–দেখুন মশাই—তপতী সরোষে কহিল,—এ বাড়িতে থেকে ওসব হাঙ্গার স্ট্রাইক ফাইক করা চলবে না। ওসব করতে হলে যেখানকার মানুষ সেখানে যান–
তপন দুই মুহূর্ত বিমূঢ় হইয়া রহিল, তারপর কিছু না বলিয়াই খাইবার জন্য মার কাছে চলিয়া গেল। তাহার কথাটাকে এভাবে অগ্রাহ্য করার জন্য তপতীর মন উত্তপ্ত লৌহের মতো অগ্নিময় হইয়া উঠিতেছিল, কিন্তু তপনকে খাইবার ঘরের দিকে যাইতে দেখিয়া সে ভাবিল, হয় সে সেখানে গিয়া মাকে সব কথা বলিবে, না হয় নির্বিবাদে খাইবে। কি করে দেখিবার জন্য তপতীও তৎক্ষণাৎ খাইবার ঘরে আসিল। তপন মুখ নামাইয়া একটা চেয়ারে বসিতেই মা বলিলেন,–এসো বাবা, কাল সারা দিনরাত উপোস আছ।
—দিন মা, এবার খেতে দিন কিছু ফল মিষ্টি-নির্লিপ্তের মতো জবাব দিল!
মা তাহাকে ফল মিষ্টি আগাইয়া দিয়ে সহাস্যে প্রশ্ন করিলেন,–সাবিত্রী ব্রত তো মেয়েরা করে বাবা, তুমি কেন করেছ?
ব্ৰতটা আমার মা করতেন, উদযাপনের আগেই তিনি স্বর্গে যান মা, তাই আমি শেষ করে দিচ্ছি। শাস্ত্রে এ রকম বিধান আছে।
–ও! আজো ভাত খাবে না বাবা?
–না মা–ফল জল খাবো-ভাত খাবো কাল।
তপতী বসিয়া চা খাইতেছিল। তপনের কথা শুনিয়া অবাক হইয়া গেল। অপমানিত হইয়া সে তবে অনশন করে নাই, তাহার ব্রত পালনের জন্যই করিয়াছে। কিন্তু গত রাত্রে নিশ্চয়ই কিছু খাইবে বলিয়াছিল, না হইলে মা তাহাকে ডাকিতে যাইবে কেন? রাত্রের না খাওয়াটা নিশ্চয় তপতী ও মিঃ বোসের উপর রাগ করিয়া। কিন্তু মাকে তো কথাটা সে বলিয়া দিতে পারিত না বলার মধ্যে নিহিত রহিয়াছে যে গভীরতম উদ্দেশ্য—টাকা আদায় করিবার মতলব, তাহা হাসিল করিতে হইলে তপতীকে চটানো চলে না, এ বাড়ি ছাড়া চলে না, মা বাবাকে বলা চলে না যে তপতী তাহাকে গ্রহণ করিবে না! ভাল, তপতী নিজেই মা ও বাবাকে জানাইবে—ঐ অর্থ-লোভী মতলববাজ গণ্ডমূর্খটাকে তপতী কোন দিন স্বামী বলিয়া গ্রহণ করিবে না।
এখনি তপতী সেকাজটা করিতে পারি, কিন্তু লোকটা কাল থেকে উপবাসী আছে এখনি একটা হাঙ্গামা করিবার ইচ্ছা সে কষ্টেই মন করিয়া নিজের ঘরে চলিয়া গেল।
-আচ্ছা দাদা, তুমি তো এবার নেতৃত্ব গ্রহণ করতে পারো।
–না; শিখা, নেতার কাজ অত সোজা নয়। মনে করলেই নেতা হওয়া যায় না।
–তা হলে নেতার লক্ষণ কি দাদা, কি দেখে চিনবো?
–নেতার ডাক হবে দুর্বার—ইরেজিস্টিবিল্। শ্রীকৃষ্ণের বাঁশী শুনে ব্রজগোপীরা যেমন কুল-মান বিসর্জন দিয়ে ছুটে যেতো, নেতার ডাক হবে তেমনি।
-কোথায় সে নেতা পাবো দাদা?
