কি মতলবে যে সে এখন এখানে বাস করিতেছে তাহা বোঝ তপতীর বুদ্ধির বাহিরে, কিন্তু মতলব তাহার যে একটা কিছু রহিয়াছে তাহা তপতী বুঝিতে পারিতেছে। টাকা সে লইয়াছে, এবার তো অনায়াসে সরিয়া পড়িতে পারে। কিন্তু আরো টাকা আদায় করিবার জন্যই সে আছে নিশ্চয় অথবা ধীরে ধীরে তপতীর মনকে জয় করিতে চায় সে। সে মতলব যদি উহার থাকে তবে তপতী যেমন করিয়াই হোক উহার উদ্দেশ্য ব্যর্থ করিয়া দিবে। তপতীর সঙ্কল্প স্থির হইয়া গেল। সে আসিয়া ফোন করিল মিঃ বোসকে। তাহার সহিত তপতী বেড়াইতে যাইবে আজ। মিঃ বোস কয়েক মিনিটের মধ্যেই আসিলেন; সুসজ্জিত তপতী তাঁহাকে নীচের তলায় অভ্যর্থনা করিল, ইচ্ছাটা, তপন এখনি জলযোগের জন্য বাড়ি ফিরিয়া তপতীকে মিঃ বোসের সহিত একাসনে বসিয়া থাকিতে দেখিয়া আর একবার অপমানিত হইবে। কিন্তু অনেকক্ষণ বসিয়া থাকিবার পরও তপন আসিল না দেখিয়া তপতী ও মিঃ বোস বাহিরে চলিয়া গেল মিঃ বোসেরই গাড়ীতে।
রাত্রি প্রায় দশটায় তপতী স্বয়ং মিঃ বোসের গাড়ী চালাইয়া বাড়ি ফিরিতেছে, মিঃ বোসও পাশে বসিয়া আছেন–তপতী দেখিল গেটের নিকট দারোয়ানগুলোর সঙ্গে তপন কি কথা বলিতেছে। গাড়ীর হর্ণ না দিয়াই তপতী চলিয়া যাইবে কিন্তু তপন ফিরিয়া দাঁড়াইয়াছিল, দেখিতে পাইল না। মিঃ বোস তপনকে উদ্দেশ্য করিয়া ধমক দিলেন, রাস্তায় দাঁড়ান কেন? ইডিয়ট।
তপন বিস্ময়-বিহ্বল দৃষ্টিতে চাহিল এবং তৎক্ষণাৎ পাশে সরিয়া দাঁড়াইল। তাহাকে এভাবে অপমানিত হইতে দেখিয়া দারোয়ানগুলো পৰ্য্যন্ত বিচলিত হইয়া উঠিল, কিন্তু তপতী গাড়ীটা চালাইয়া যাইতে যাইতে বলিয়া গেল,–ইডিয়ট মানেই ও জানে না মিঃ বোস—অনর্থক গলা ফাটাচ্ছেন।
তপন নীরবে,নতমুখে প্রায় সাত মিনিট দাঁড়াইয়া রহিল সেইখানেই স্থাণুবৎ। চলৎশক্তি তাহার যেন থামিয়া গিয়াছে। তপতী মিঃ বোসকে এক কাপ কোকো পান করিয়া যাইবার জন্য অনুরোধ করিয়া ভিতরে লইয়া গেল, তপন তাহাও দেখিল, তারপর ধীরে ধীরে আসিয়া উপরে উঠিল, ক্লান্ত, শ্রান্ত দেহভার বহন করিয়া।
তপতী মিঃ বোসকে কোকো খাওয়াইয়া বিদায় করিল। মার কাছে যাইতেই তিনি বলিলেন,–তপন এখনো এলো না কেন রে, জানিস?
এসেছে তো।—বলিয়া তপতী মার পানে চাহিল হাসিমুখে। মা ভাবিলেন, হয়তো উহারা একসঙ্গেই বেড়াইতে গিয়াছিল। তিনি তপনের দরজায় আসিয়া ডাকিলেন,—এসো বাবা, খাবে এসো!
–আজ কিছু খাব না মা-লক্ষ্মী মা, আপনি জেদ করবেন না, বড্ড ক্লান্তি লাগছে—শুয়ে পড়েছি!—তপন উত্তর দিল।
-সে কি বাবা! একটু দুধ মিষ্টি?-মা অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে কহিলেন।
-না মা, না—আজ কিছু না—আমায় শুতে দিন একটু! তপনের স্বর এত করুণ যে মা আশ্চর্যান্বিত হইয়া তপতীকে আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ঝগড়া টগড়া কিছু করেছিস খুকী?
