আশ্চর্য! তাজমহলের সম্মুখে ঝাউবীথি-বেষ্টিত প্রকাণ্ড চত্বরে বসিয়া আছে তপন-দৃষ্টি সম্মুখে প্রসারিত। তাজের শুভ্র মর্মরমূর্তিকে যেন সে ধ্যান করিতেছে। তপনের পিছন দিকটা তপতী ভালভাবেই চিনিত ঘাড়ের পাশেই সেই কালো তিলটি, লম্বা গভীর কালো কোঁকড়ানো চুল লতাইয়া পড়িয়াছে যেখানে। সামনে গেলে পাছে তপতীকে দেখিয়া তপন চলিয়া যায়, এই ভয়ে তপতী পাশ্চাতেই অপেক্ষা করিতে লাগিল।…সন্ধ্যা হইতেছে। আষাঢ় পূর্ণিমার স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নায় বিরহী সম্রাটের প্রেমদ্যুতি যেন ভাষা লাভ করিতেছে!
তপন উঠিয়া তাজমহলের মধ্যে আসিল। তপতী তাহার অনুসরণ করিয়া চলিয়াছে। জনতার মধ্যে কে কোথায় কি উদ্দেশ্যে চলিতেছে তপন লক্ষ্যমাত্র করিল না। সম্রাট সম্রাজ্ঞীর সমাধিপার্শ্বে আসিয়া সে হাতের ফুলগুলি অঞ্জলিবদ্ধ করিয়া আবৃত্তি করিল :
হে সম্রাট কবি, এই তব জীবনের ছবি–
এই তব নব মেঘদূত, অপূর্ব্ব-অদ্ভুত,
চলিয়াছে বাক্যহারা এই বার্তা নিয়া—
ভুলি নাই—ভুলি নাই—ভুলি নাই প্রিয়া…
তপতীর বিস্ময় সীমাতিক্রম করিয়া গিয়াছে। এই তপন! সত্যই তপন তো? কিম্বা তপতী অন্য কাহাকেও তপন ভাবিয়াছে। না, তপতীর ভুল হয় নাই। ও-যে তপন, তাহার পরিচয় রহিয়াছে উহার পোষাকে। ঐ পোষাকে সে দিল্লীতেও পরিয়াছিল—ঐ রং—ঐরকম কোট।
তপন প্রণাম কবিয়া চলিয়া আসিল। তপতী পিছনে পিছনে আসিয়াছে বরাবর। তাজমহলের সুবিস্তৃত আঙ্গিনা পার হইয়া তপন বাহিরের গাড়ী থামিবার জায়গায় আসিল। তাহার টাঙ্গাওয়ালা কহিল,—আইয়ে!
–তপতী ত্বরিতে তপনের নিকট আসিয়া বলিল,
–আমায় একটু পৌঁছে দেবেন?
তপন এক মুহূর্ত ইতস্তত করিয়া বলিল,
–একা এসেছেন? চলুন, কোথায় যাবেন?
—সিসিল হোটেল-বলিয়া তপতী চাহিল জ্যোৎস্নলোক-দীপ্ত তপনের মুখের পানে। ভাল দেখা যায় না, তথাপি তপতীর মনে হইল—এমন সুন্দর সে আর দেখে নাই! টাঙ্গার সামনেকার আসনে তপতী উঠিয়া বসিল, তপন বসিল পিছনে!
—এদিকে আসুন!—তপতী অনুরোধ করিল তপনকে তাহার পাশে বসিতে।
—থাক—আমি বেশ আছি বলিয়া তপন আদেশ করিল গাড়ী চালাইতে।
–কেন? এখানে আসবেন না?—তপতীর কণ্ঠে অজস্র বিস্ময়!
