তপন খাইতে খাইতে বলিল—ও বেলা জল খেতে আসবো না মা।
কেন বাবা? কোথায় যাবে?—মা প্রশ্ন করিলেন!
আমার সেই ছোট বোনটির বাড়ি—তাকে নিয়ে আজ সিনেমা যেতে হবে। মা এক মিনিট চুপ করিয়া থাকিয়া বলিলেন,–খুকীকেও নিয়ে যাবে বাবা;-খুকী প্রতিবাদ না করিয়া বসিয়া রহিল।
তপন বলিল, তা কি করে হবে মা? আমার বোনের বাড়ি আপনার খুকী কি করে যাবে! কুটুম্বের বাড়ি তো কিনা নিমন্ত্রণে যায় না কেউ!
মাতা আপনার ভুল বুঝিতে পারিয়া বলিলেন,–হ্যাঁ বাবা, ও কথা আমার মনে হয়নি। কোন সিনেমায় যাবে? যাবার পথে হলে তুলে নিও ওকে!
—আমি ট্রামে যাবো মা, আর যাবো ও পাড়ার দিকে; এ পথে মোটেই পড়বে না!
তপন চলিয়া গেল। তপতী খাইয়া উঠিয়া খবরের কাগজ খুলিয়া দেখিল জ্যোতি গোস্বামী নামক জনৈক লেখকের লেখা একখানা বই ওখানে আজই প্রথম আরম্ভ হইবে। সেও স্থির করিল, ঐ সিনেমায় যাইবে।
বিকালে তিন চারজন বন্দু বান্ধবী লইয়া তপতী আসিয়া দেখিল হাউসফুল টিকিট পাইয়া তাহারা ফিরিয়া যাইতেছে, এমন সময় মিঃ ব্যানার্জি চ্যাঁচাইয়া উঠিলেন, তপনবাবু।
তপন মুখ তুলিয়া তাকাইল,–কিছু বলছেন?
তপতী সবিস্ময়ে চাহিয়া দেখিল, তপনের পাশে একটি সুন্দরী মেয়ে! তপতীর সর্বাঙ্গ জ্বলিয়া উঠিল, ঈর্ষায় বা ইতরতায়!
মিঃ ব্যানার্জি কহিলেন,—আমরা টিকিট পাচ্ছি না; আপনার কেনা হয়েছে?
তপন জিজ্ঞাসা করিল,কজন আছেন আপনারা?
–পাঁচজন–বলিয়া মিঃ ব্যানার্জি ফিরিয়া যাইতেছিলেন, তপন বলিল—এক মিনিট দাঁড়ান, দেখছি।
সকলেই উহারা অবাক হইয়া দাঁড়াইয়া আছে, তপন সেই মেয়েটির হাত ধরিয়া চলিয়া গেল। মিনিট দুই পরে একজন সুদর্শন যুবক আসিয়া বলিল—আসুন আপনারা।
—টিকিট পেয়েছেন?
—হ্যাঁ।
তাহাদের সকলকে লইয়া গিয়া বক্সে বসাইয়া দিল বিনায়ক।
তপতীদের আশ্চৰ্য্যবোধ হইতেছে। তপন কেমন করিয়া টিকিট কিনিতে পারিল? বোধ হয় ঘুষ দিয়া তপতীর সম্মান রক্ষা করিয়া থাকিবে। টাকা তো তাহারই বাবার; কিন্তু সে নিজে বসিল কোথায়? নিজেদের টিকিটগুলিই উহাদিগকে দিয়াছে নাকি চতুর্দিকে চাহিয়া অন্বেষণ করিয়াও তপন কিংবা সেই মেয়েটির কোন সন্ধান মিলল না। তপতীর ভযে মেয়েটাকে লইয়া পলাইয়া গেল নাকি!
মিঃ ব্যানার্জি তপতীকে বলিলেন,–তপনবাবুকে দেখছি না। পালিয়েছে নিশ্চয়।
তপতী শুধু বলিল হুঁ!