—সেজন্য চিন্তা নেই বোনটি–যেদিন তোরা মানুষ হবি, সেদিন নেতাও আসবেন। মানুষের নীতিকে আজ যারা পদদলিত করছে, স্বেচ্ছাচারিতায় আজ যারা বনের পশুকে হারিয়ে দিচ্ছে, তাদের জন্য পাশব-শক্তির আবির্ভাব পৃথিবীতে বিরল নয়। কিন্তু বহু যুগ পূর্বে জন্মগ্রহণ করেও পশ্বের প্রাণী এই মানব আজো পশুধর্ম ছাড়তে পারলো না। এই পশুধর্মকে যিনি জয় করতে পারবেন, তিনি হবেন সেই নেতা!
পশুধর্ম একেবারে কি করে ছাড়া যায় দাদা—মানুষ তো পশুও!
–না শিখা, প্রাণীও বলতে পারিস। প্রাণধর্ম তো তাকে বিসর্জন দিতে বলা হচ্ছে। প্রাণকে মহান করতে, বিশাল করতে বলা হচ্ছে। শিখা! আমি কতকগুলো কঠোর নিয়ম পালন করি; দেখে হয়তো তোরা আবিস-দাদা তোদের গোঁড়া। কিন্তু ভেবে দেখেছিস কি—পশুর কোন বাঁধা-ধরা নীতি নেই। উদর পালনের প্রয়োজনই তার নীতি। তাছাড়া অন্যনীতি যদি কেউ পালন করতে পারে তো সে মানুষ। সত্য কথা নিশ্চয় বলবো এই প্রতিজ্ঞা মানুষই করতে পারে। হিংসা করবো না”–এ নীতি মানুষেরই পালনীয়! ঈশ্বর বলে কেউ থাকুন আর নাই থাকুন—প্রকৃতি মানুষের মধ্যে যে ভাল-মন্দ বোঝবার শক্তি দিয়েছেন,–যে কল্যাণকারী বুদ্ধিটুকু দিয়েছেন, মানুষ কেন তাকে ব্যবহার করবে না, বলতে পারিস?
শিখা অনেকক্ষণ স্তব্ধ হইয়া রহিল। বিনায়ক আসিয়া বলিল,–তোমাদের ভাইবোনের গল্প তো আর শেষ হবে না, এদিকে রান্নাকরা খাদ্য সব ঠাণ্ডা মেরে যাচ্চে, আর পেটের খিদে গরম হয়ে উঠেছে।
শিখার দুটি চোখ দরদে ভরিয়া উঠিল,–ওঃ! এত খিদে পেয়েছে আপনার? তো ডাকলেই পারতেন আমাদের! চলুন চলুন।
তপন হাসিয়া বলিল,–না কহিতে ব্যাথাটুকু পার না বুঝিতে?
যাও বলিয়া শিখা প্রায় ছুটিয়াই পলাইতেছে, তপন তাহার বেণীটা ধরিয়া আটকাইয়া ফেলিল, তারপর বলিল,–মিতা পাতিয়েছিস যে,—কি রকম মিতা তাহলে। খিদের সময় বুঝতে পারিস নে?
-আমি দাদারই খিদের কথা ভুলে গিয়েছিলাম, তা মিল।
–তা হলে ওকে আর এক ডিগ্রি প্রমোশন দে ভাই শিখা। ও খিদে মোটেই সইতে পারে না।
–মানে? কোন ক্লাসে প্রমোশন।
—মিতার উপরের ক্লাসে?
শিখা হাসিতে গিয়া লজ্জায় লাল হইয়া উঠিল, বিনায়ক হাসি চাপিতে গিয়া অত্যধিক গম্ভীর হইয়া গেল এবং তপন ভাতের হাঁড়িটা লইয়া পাতায় ভাত পরিবেশন করিতে লাগিল।
খাওয়া শেষ হইলে শিখা বলিল—তুমি দিল্লী কি জন্যে যাবে দাদা। কদিন দেরী করবে সেখানে?
–দিন দশ মাত্র। কি জন্য যাবো সেটা এখন নাই শুনলি ভাই?
—তুমি বড় কথা লুকিয়ে রাখ দাদা। শুনলাম তো কি হলো ক্ষতিটা!
—প্রকাশ করে ফেলতে পারিস সেটা আমি চাইনে। কাজে সিদ্ধিলাভ করে অন্যের মুখে সুযশ শোনা আমার শিক্ষা বোনটি! তবে মনে রাখ—মিঃ আর মিসেস চ্যাটার্জির স্নেহঋণ শোধ করবার জন্যই যাচ্ছি।