–মাফ করবেন, আমি অনাত্মীয়া মেয়েদের পাশে বসি নে—তপনের কণ্ঠস্বর দৃঢ়।
-অনাত্মীয়া! আমি আপনার অনাত্মীয়া নাকি? এই, রোখো!–তপতী কঠোর আদেশ করিল চালককে।
রাগে তপতীর আপাদমস্তক ঝিমঝিম করিয়া উঠিয়াছে। লাফ দিয়া গাড়ী হইতে নামিয়া পড়িয়া সক্রোধে কহিল,–আমিও অনাত্মীয় পুরুষের গাড়ীতে চড়ি না বলিয়াই অপেক্ষামাত্র না করিয়া তপতী হোটেলের গাড়ীতে চড়িয়া প্রস্থান করিল।
ব্যাপারটা কি ঘটিল, কেন উনি এভাবে চলিয়া গেলেন–তপন কিছুমাত্র বুঝিতে না পারিয়া বিব্রতভাবে চাহিল। কোন নারীর মুখের পানে সে পারতপক্ষে তাকায় না। ইহাকেও চাহিয়া দেখে নাই। একক কোনো মহিলা পৌঁছাইয়া দিতে বলিতেছেন, তপনের অন্তরের কাছে ইহাই যথেষ্ট আবেদন। সমস্ত ব্যাপারটা তপনের দুৰ্জেয় বোধ হইতেছে।
গাড়ীতে উঠিয়া উত্তেজনার আতিশয্যে তপতী কয়েক মুহূর্ত প্রায় কোন চিন্তাই করিতে পাবিল না। তাহার মনে হইতেছিল, তপন তাহাকে এত বেশী অসম্মান করিয়াছে যাহা পৃথিবীর কোন মেয়েকে কোন পুরুষ কখনও করে নাই। কিন্তু সন্ধ্যার শীতল বায়ুর স্পর্শে এবং তপনের সুন্দর মুখের মোহমদিরার যাদু-মহিমায় তপতী যেন কিছুটা কোমল হইয়া গেল। তাহাব মনে পড়িল—তপতী যে এখানে আসিয়াছে ইহা তপন তত জানে না। অনাত্মীয়া মনে করা তাহার পক্ষে অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আজ দীর্ঘ সাত মাস তপন একই বাড়িতে তপতীর সহিত বাস করিতেছে, এতকালেও কি সে তাহাকে চেনে নাই? নিজে তপন মুখ ফিরাইয়া থাকে, চোখে ঠুলি পরে, তথাপি তপতীর তাহাকে চিনিতে ভুল হইল না; আর তপন তাহাকে অত কাছে দেখিয়াও চিনিল না। তপন নিশ্চয়ই তাহাকে ঠকাইয়াছে। এইভাবে তপতীকে অপমানিত করিয়া সে তপতীর অপমানের শোধ লইল। কিন্তু তাহার ব্যবহারে তো সেরূপ মনে হইল না!
এই মুহূর্তে তপতীর মনে প্রশ্ন জাগিল, তপন তাহাকে অনাত্মীয় বলায় সে ক্ষুন্ন হইয়াছে কিম্বা অপমানিত বোধ করিতেছে। তপতীর পিতার অন্নদাস একটা দরিদ্র ভিক্ষুক—তপতীর আত্মীয়তাকে অস্বীকার করিবার শক্তি তপন পাইবে কোথায়? কোন সাহসে? বিবাহের বন্ধনগ্রন্থী আধুনিক কালে এমন কিছুই জটিল নয়, যাহা খুলিতে তপতীর খুব বেশী আটকাইতে পারে। কিন্তু কেন তবে লোকটা তপতীকে অপমান করিল? সে কি সত্যই তবে তপতীকে চেনে নাই? না চেনাই সম্ভব। এমন অস্থিরভাবে গাড়ী হইতে না নামিয়া আসিলেই ভাল হইত। বলিল যে, অনাত্মীয়া মেয়ের পাশে বসেনা। আচ্ছা পরীক্ষা করিতে হইবে। অনাত্মীয় মেয়ে বসিতে আহ্বান করিলেও বসিবে না, এমন সুদুঃসহ গোঁড়ামির মূল কোথায় তপতী তাহা দেখিয়া লইবে।
হোটেলে আসিয়াই তপতী আবদার ধরিল, কাল বৃন্দাবন যাইবে। তপতীর অনুরোধ আদেশেরই নামান্তর। সকলে হোটেলের দুইখানা কার লইয়া সকলে বৃন্দাবন যাত্রা করিল। সেই বৃন্দাবন, যেখানে বংশীরবে যমুনা বহিত উজান; বাঁধনহারা ব্রজগোপিগণ ছুটিয়া আসিত কোন অন্তর প্রেমসাগরে আত্মবিসর্জন করিতে—কালো কৃষ্ণ যেখানে কালাতীত হইয়াছে, প্রেমের আলোয়। সারাদিন, শ্যামকুঞ্জ, রাধাকুঞ্জ দর্শনে কাটিল। গৌরাঙ্গ কোনো পুরুষ দেখলেই তপতীর মনে হয়, ঐ বুঝি তপন! কিন্তু পরক্ষণেই ভুল ভাঙ্গিয়া যায়। তপনকে কোথাও দেখা যাইতেছে না! তবে কি সে আসে নাই! তপতীকে অপমান করিয়া ফিরিয়া গেল নাকি? তপতী চতুর্দিকে অন্বেষণ করে। মিঃ ব্যানার্জি এবং মিঃ সান্যালও তপনকে খুঁজিতেছেন। তাঁহাদের মনে একটা আশা জাগিতেছে, তপনকে কোনো একটা বিশ্রী পরিস্থিতির মধ্যে দেখাইয়া দিতে পারিলেই তপতীর অন্তর হইতে তাহাকে চিরনির্বাসিত করা যাইবে। কোন একটা ব্রজাঙ্গনার সঙ্গে যদি তপনকে দেখা যায় তবে এখনই প্রমাণ হইয়া যায় যে তপন শুধু অর্থলোভীই নয়, অসচ্চরিত্রও। তপনকে না তাড়াইতে পারিলে তাহারা সুবিধা করিয়া উঠিতে পারিতেছে না।
