তপতী হঠাৎ কহিল,–সংযুক্তার কথা মনে পড়ছে। যোগ্য স্বামীকে পাবার জন্য বাপমাকে ছাড়তে সে দ্বিধা করেনি—অদ্ভুত মেয়ে।
মিঃ ব্যানার্জি তাহাকে উস্কাইবার জন্য কহিলেন, আপনার মনের শক্তিও কিছু কম নয়। আজ দীর্ঘ সাতমাস আপনি মার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।
তপতী একটা নিঃশ্বাস ছাড়িল তারপর ধীরে ধীরে কহিল,—যুদ্ধ এখনো করিনি মিঃ ব্যানার্জি এ কেবল সমরায়োজন চলছে। কিন্তু সংযুক্তার মতো ভাগ্য তো আমার নয়, আমার পৃথ্বীরাজ এখনো আসেননি।
মিঃ ব্যানার্জি ও মিঃ সান্যাল চকিত হইয়া উঠিতেছেন! তপতীর মনটাকে তাহার। আজো আকর্ষণ করিতে পারেন নাই তবে! কে তবে উহাকে লাভ করিবে। এখনি সেটা জানিয়া লওয়া দরকার, বলিলেন,–আপনার পৃথ্বীরাজ কিভাবে আসবেন, বলতে পারেন মিস্ চ্যাটার্জি?
না! যেদিন আসবেন সেদিন বলতে পারব! আজ শুধু জানি যারা এতদিন আসছেন তারা কেউ-ই পৃথ্বীরাজ নন! তাদের মধ্যে অনেক ঘোরী আছেন, কিন্তু পৃথ্বীরাজ নেই।
তপতীর ইঙ্গিত বঙ্গের কাছে ঘেঁষিয়া মিঃ ব্যানার্জিদের পীড়িত করিতেছে। মিঃ ব্যানার্জি আজ মরিয়া হইয়া উঠিয়াছেন কহিলেন,
-ঘোরীর হাতে পৃথ্বীরাজের পরাজয় ঘটেছিল, বীরত্ব তার কম ছিল না মিস্ চ্যাটার্জি?
দুর্ভাগ্য সংযুক্তারবাবা তার জয়চন্দ্র আর সৌভাগ্য সংযুক্তার স্বামী তার মৃত্যুঞ্জয়ী। ঘোরীর বীরত্ব দেশজয় করতে সক্ষম, নারী হৃদয় নয়, কারণ নারী নিজে ছলনাময়ী বলে ছলনা কপটতাকে অত্যন্ত ঘৃণা করে। নারী নিশ্চিত নির্ভরতায় তাকে বুকের পদ্মটিতে গন্ধ হয়ে ফোটে যে-পুরুষ আপন পৌরুষ মহিমায় মৃত্যুপথকে উজ্জ্বল করে তুলবে; চালাকিতে নয়, ছলনায় নয়, কপটতায় নয়। নারী নিজে সাংঘাতিক কপট তাই অন্যের কপটতা সহজে বুঝতে পারে।
—আপনি কি বলতে চান যে আমরা আপনার সঙ্গে কপটত করি?
—হাঁ, তাই। তার প্রমাণ আপনার এই প্রশ্নটি। আপনি যদি অকপট হতেন তাহলে এ প্রশ্ন আপনার মনে আসতো না। আমি তো কোন ব্যক্তিগত কথার আলোচনা করিনি। আপনি নিজেই ধরা পড়লেন! তপতী হাসির বিদ্যুৎ হানিল।
মিঃ ব্যানার্জি ও মিঃ সান্যাল মুড়াইয়া পড়িতেছেন। কিন্তু মিঃ সান্যাল কানে কানে মিঃ ব্যানার্জিকে বলেন,—আধুনিক সাইকোলজি বলে : মেয়েরা যাকে ভালোবাসে তাকেই ঐ রকম আক্রমণ করে; অতএব ভাবনার কিছু নাই।”
কথাটা শুনিয়া মিঃ ব্যানার্জি প্রীত হইয়া কহিলেন, কটকে কপটতা দিয়েই তো জয় করা যায়।
তপতী মধুর হাসিল, একটু থামিয়া বলিল,–জয়ীর লক্ষণ হচ্ছে বিজিতেব আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করা—পারবেন তো?
