শিখা আর অনুরোধ করিল না, কিন্তু মনটি তাহার অত্যন্ত বিষণ্ণ হইয়া রহিল দেখিয়া তপন তাহাকে কাছে ডাকিয়া সস্নেহে কহিল,—আমি নাইবা বইলাম রে, যার হাতে তোকে দিচ্ছি সে তোর অযোগ্য হবে না।
-কিন্তু সেদিনটিতে আমি তোমার আশীর্বাদ পাবো না দাদা। আর কারো আশীর্বাদে তৃপ্তি হবে না আমার।
আশীর্বাদ আজও করছি আবার ফিরে এসেও করব। আর যতকাল বাঁচবো করবো। তোদের কল্যাণ কামনাই যে আমার জীবনের ব্রত শিখা। এই বিশাল পৃথিবীতে তুই, মীরা আর বিনায়ক ছাড়া আত্মীয় বলতে তো আমার আর কেউ…।
তপন থমিয়া গেল। অসহনীয় ব্যথায় কণ্ঠস্বর কঁপিয়া উঠিতেছিল। সংযমী তপন আত্মসংবরণ করিল কিন্তু শিখার নারীহৃদয় এ বেদনা সহিতে পারিল না, দরদর ধারায় তরল মুক্তবিন্দু তাহার দুই গণ্ডে ঝরিয়া পরিল। বিনায়ক নীরবেই এই শোকাবহ দৃশ্য অন্যদিন দেখিয়াছে, আজো দেখিল নীরবেই।
আত্মসম্বরণ করিয়া শিখা বলিল,–তপতীর আশা কি তুমি তবে ছেড়েই দিয়েছে দাদা?
—প্রায়; কারণ সে অন্য কাউকে ভালবাসে কি না আমি জানিনে, তবে আমায় সে গ্রহণ করবে না, এটা বহু প্রকারে জানিয়ে দিয়েছে।
–কিন্তু দাদা, তুমি সেখানে যে ভাবে থাকো, যে ছদ্মবেশে সে তোমায় দেখেছে, তাতে তার মতো একজন শিক্ষিতা তরুণীর পক্ষে তোমাকে স্বামী স্বীকার করা কঠিন তো?
—আমি তো বলছিনে শিখা, যে সহজ। কঠিন নিশ্চয়ই। তবে সেটাও সম্ভব, যদি সে আজো অনন্যপরায়না থাকে। আছে কি না জানবার জন্য আমি এত ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করছি। এত অপমান সহ্য করছি। আমি যদি আজ আত্মপ্রকাশ করি, তাহলে তো নিশ্চয়ই সে আমায় গ্রহণ করবে কিন্তু তাতে সে পূর্বে আর কাউকে ভাল বেসেছে কি না, তা আর আমার জানা হবে না।
—তা যদি বেসেই থাকে দাদা, তাহলে কি তুমি ওকে গ্রহণ করবে না?
–নিশ্চয় না। আমার জীবনে অন্যাসক্তা নারীর ঠাঁই নেই। শিখা, আমি কোনো মানবীকে আমার সহধর্মিণীর আসন দিতে চাই, যে মানবী শুধু দেহধর্মিণী নয়। এর জন্য যদি শত জন্মও আমার একক জীবন কাটাতে হয়, সেও ভালো।
শিখা নীরবে তপনের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল, তারপর ধীরে ধীরে বলিল,—মিঃ বোসকে দিয়ে তোমায় অপমান করালো এরপর তোমার আর কিসের সন্দেহ দাদা–ছেড়ে দাও ওবাড়ি।
দেরী আছে ভাই। মিঃ বোসকে দিয়ে আমায় অপমান করানোর জন্য কারণও থাকতে পারে, এমন কি, সে আজো নির্মল আছে ঐটাই তার একটা বড় প্রমাণ।
—তা হলে আরও পরীক্ষা তাকে করবে?