—আমার অত দায় পড়েনি! আমি খেয়ে এসেছি ফারপোতে। আজ আর খাব না কিছু বলিয়া তপতী চলিয়া গেল।
মা কিছুই বুঝিতে না পারিয়া নানা সন্দেহ দোলায় দুলিতে লাগিলেন। শেষে তিনি নিজের মনকে বুঝাইলেন, হয়তো তপন কিছু খাইয়া থাকিবে। আজ তাহার সাবিত্রী ব্রত বলিয়া সারাদিন তপন উপবাসী আছে, রাত্রে ফল মিষ্টি খাইবে ভাবিয়া মা সব ঠিক করিয়া রাখিয়াছিলেন, কিন্তু খুকী হয়তো দোকানেই কিছু ফল মিষ্টি খাওয়াইয়াছেনা হইলে খুকী আর চুপ করিয়া থাকিতে পারিত!
তপতী এতক্ষণ ভাবিতেছিল—আজ সে তপনকে চরম অপমান করাইয়াছে। ইহার পরও যদি সে এ বাড়ি না ছাড়ে তবে তপতী আর কি করিতে পারে! মিঃ বোস অবশ্য জানেন না তপনের সঙ্গে এ বাড়ির সম্পর্ক কি। তিনি উহাকে একজন পোষ্য মনে করিয়া এবং তপতী উহাকে দুই চক্ষে দেখিতে পারে না জানিয়া তপতীর প্রীত্যর্থেই উহাকে ইডিয়ট, বলিয়াছেন। তপতী বেশ কৌশলেই মিঃ বোসকে দিয়া তপনকে অপমানটা করাইয়া লইল। অন্য কেহ, যাহারা তপনের সহিত এ বাড়ির সম্বন্ধে অবগত আছে, তাহারা সাহস করিত না। তপন নিশ্চয়ই ইহার পর চলিয়া যাইবে।
কিন্তু তপনের সহিত মার কথাগুলি তপতী শুনিয়াছে। লোকটা খাইল না কেন। তপতীর এবং মি বোসের কৃত অপমানের প্রতিকারের জন্য সে অনশন আরম্ভ করিল নাকি! আশ্চয্য নয়! তপন যে আজ সমস্ত দিনই খায় নাই, তপতী সে সংবাদ অবগত নয়! তপন অনশন আরম্ভ করিয়াছে, অন্ততঃ আজ রাত্রে কিছু না খাইয়া তপতীকে বুঝাইয়া দিতে চায় যে, সে অপমানিত হইয়াছে। ঐ ভণ্ড প্রবঞ্চক মনে করিয়াছে, তপতী ইহাতে ভয় পাইয়া যাইবে। না, তপতী ভয় পাইবে না। কাল সকালে যদি সে মা-বাবার নিকট সব কথা প্রকাশ করে তাহাতেও তপতীর ভয় পাইবার কোন কারণ নাই। বরং সে ভালই হইবে! মা ও বাবাকে তপতী উহার স্বরূপ চিনাইয়া দিবে।
অনেকক্ষণ ভাবিয়া তপতীর মনে হইল,—মিঃ বোস যখন জানিবেন, তপতীর সহিত ঐ লোকটির সম্বন্ধ কি, তখন তপতীকে তিনি কি মনে করিবেন? ভালই মনে করিবেন। একান্ত অনুপযুক্ত ভাবিয়া তপতী উহাকে অপমান করিয়াছে। কিন্তু মা-বাবা যদি খুব বেশী চটিয়া যান। মা তো নিশ্চয়ই চটিয়া যাইবেন। আজই যদি তপন বলিয়া দিত, কি কারণে সে খাইল না, তাহা হইলে মা হয়ত এখনি একটা অনর্থ ঘটাইতেন। কিন্তু কেন সে কিছুই বলিল না? এখনো কি এই বাড়িতে থাকিবার ইচ্ছা পোষণ করে! নানা দুশ্চিন্তার মধ্যে তপতীর ভাল নিদ্রা হইল না।
সমস্ত রাত্রি আপনার দুর্ভাগ্যের কথা ভাবিয়া তপন সকালে স্নান করিয়া পূজায় বসিল। দারুণ অপমানে মনটা তাহার বিকল হইয়া গিয়াছে, ধ্যানে মনঃসংযোগ হইতেছিল না। অনেক-অনেকক্ষণ পরে পূজা শেষ করিয়া সে উঠিল এবং বাহিরে যাইবার বেশ না পরিয়াই দরজা খুলিয়া বিস্ময়ের সহিত দেখিল, তপতী বারান্দায় দাঁড়াইয়া আছে স্নানসিক্ত চুলগুলি পিঠে ছড়াইয়া। তপনের ঘরের এত কাছে তপতী কোনদিন আসে নাই। তপন অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হইয়া অপেক্ষা করিতে লাগিল, যদি তপতী কিছু বলে। আশা এবং উদ্বেগে তাহার অন্তর আন্দোলিত হইতেছে।