–নিশ্চয়। বলুন কি আকাঙক্ষা। মিঃ ব্যানার্জি সাগ্রহে চাহিলেন তপতীর দিকে।
–উপস্থিত যৎসামান্য। ঐ-যে লোকটা বসে আছে, পিছনের চুলগুলো ঠিক তপনবাবুর মতো, দেখে আসুন তো, ও সেই কি না? আপনাকে আশা করি চিনতে পারবে না।
—সম্ভব নয়—বলিয়া মিঃ ব্যানার্জি গাড়ী হইতে নামিয়া গেলেন। হুমায়ুনের কবরের নিকট এক টুকরো ঘাসে-ভরা জমির উপর তপন নিশ্চল-ভাবে বসিয়া ছিল। মিঃ ব্যানার্জি গিয়া দেখিলেন, এবং নমস্কার করিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনি বাঙালী দেখছি—
—হ্যাঁ—বলিয়া তপন তাহার মুখের পানে তাকাইল। মিঃ ব্যানার্জিদের সহিত তাহার পরিচয় নাই। ব্যানার্জি জিজ্ঞাসা করিলেন,–বেড়াতে এসেছেন বুঝি? ক দিন থাকবেন? উত্তবে তপন জানাইল, তাহার কাজ শেষ হইয়াছে, কাল সে আগ্রা যাইবে পরশু বৃন্দাবনধাম দর্শন করিয়া পরদিন কলিকাতা ফিরিবে। মিঃ ব্যানার্জি হয়তো আরো কিছু জিজ্ঞাসা করিতেন, কিন্তু তপন উঠিয়া নমস্কার করিয়া অদূরে দণ্ডায়মান টাঙ্গায় চড়িয়া প্রস্থান করিল। মিঃ ব্যানার্জি ফিরিয়া তপতীকে সব কথা জানাইয়া শেষে কহিলেন,–ভদ্রলোক দেখলেই ও ভয় পায়।
–পায় হয়তো। চলুন; কাল আমরাও আগ্রা যাই।
এভাবে কেন তপনের পিছনে ঘুরিয়া মরিবে, জিজ্ঞাসাব উত্তরে তপতী জানাইল, উহার পিছনে একটু গোয়েন্দাগিরি করা দরকার, নতুবা বাবা-মাকে কি বলিয়া সে বুঝাইবে যে তপনকে বাড়িতে রাখা যায় না। আগ্রায় এবং বৃন্দাবনে সে কি করে জানিতে হইবে। এই সঙ্গে আগ্রা সহরটাও দেখা হইয়া যাইবে আর একবার!
পরদিন নিউ-দিল্লী স্টেশনে একটি প্রথম শ্রেণীর কামরায় আসিয়া উঠিল তপতীদের দল। তপনকে তাহারা অনেক খুঁজিয়াও দেখিতে পাইল না। তপতী সেই দীর্ঘ পথ বসিয়া বসিয়া ভাবিতে লাগিল—হয়তো তপন এ-গাড়ীতে আসে নাই, কিম্বা কোন থার্ডক্লাসের ভিড়ে লুকাইয়া গিয়াছে। যদি না আসে তবে তপতীদের পরিশ্রম বৃথা হইবে। তপতী জানিতে চায়, এতদুরে আসিয়া ঐ অদ্ভুত লোকটা কী করিতেছে।
বেলা বারটায় গাড়ী আসিয়া থামিল। জিনিসপত্র গুছাইয়া সিসিল হোটেলের লোকদের সহিত গাড়ীতে উঠিতে গিয়া মিঃ ব্যানার্জি দেখাইলেন, একটা টাঙ্গায় সুটকেশ ও বেডিং হাতে তপন উঠিয়া চলিয়া গেল। হয়তো কম দামের কোন হোটেলে উঠিবে। এইভাবে পয়সা বাঁচাইতে গিয়া তপন যে তাহার সম্মানিত পিতার কতখানি অপমান করিতেছে তাহা ঐ ইডিয়ট বোঝে না। তপতীর সর্বাঙ্গ জ্বলিতে লাগিল।
হোটেলে আসিয়া স্নানাহার সারিয়া সকলেই বলিল,–ফতেপুর সিক্ৰী, আগ্রা ফোর্ট, ইত্মাৎ-উদ্দৌলা ইত্যাদি দেখিতে যাইবে। তপতীর মন অত্যন্ত ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছে, সে অসুস্থতার ছুতা করিয়া হোটেলেই পড়িয়া রহিল। আগ্রা সে পূর্বে দুইবার দেখিয়াছে। অন্যান্য সকলে চলিয়া যাইবার পর তপতী ভাবিতে বসিল তাহার জীবনের অপরিসীম ব্যর্থতার ইতিহাস। তপনকে ভালবাসিবার আকাঙ্ক্ষা সে তাহার মনের অলিগলিতে ঘুরিয়াও কুড়াইয়া পাইল না। ঐ লোকটার উপর বিতৃষ্ণাই কেবল জাগিয়া উঠে এবং বিতৃষ্ণার কথা ভাবিতে গিয়া ক্রোধে সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া যায়। উহার হাত হইতে উদ্ধার লাভের কি কোন উপায় নাই। সারাদিন চিন্তার পর ক্লান্ত তপতীর মনে হইল, প্রেমের শ্রেষ্ঠ তীর্থ তাজমহলটা একবার দেখিয়া আসিবে! হোটেলের গাড়ী আনাইয়া তপতী উঠিয়া বসিল।
