মিঃ অধিকারী বলিলেন—লোকটা ব্রাহ্ম, না হিন্দু, না খৃষ্টান? জানেন?—হিন্দুই হবে বোধ ইয়—শিখা কি আর অনা ধর্মের কাউকে বিয়ে করবে! ওর যা হিন্দুয়ানী স্বভাব! ওর বাবা তার উপর যান। আর মা যান বা উপরে।
রেবার কথাকটি শুনিয়া সকলেই হাসিল, হাসিল না শুধু তপতী; গম্ভীর মুখে খানিক বসিয়া থাকিয়া কহিল,ভালই। শিখা হচ্ছে আর্যনারী।
–কেন? আমরাও তো আর্যনারী—আমরাই বা সতীর কম কি? রেবা কহিল।
–বেফাঁস কথা কেন বলিস রেবা—সতীত্বের মানে বুঝিস? তপতীর উষ্ণ কথায় সবাই চুপ হইয়া গেল। মিঃ ব্যানার্জি কহিলেন–আমরাও জানিনে সতীত্বের মানে; আপনি যদি বলেন দয়া করে? শুনে ধন্য হই।
–জানেন—কোন কালে কেউ সতী ছিল বলে আমি বিশ্বাস করি না।
–কেন? সীতা সাবিত্রী, বেহুলা,রেবা তুরিতে কথাটা বলিয়া তপতীর মুখের দিকে চাহিল।
কলহাস্যে তপতী ঘর ভরাইয়া দিয়া বলিল,–থাম থাম-সীতার মতন বোকা মেয়ে পৃথিবীতে আর জন্মায়নি। আর সাবিত্রী তো এক নম্বর পলিটিসিয়ান, আর নির্লজ্জ বেহুলার কথা বলতে ইচ্ছে করে না, একটা ফাষ্ট ক্লাস ককেট। নাচনী সেজে নিজের কাজ গুছিয়ে নিয়ে ফিরে এল!
সবাই উচ্চহাস্য করিয়া উঠিল। মিঃ ব্যানার্জি প্রশ্ন করিলেন,–সীতা বোকা, কিসে প্রমাণ হয়?
-বরাবর। প্রথম, রাবণের মত একটা পশুপ্রকৃতির লোককে অত রূপগুণ থাকা সত্ত্বেও সীতা খেলাতে পারেনি; অশোক বনে পড়ে পড়ে মার খেলো। তারপর আগুনে পুড়ে পরীক্ষা দিয়ে নিজের আত্মার করলো অপমান। রাণী তুই না-হয় নাই হতিস বাপু, তাবলে পরীক্ষা দিবি কিসের জন্য। তিন নম্বর বোকামী তার পরের কথায় তার নিষ্ঠুর স্বামী তাকে দিল বনবাস, আর সে দিব্যি বনে চলে গেল! কেন? সেও তো একজন প্রজা, বিনা অপরাধে তার শাস্তি সে কেন মেনে নিলো?—কেন বিচার চাইল না? তাতে সে স্বামীকেও স্বধর্মের পথে চালনা করতে পারতো! সতী হবার কাঙালপনায় ঐ মেয়েটা নারীত্বের চরম অপমান ঘটিয়েছে। চতুর্থ দফায় সেকরলো পাতাল প্রবেশ! আত্মহত্যার আর ভালো উপায় তখনকার দিনে ছিল কিনা আমার জানা নেই—পটাসিয়াম সায়নাইড় তখনো বার হয়নি, কিন্তু আত্মহত্যা ও করলো কেন? এই কাপুরুষত্ব আই মিন কা-নারীত্ব—সবাই উচ্চৈঃস্বরে হাসিয়া উঠিল, তপতী ধমক দিয়া কহিল,—থামুন হাসি কেন অত? এই কানারীত্ব আমি কিছুতেই সমর্থন করিনে। সীতার যদি এতটুকু বুদ্ধি থাকতো তাহলে রামের গড়া সোনার সীতাকে ভেঙ্গে চুরমার করে বলতে-পারতো, আমি পরীক্ষাও দেব না আত্মহত্যাও করবো না। তুমি আমায় বিয়ে করেছে বনে যদি যেতে হয়, চল দুজনেই। তোমার বোকামীর জন্য আমার একা কেন শাস্তি হবে? তুমি গিয়েছিলে কেন সোনার হরিণ ধরতে? কেন তুমি রাবণের বাড়ি থাকার সময়েই আমায় আত্মহত্যা করতে বলনি? কেন তুমি অগ্নি পরীক্ষাটা এখানেই এনে করলে না? কেনইবা তুমি বিনাবিচারে আমায় বনে পাঠালে? নিজে যেমন তুমি নির্বুদ্ধিতা করে একটা বুড়ো স্ত্রৈণ লোকের কথা রাখবার জন্য বনে গিয়েছিলে তেমনি কি সবাই বোকা নাকি? কিন্তু সীতা এত বোকা ছিল আর ছিল সতীত্বের নামে কাঙাল যে এ-সব কথা ওর মাথায় একদম ঢোকেনি।
আলোচনাটা অত্যন্ত সরল এবং উপভোগ্য ভাবিয়া মিঃ অধিকারী কহিলেন,–আচ্ছা,–সাবিত্রী সম্বন্ধে কি আপনার বক্তব্য?
