানা ঝাপটাইতেছে। তপতীর ইচ্ছা করিতেছিল, তপনের হাত হইতে সে এখনি উহা লইয়া আসে, কিন্তু সঙ্গীদের মধ্যে মিঃ ব্যানার্জি ও মিঃ সান্যাল ছাড়া কেহই তপনকে চেনে না। তাহারা কি ভাবিবে। তারপর ঐ নিতান্ত কদর্য্য পোশাক-পরিহিত দরিদ্রমূর্তিকে তপতী স্বামী বলিয়া পরিচয় দিতে পারিবে না। সে থামিয়া গেল।
প্রথমে যে ভদ্রলোক পাখিটি কিনিতে চাহিয়াছিলেন, তিনি শুল্কমুখে কহিলেন,অতবড় বুড়ো পাখি, পোষ মানবে না মনে হচ্ছে
–ঠিক মানবে। এই দেখুন না—বলিয়া তপন পাখিটাকে মুক্ত আকাশে উড়াইয়া দিয়া হাসিয়া কহিল, মুক্তির মধ্যেই প্রেমের বন্ধন দৃঢ়তর হয়।
–করলেন কি মশাই! বলিয়া একজন চীকার করিয়া উঠিলেন।
–ওকে ভালবাসি কিনা, তাই মুক্তি দিলাম-বলিয়াই তপন চলিয়া গেল। চোখের জল লুকাইবার জন্য তপতী তখন ঘাড় হেঁট করিয়া বসিয়াছে। মিঃ ব্যানার্জি কহিলেন,—আমাদের দেখে কি রকম অভিনয়টা করলো।
জলভরা চোখে তপতীর রোষবহ্নি গজিয়া উঠিল,–থামুন! যথাযোগ্য স্থানে যথাযোগ্য কথার ব্যবহারের যোগ্যতা পৃথিবীতে কম অভিনেতারই থাকে। ও যদি অভিনেতা হয় তো, আমি নিশ্চয়ই বলতে পারি–ও পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অভিনেতা।
গাড়ীস্থ সকলেই একমুহূর্তে স্তব্ধ হইয়া গেল তপতীর কথা শুনিয়া।
তপতীর সারা অন্তরখানি স্নিগ্ধ প্রশান্তিতে ছাইয়া গেছে। গাড়ীতে সারা পথ সে বিশেষ কিছু কথা বলে নাই, সর্বক্ষণ তপনের কথা ভাবিয়াছে আর বিস্মিত হইয়াছে। যে মানুষ অর্থ বাঁচাইবার জন্য থার্ডক্লাসে দূর পথের যাত্রী হয়, মুটে খরচের ভয়ে স্বয়ং বাক্স-বিছানা বহন করে; পোষাকের কদৰ্য্যতায় পর্যন্ত যাহার কৃপণতা পরিস্ফুট—সেই কিনা দুই টাকার পাখি চার টাকা দিয়া কিনিয়া আকাশে উড়াইয়া দেয়, আবার বলে ওকে ভালবাসি, তাই উড়াইয়া দিলাম। ইহা অপেক্ষা মানবতার প্রকৃষ্টতম পরিচয় আর কি হইতে পারে? মিঃ ব্যানার্জি বলেন, উহা তপনের অভিনয়।হউক উহা অভিনয়, তথাপি আজ প্রেমের শ্রেষ্ঠতম তীর্থ শ্রীবৃন্দাবনে প্রেমের যে নবীনতম বাণী তপনের মুখে শুনিয়াছে, তাহা তপতীর জীবনকে পরিপূর্ণ করিয়া দিতে পারিবে। আর অভিনয়ইবা হইবে কেন? তপন তো জানিত না তাহারা ওখানে দাঁড়াইয়া আছে। তপতী স্থির করিল, তপনকে লইয়া সে একবার অভিনয় করিবে। প্রেমের অভিনয়।
পরদিন বিকালে হাওড়ায় গাড়ী থামিলে তপতী নিজের গাড়ীতে চড়িয়া বাড়ি ফিরিল! মা তাহাকে দেখিয়া প্রশ্ন করিলেন,তপন নামেনি খুকী? ওরও তো নামবার কথা এই ট্রেনে।
–নেমেছে, আমি দেখা না করে চলে এসেছি। ও আসছে ঘোড়ার গাড়ীতে, আমার যাওয়ার কথা ওকে বলোনো মা তুমি বরং ওকে জিজ্ঞাসা করো থার্ডক্লাসে কেন ও যায়?
তপতী স্নান করিতে চলিয়া গেল। স্নানাদি সেরে সে আবার আসিয়া বসিল এমন স্থানে যেখান হইতে মার সহিত পনের কথা শুনা যাইতে পারে।
তপন ফিরিয়া আসিল একটা ফিটনে। মা বলিয়া ডাকিতেই মা ছুটিয়া বাহির হইয়া আসিলেন। তপনের মূর্তি দেখিয়া দুঃখে তাহার অন্তর ফাটিয়া যাইতেছে। আত্মসংবরণ করিয়া বলিলেন,–কী চেহারাই করেছ বাবা। মাথায় এত ধূলো যে ধান চাষ করা চলে–
সুমিষ্ট হাসিতে ঘরখানা পূর্ণ হইয়া গেল। তপনের হাসির আওয়াজ যে এত মিষ্টি তপতী তাহা কোনদিন জানে না। তপন কহিল,—মাথাটা তাহলে ধান চাষের যোগ্য হয়েছে মা! ধানের জমি সব থেকে দামী।
মা আরো ব্যথিত হইয়া কহিলেন, রাখো বাবা, তোমার হাসি দেখে আমার রাগ বাড়ছে। থার্ড ক্লাসে কেন তুমি যাবে, বলো তো?
কোটটা খুলিয়া কামিজের বোতাম খুলিতে খুলিতে তপন জবাব দিল,—কেন মা থার্ডক্লাসে তো মানুষই যায়—গরু ছাগল তো যায় না!
মা এবার হাসিয়া ফেলিলেন; বলিলেন,—কিন্তু ফার্স্ট ক্লাসেও যায় মানুষ–
–সে বড় মানুষ। আপনার ছেলে তো বড়মানুষ নয়, মা! গরীব ছেলে আপনার–
-না বাবা, না। ওরকম করো না তুমি। মার মনে দুঃখ দিতে নাই, জান তো?
-দুঃখ কেন পাবেন, মা? আপনার সক্ষম ছেলে যে-কোনো অবস্থায় নিজেকে চালিয়ে নিতে পারে—এ তো আপনার সুখেরই কারণ হওয়া উচিত?
কিন্তু আমাদের ক্ষমতা যখন আছে, বাবা-তখন ফার্স্ট-ক্লাসেই–
বাধা দিয়া তপন বলিল,–ক্ষমতার সংযত ব্যবহারটাই মানুষের শিক্ষণীয় বিষয় মা।এতেই তার মহিমা বাড়ে! মানুষের অক্ষমতাকে ভেংচিয়ে ক্ষমতার জাহির নাইবা করলাম?
তপন স্নানাগারে ঢুকিল। মা তপনের কথা কয়টি আপনার মনে পুনরাবৃত্তি করিয়া বাহিরে আসিলেন। তপতী বিহ্বল দৃষ্টিতে মাঠের পানে তাকাইয়া আছে। সস্নেহে মা ডাকিলেন,–আয় খুকী, খেয়ে নে কিছু।