—আমি কিছুই করবো না শিখা, যা-কিছু করবার সেই করবে। আমি শুধু জানতে চাইছি, কাকে সে চায়। তা যদি না জানতে পারি তাহলে ওর মাবাবের কাছে পাওয়া স্নেহের যৎকিঞ্চিৎ ঋণ আমি শোধ করে যাবো—তারই জন্য দিল্লী যাচ্ছি।
তপন অনেকক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া কহিল,—শিখা, এই দেশের মেয়েরাই স্বামীর নিন্দা শুনে মৃত্যু বরণ করেছে, মৃত স্বামীর কঙ্কাল নিয়ে দেশে দেশে ফিরেছে, গলিত কুষ্ঠ স্বামী কাঁধে করে বয়ে বেড়িয়েছে,—আধুনিকতা তোরা; অতটা বাড়াবাড়ি না-হয় নাই করলি! কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে কারো ভাগ্যে যদি মুখ স্বামীই জোটে তো, তাকে কি স্নেহের সুরে একটা কথাও বলবি নে? বন্ধু দিয়ে অপমান করে তাড়াবি? তার চেয়ে নিজেই কি বলা উচিত নয়, তুমি চলে যাও, আমি তোমায় চাইনে। তপতী যদি বলতো, সে অন্য কাউকে ভালোবাসে, তাহলে আমি আনন্দে তাকে তার প্রিয়তমের হাতে তুলে দিতাম। আজো তারজন্যে প্রস্তুত হয়ে আছি আমি, শিখা–কিন্তু তপতীর মনের খবর জানবার সুযোগ আমার খুবই কম। ওর মা-বাবাকে কথাটা জানালে তারা অত্যন্ত আহত হবেন, তাই নিজেই সহ্য করছি। দুঃখ আমি বিস্তর সহ্য করেছি। এটাও সইতে পারবো—তোরা সুখে থাক…
তপন চলিয়া গেল—শিখা নিৰ্ণিমেষ দৃষ্টিতে তার গমন পথের দিকে চাহিয়া রহিল।
তপতী নির্বাক হইয়া চাহিয়াছিল কার্ডখানার দিকে, শিখায় বিবাহের নিমন্ত্রণপত্র। তপতী এবং তপন দুজনকেই এক পত্রে নিমন্ত্রণ করা হইয়াছে। তপতীর গাত্রদাহ হইতেছিল ঐ ইতর লোকটার সহিত তাহার নাম যুক্ত হইতে দেখিয়া। কিন্তু নিরুপায় নিষ্ফল গর্জন ছাড়া তপতী আর কি করবে। সৌভাগ্য এই যে তপতী সেদিন এখানে থাকিবেনা, দিল্লীতে নিখিল ভারত সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় যোগদানের জন্য কালই তারা যাত্রা করিবে।
তপতী নীচে আসিয়া বসিল বন্ধুদের অপেক্ষায়,–অনেক কিছু আয়োজন করিবার আছে তাহাদের। মিঃ ব্যানার্জি, মিঃ অধিকারী, মিঃ সান্যাল, রেবা সিকতা, শৈলজা ইত্যাদি আসিয়া পৌঁছিল।
রেবা বলিল, বন্ধুর বেতে থাকবি নে তুই? কেমন ছেলে রে? তুই জানিস?
তপতী অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সহিত বলিল—জানার দরকার? সে যখন আমায় ছাড়তে পেরেছে তখন আমিই বা না পারবো কেন?
—ঠিক কথা। তবে বিয়েটা কার সঙ্গে হচ্ছে, জানতে ইচ্ছে করে।
–জেনে আয় গিয়ে নাম তো দেখলাম বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। তপতী একটা দীর্ঘশ্বাস নিজের অজ্ঞাতেই মোচন করিল।
মিঃ ব্যানার্জি তাহার কথাটা ধরিয়া বলিলেন,–বিলেৎফেরত নাকি; করে কি?
–জানিনে বলিয়া তপতী অন্যদিকে চাহিয়া রহিল। তাহার নিজের দুর্ভাগ্য আজ তাহাকে অপরের সৌভাগ্যে ঈর্ষান্বিত করিতেছে! তপতী বুঝিতেছে, ইহা অন্যায়; কিন্তু তাহার আয়ত্তের বাহিরে। নিজের মনের এই শশাচনীয় অধোগতি আজ তপতীকে ব্যথা দিল না, বিষাক্ত করিয়া দিল। তাহার যত কিছু জ্বালা তপনের সর্বাঙ্গে ঢালিয়া দিতে পারিলে তপতী যেন কতকটা জুড়াইতে পারে।