—সি ওয়াজ এ গ্রেট পলিটিসিয়া। সাবিত্রী সতী কিনা বলতে পারি না, তবে সীতার চেয়ে সে হাজারগুণ বুদ্ধিমতী। যম রাজার মতো ঘড়িয়াল লোককে সে সাতঘাটের জল খাইয়ে দিল!নারীত্বের সম্মান সে কিছুটা রেখেছে, এই জন্য ওকে আমি শ্রদ্ধা করি। দেখুন না রাজার মেয়ে তো, চেহারা নিশ্চয় ভাল ছিল, যম রাজাও এসে গেছে, আর সাবিত্রী আরম্ভ করেছে নানারকম কথার প্যাচ। পুরুষমানুষের মাথা ঘুলিয়ে দিতে কতক্ষণ! শেষ যখন বললো, তার একশ ছেলে চাই, তখন যম ভাবলো আহা বেচারা, এই বয়সে সেক্সআকাঙক্ষাটা মিটোবার বায়না ধরেছে, অস্বাভাবিক তো কিছু নয়! দিয়ে দিলোবর। সাবিত্রী যে পলিশি করে ওর প্রার্থনার মধ্যে সত্যবানের দ্বারা কথাটা ঢুকিয়ে দিয়েছে, রূপমুগ্ধ যমের তখন আর সেদিকে খেয়াল নেই। কেমন কৌশলে বর নিল বলুন তো? একশ ছেলে, বছরে একটা হলেও স্বামী তার অন্তত একশ বছর বাঁচবে। ছেলের আর কিছু দরকার ছিল বলে তো মনে হয় না, দরকার যা ছিল তার সে ঠিক আদায় করে নিয়েছে। এমনি তীক্ষ্ণ বুদ্ধি থাকলে যদি সতী বলা চলে, তাহলে অবশ্য সাবিত্রী সতীই।
মিঃ-সান্যাল পুনরায় প্রশ্ন করিলেন,—বেহুলার কথাটাও বলুন একটু
-ও আর বলে কাজ নেই। ও যখন দেখলে যে দেবতারা তার স্বামীকে বাঁচিয়ে দিতে পারে তখন সেখানে গিয়ে নাচ গান যা কিছু করা দরকার, করে স্বামীর জীবনটাকে ফিরিয়ে নিল, আধুনিক যেসব মেয়েকে চাঁদা আদায় করতে পাঠানো হয়, বেহুলা তাদের চেয়ে অনেক উঁচুদরের ককেট।
তপতীর প্রত্যেক কথা হাস্যোদ্রেক করিলেও তাহার চিন্তাশীলতার গভীরতা অন্যান্য সকলকে অভিভূত করিতেছিল, হাসিতে গিয়াও তাহারা ভাবিতেছিল, তপতীর চিন্তাধারা ভিন্ন খাতে বহিয়া চলে। আর তপতী ভাবিতেছিল, ভারতের চিরবরেণ্যা কয়জন মহামানবীর চরিত্রের যে সমালোচনা সে আজ করিতেছে, তাহা শুনিলে তাহার ঠাকুরদা হয়তো মূচ্ছা যাইতেন। তপতীর মনে বেশ একটা তীব্র সুরার আনন্দ অনুভূত হইতেছে। ঠাকুরদার মৃত আত্মা যদি কোথাও থাকেন তো শুনুন, তাহার নাতনী ঠাকুরদার চিন্তাকে অতিক্রম করিয়া গিয়াছে।
