মিঃ সান্যাল এবার বেশ জোরে হাসিয়া কহিলেন,–আপনার অভিধানে তাহলে সতী কথাটা নেই, কেমন?
—থাকবে না কেন? সৎ কথাটার স্ত্রীলিঙ্গ সতী! কিন্তু সৎ কাকে বলে তা বুঝতে হলে অভিধান দরকার। ঠাকুরদা বলতেন সৎ চিরস্থায়ী আর অপরিবর্তনীয়, কিন্তু এরকম কোন কিছু আমি তো খুঁজে পাইনে। ভগবান যদিবা থাকেন তো তিনি দেশকাল-পাত্র হিসেবে পরিবর্তিত হন, অর্থাৎ তিনি নেই, আছে মানুষের কল্পনা যার পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী।
—ভগবান না থাকাই ভালো, অনেক হাঙ্গামা চুকে যায়। আর থেকেই বা উনি কি করছেন আমাদের?কথাটা বলিয়াই মিঃ ব্যানার্জি টানিয়া টানিয়া হাসিতে লাগিলেন।
–তাঁর থাকার ভয়ানক দরকার, নইলে মানুষ তার হৃদয়ের শ্রদ্ধাভক্তিগুলো দেবে কাকে? চৈতন্যের মতন খোল বাজিয়ে দিনরাত কান্নাকাটি কেবল ঐ নির্বিকার ভগবান সইতে পারেন। ঐ তাণ্ডব কোন মানুষের উপর চালালে সেও যে নির্বিকার পাথরবনে যাবে। তপতীর কথায় আবার সকলে হাসিয়া উঠল।
অকস্মাৎ তপতীর ঠাকুরদার হাতে-গড়া মন চীকার করিয়া উঠিল : এ সত্য নয়, তপতী আত্মবঞ্চনা করিতেছে। নিজেকে সংশোধন করিবার জন্যই যেন সে বলিয়া উঠিল,—ঐ নির্বিকার ভগবান আছে, ও থাক–ওকে মানুষের বড় দরকার। যেকথা নিজের কাছেও বলতে মানুষ কুষ্ঠিত হয়, সে কথাও ওর কাছে বলে খানিকটা হাল্কা হওয়া যায়। জীবনে এমন দুঃসময় আসে, যখন একটা অচেতন কিছুকে চেতন ভোব নিজের সুখ দুঃখের কথা বলতে ভাল লাগে, ভালো লাগে নিজের আরোপিত মেহকেই তার কাছ থেকে ফিরে পেতে। নিজের ক্ষুদ্রতাকে মানুষ নিজের কল্পনায় বিশালতার মধ্যে অনুভব করতে চায়!—তপতী কথাগুলো বলিয়া যেন দম লইতেছে।
–তা হলে ভগবানকে মেনে নিলেন আপনি?—মিঃ ব্যানার্জি পুনঃ প্রশ্ন করিলেন।
—মানা মা-মানায় ওঁর কিছু এসে যায় না, ওঁকে দরকার হলে ডাকবে, না হলে ডাকবার দরকার নেই, এমন সুবিধার জিনিস না ত্যাগ করাই বুদ্ধির কাজ। চলুন এখন সব গোছগাছ করে নিতে হবে।
তপতী উঠিল এবং বাধ্য হইয়া অন্য সকলেও উঠিল।
পরদিন বিকালের ট্রেনে তপতীদের দল মিঃ ব্যানার্জি ও মিঃ সান্যাল কর্তৃক পরিচালিত হইয়া যথাসময়ে হাওড়ায় পৌঁছিয়া রিজার্ভ ফাক্ট ক্লাসের দুইটি কক্ষে স্থান গ্রহণ করিল। ট্রেন প্রায় ছাড়ে ছাড়ে এমন সময় তপন একজন কুলির মাথায় সুটকেশ ও বেডিং লইয়া তপতীদের কামরার সামনে দিয়া চলিয়া গেল।
মিঃ ব্যানার্জি কহিলেন,–তপনবাবুও যাচ্ছে নাকি?
তপতী লক্ষ্য করে নাই; মিঃ ব্যানার্জির কথায় চাহিয়া দেখিল, তপন যে গাড়িতে উঠিতেছে, তাহার দরজাটায় একটা বড় অক্ষরের তিন নম্বর।
মিঃ ব্যানার্জি কহিলেন, কি রকম! থার্ড ক্লাশে যাচ্ছে যে?