সিনেমা আরম্ভ হইল। একটি নারী-জীবনের বেদনার ইতিহাস স্বামী বঞ্চিতা ঐ দুর্ভাগিনী নারী স্বামী আসিবে ভাবিয়া নিত্য ফুলশয্যা রচনা করে অঙ্গনে আলপনা দেয়, পথের দুৰ্ব্বাকে চুম্বন করিয়া বলে,আমার প্রিয়তম যেদিন আসিবে তোমার কোমল বুকে চরণ ফেলিয়া, সেদিন হে শ্যামল দুর্বাদল, তোমায় আমি শত চুম্বন দান করিব। তথাপি তাহার প্রিয় আসিল না, আসিল তাহার বাণী : প্রিয়া, তোমার আমার মাঝখানে চোখের জলের নদীটি যুক্ত হল। তোমার আমার মাথায় একই আকাশ সেই জলে প্রতিবিম্বিত হচ্ছে। মনে হচ্ছে তুমি এসেছো, শুধু চোখের জলটুকুর ব্যবধান। ঐটুকু থাক—তোমায় পরিপূর্ণ করে পেয়ে ফুরাতে চাইনে—তুমি থাকো না পাওয়ার আলোকে অফুরন্ত আশা হয়ে আমার মনের গহন গভীরে।
তপতী বিমুগ্ধ চিত্তে দেখিল। তাহার রসগ্রাহী মন স্তব্ধ বিস্ময়ে প্রশ্ন করিল কে এই রূপদক্ষ কবি?
প্রশ্নটার কেহই উত্তর দিতে পারিল না, কারণ চিত্রলিপিতে লেখকের কোন পরিচয় নাই। কেন যে এই অদ্ভুত নাট্যকার নিজেকে এমনভাবে প্রচ্ছন্ন করিলেন; তপতী ভাবিয়া পাইল না।
বাড়ি ফিরিয়াই সে তপনের ঘরের দিকে চাহিল, তপন তখনো ফেরে নাই। কোথায় গিয়াছে সেই মেয়েটাকে লইয়া? খাইতে খাইতে সে, ভাবিতে লাগিল সিনেমার কথা।
তপন আসিয়া বাহির হইতে বলিল—খেয়ে এসেছি মা, আর কিছু খাব না।
তপতীর রাগ আরও বাড়িয়া গেল। ওখানে রাত্রির খাওয়া পর্যন্ত খাওয়া হয়! তপন চলিয়া গেলে তপতী জিজ্ঞাসা করিল—ওর কি রকম বোন মা, মার পেটের না পাতানো!
–নারে খুড়তুতো। মেয়েটা নাকি ছেলেবেলা থেকে ওর খুব নেওটা।
ওঃ! তপতী ঠোঁটের আগায় একটা বিদ্রূপধ্বনি তুলিয়া চলিয়া গেল আপনার ঘরে।
০৬. তপতীর জীবন
তপতীর জীবন যেরূপভাবে গড়িয়া উঠিয়াছে, তাহাতে আধুনিক সমাজের কোন ছেলের পক্ষে তাহার মন জয় করা সহজ নয়, আবার প্রাচীন সমাজের পক্ষপাতী কাহারো পক্ষে তপতীকে মুগ্ধ করা অত্যন্ত কঠিন। প্রাচীন এবং আধুনিক সংস্কারের সঞ্চয়ন হইয়াছে তাহার জীবনে কিন্তু সমন্বয় হয় নাই। তাহার ঠাকুরদার শিক্ষা পদ্ধতি ছিল একদেশদর্শী, প্রাচীন—আবার তাহার পিতার শিক্ষাপদ্ধতি একান্তভাবে আধুনিক। দুইটি শিক্ষাকে একত্র মিলাইবার ক্ষীণ চেষ্টা করিতেছেন তপতীর মাতা কিন্তু প্রগতিবাদের উদ্ধৃঙ্খল স্রোতে তাহার বাঁধ বাঁধাইবার দুর্বল প্রচেষ্টা ভাসিয়া গিয়াছে। যেটুকু তিনি করিয়াছেন, তাহার ফল হইয়াছে বাধাপ্রাপ্ত জলস্রোতের মতো আরো উদ্দাম। চিন্তার সমুদ্রে তপতী আছাড় খাইয়াছে এ কয়দিন। তপনকে নানাভাবে অপমান করিয়া তাড়াইয়া দিবার কল্পনা করিয়াছে, আবার ভাবিয়াছে; তাড়াইয়া কাজ নাই তপন তো তপতীর কোন ক্ষতি করে না।
কিন্তু সেদিন সিনেমায় একজন সুন্দরী নারীর সহিত তপনকে দেখার পর হইতে তপতীর মনে আগুনের জ্বালা ধরিয়া গিয়াছে। ঐ মেয়েটা উহার আপন বোন নয়, হয়তো কেহই নয়, মিথ্যা করিয়া বোন বলিয়া পরিচয় দিয়াছে। না হোক, তপতী তার জন্য ঈষা করিবে না, ঈর্ষা করিবার কারণও নাই। তপন যে-চুলোয় খুশী যাইতে পারে কিন্তু তপতী তাহার নিজের বাড়িতে বসিয়া তাহার পিতার জনৈক অন্নদাসের নিকট এ অপমান সহ্য করিবে না। ইহার প্রতিকার করিবার জন্য সে তপনকে সাংঘাতিক অপমান করিবার সঙ্কল্প করিল।