তপতী চুপ করিয়া রহিল। বিস্ময় ও লজ্জায় তাহার মাথা নীচু হইয়া গিয়াছে। কিছুক্ষণ চুপ থাকিয়া সে মিঃ ব্যানার্জি ও মিঃ সান্যালকে কহিল,—ও যে আমাদের কেউ, একথা যেন এখানে আর কেউ না শশানে, বুঝলেন! লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছে।
মিঃ ব্যানার্জি বলিলেন,—আমরা এত নির্বোধ নই, মিস চ্যাটার্জি? কিন্তু লোকটা কী ধড়িবাজ। আপনার বাবার কাছে নিশ্চয় ফাৰ্ট ক্লাসের ভাড়া ও আদায় করেছে, টাকাটা জমিয়ে নিল।
ইহা ছাড়া আর কি কারণ থাকতে পাবে। বাবা নিশ্চয় জামাইকে থার্ড ক্লাসে পাঠাঁইবেন। কোটিপতি লোকের জামাই তপন-থার্ড ক্লাসে যাইতেছে, শুনিলে লোকে কী ভাবিবে! রাগে দুঃখে তপতীর কান্না পাইতে লাগিল। স্থির করিল ফিরিয়া বাবাকে বলিয়া ইহার প্রতিকার সে করিবেই। তখনকার মতো তপতী বিষয়ান্তরে মনঃসংযোগের চেষ্টা করিল, কিন্তু মনের ভিতর যেন একটা আগ্নেয়গিরি ফাটিয়া গিয়াছে। তাহার ধুমায়িত শিখায় তপতীর চকু অন্ধ হইয়া যাইবে। ঐ লোকটার সীমাহীন অর্থলোলুপতা তপতীর পিতাকে পর্যন্ত অপদস্থ করিতেছে। ধনীর দুলালী আভিজাত্য গৌরবে গরবিণী তপতী ভাবিতেই পারেনা, থার্ড ক্লাসে যাইতেছে তাহার স্বামী—তাহারই পিতার যাবতীয় সম্পত্তির মালিক!
নির্বাক তপতীর মনের ভাব বুঝিয়া মিঃ ব্যানার্জি কহিলেন,
–আর দেরী করায় লাভ কি মি চ্যাটার্জি? আপনার বাবাকে বলে ওকে তাড়িয়ে দিন বাড়ি থেকে।
–হুঁ–
–আপনার মত মেয়েকে পাওয়া যে-কোন উচ্চ শিক্ষিত যুবকের অহঙ্কারের বিষয়।
—হুঁ—
—অবশ্য বিবাহ বিচ্ছেদের দলিলটা রেজিষ্টারী করিয়ে নিতে হবে তার আগে! তপতী এবারও একটা হুঁ দিয়া অন্য দিকে সরিয়া জানালায় মুখ বাড়াইল।
নিখিল-ভারত-সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় খেয়াল গানে প্রথম পুরস্কার পাওয়ার আনন্দ লাভ করিতে গিয়া তপতীর মন বিষাদে পূর্ণ লইয়া গেল। এই গান তাহার শুনিবে কে? কার জন্য তপতীর এই সাধনা! সে কি ঐ নিতান্ত অপদার্থ একটা গণ্ডমূখের জন্য? তপতীর বিষবাষ্প তপনকে এই মুহূর্তে দগ্ধ করিয়া দিতে চায়! যেন মিঃ ব্যানার্জি এবং মিঃ সান্যাল তপতীর মনের গতি সর্বদা লক্ষ্য কবিতেছেন।
তাহাদের কাজ হাসিল করিবার ইহাই উৎকৃষ্ট সুযোগ। তপতীর নিকট আসিয়া কহিলেন,
–চলুন একটু বেড়িয়ে আসা যাক—হুমায়ুনের কবর দেখে আসি গে!
তপতী আপত্তি করিল না। একটু বাহিরে গিয়া আপনার চিত্তবেগ প্রশমিত করিতে তাহারও ইচ্ছা জাগিতেছিল। ট্যাক্সি চড়িয়া সকলে যাত্রা করিল। পৃথ্বীরাজ রোডের উপর দিয়া গাড়ি চলিয়াছে। দুইপাশে ঘন সবুজ ঘাসে ঢাকা জমি তাহার উপর বাল্লা বন,—যেন সুদূর অতীতের-পথ ধরিয়া চলিয়াছে তাহার পৃথ্বীরাজরেই রাজত্বে!
