–জন্মেছে। তাই কাঞ্চনকান্তি দেখতে এলাম।
—এখানে তো সব তথীশ্যামা : কাঞ্চনকান্তি চান তো কান্যকুব্জে যান।
–সে আবার কোন্ দেশ? মিঃ বোস প্রশ্নের সঙ্গে হাসিয়া উঠিলেন।
—জিওগ্রাফি দেখতে হবে, কারণ আমিও জানিনে।
—জেনে দরকার নেই—এখানেই-পেয়েছি কাঞ্চনকান্তি!
—পাশেই বুঝি?
তপতী নিজের দিকেই ইঙ্গিত করিল। মিঃ বোসের স্বপ্ন কি তবে সত্য হইবে! তপতী, তপস্যার ধন তপতী! মিঃ বোস তপতীর একখানা হাত নিজের হাতে ধরিয়া বলিলেন,—রিয়েলি আই হ্যাভ নো হোয়ার সিন সাচ এ বিউটিফুল গার্ল লাইক ইউ।
তপতী আপন ঠোঁটের সহিত ঠোঁট মিলাইয়া একটা মিষ্টি শব্দ করিয়া বলিল,—ও কথা অনেকের কাছেই শুনেছি।
—চির পুরাতনটাই চিরদিন সুন্দর মিস্ চ্যাটার্জি!
-তা নয়, চিরসুন্দরটাই চিরদিন পুরাতন। কারণ পুরাতন হলেও তা সুন্দর না হতে পারে কিন্তু সুন্দর হলেই তা আর পুরানো হয় না। যেমন এই পৃথিবী, ঐ আকাশ, ঐ সব গ্রহ-নক্ষত্র! ওরা পুরানো বলেই সুন্দর নয়, সুন্দর বলেই চির নূতন।
মিঃ বোস তাহার বিলাতি বিদ্যায় সুবিধা করিয়া উঠিতে পারিতেছেন না। কিছুক্ষণ ভাবিয়া বলিলেন,–প্রেমের বাণী কি পুরাননা নয়?
–প্রেমের বাণী সুন্দর বলেই পুরানো নয়—পুরানো হয় না।
–তাহলে আমার কথাটাকে আপনি পুরানো বলবেন কেন?
—ওটা আপনার প্রেমের বাণী নাকি? ওতো রূপমুগ্ধ পুরুষচিত্তের একটা স্তাবকতা! প্রেমের বাণী অমন হয় না।
-কি রকম হয় তাহলে?
–তা জানিনে, আজো শুনিনি কারো কাছে।
—সিনেমা শেষ হইয়া গিয়াছে। তপতী পূনরায় বলিল—সময়টা গল্পেই কাটলো, কিছুই দেখলাম না।
–কাল আবার আসবেন?
—দেখা যাবে বলিয়া তপতী আসিয়া গাড়ীতে উঠিল।
বাড়ি ফিরিতেই মা তাহার পূর্ব সঙ্কল্পমতো তপতীকে বকিতে গিয়া দেখিলেন, কাপড় ছাড়িয়া তপতী বিছানায় বসিয়া আছে, দুটি চোখে তাহার জল টলমল করিতেছে।
মা ব্যাকুলভাবে জিজ্ঞাসা করিলেন,—কি হলো মা, খুকু?
–জানিনে—যাও–বলিয়া তপতী শয্যায় লুটাইয়া ফুলিয়া ফুলিয়া কাঁদিতে লাগিল।
বিস্মিত বেদনাহত মা অনেকক্ষণ তপতীর মাথায় হাত বুলাইয়া আবার ডাকিলেন, হয়েছে খুকী—আমায় বলতে তোর লজ্জা কিরে?
—কিছু না মা, ঠাকুরদার কথা মনে পড়ছিল। বুড়ো আমায় বড্ডো ঠকিয়ে গেছে।
–ছিঃ মনি স্বগত মহাপুরুষের নামে ও কথা বলতে নেই। কি হলো কি?
তপতী খানিকটা সামলাইয়া লইয়াছে। উঠিতে উঠিতে বলিল—তোমার শ্বশুর তোম কাছে মহাপুরুষ, আমার ঠাকুরদা, যা খুশী বলবো ওকে।
উঠিয়া তপতী কাপড় ছাড়িতে চলিয়া গেল। মা বলিয়া আসিলেন কাপড় ছেড়ে খেতে আয় রাত হয়ে গেছে মা!
তপতী কাপড় ছাড়িতে ছাড়িতে ভাবিতে লাগিল-ঠাকুরদা বলিতেন তপতীর স্বা হইবে অদ্বিতীয় প্রেমিক, অদ্বিতীয় মানুষ, যাহার জন্য তপতী সহস্র প্রলোভনের মা আজও নিজেকে অনাঘ্রাতা রাখিয়াছে। সে কি ঐ ধূর্ত অর্থলোভীটার জন্য! জ্যোতি কোনদিন সত্য হয় না!
মানুষের মন এমনভাবে গঠিত যে নিজের সম্বন্ধে সমালোচনা করিতে সে ভয় পায়! মনে অজ্ঞাতসারে সে এড়াইয়া যায় তাহার দুষ্কর্মগুলির অপরাধ অথবা আপনার দুর্বলতা দিয়ে সে সমর্থন করে তার কৃতকর্মকে। তপতী যদি তপনের প্রতি তাহার কৃত ব্যবহারের কথা একবারও ভাবিত তাহা হইলে হয়ত বুঝিতে পারিত, দোষটা সবই তপনের নয়; অত্যাধুনিক হইতে গিয়া সে তাহার পূর্ব সংস্কৃতি তাহার চেতনা হইতে হারাই ফেলিয়াছে; আর তাহার অবচেতন মনে জাগিয়া রহিয়াছে বংশপরম্পরায় লব্ধ সংস্কার এই দুই পরস্পরবিরোধী সংস্কারের সংঘাতে তপতী নিজের অজ্ঞাতসারেই হইয়া উঠিত উদ্দাম, উচ্ছঙ্খল। তপনের মধ্যেও যে কিছুমাত্র ভাল থাকিতে পারে, ইহা যেন সে ভাবিতে চাহে না। ভাল কিছু না থাকিলেই সে যেন খুশি হয়। মা-বাবা উহাকে এত ভালবাসে তপতী যেন ঈর্ষায় জ্বলিয়া যায়। উহাকে ভালবাসিবার কোন কারণ নাই। বার কতক মা বলিয়া ডাকিলে আর যাত্রাদলের মার্কা দেওয়া বাহবা পাওয়া বুলি আওড়াইলেই কাহারও ভালবাসা পাইবার যোগ্যতা জন্মে না। উহার আলাপ করিবার সঙ্গী একমাত্র মা—তা মার সহিত কিই বা কথা ও কয়? কথা কহিবার আছেই বা কি? যদি বা থাকে বাড়িতে তো সে সব মিলাইয়া আধ ঘন্টার বেশী থাকে না, এমন কি রবিবারেও না। তার মধ্যে ছয় ঘণ্টা ঘুম।
টাকাটা লইয়া কি যে করিল, কেহ জানিতে পর্যন্ত পারিল না! ব্যাঙ্কে জমা রাখিয়াছে আর কি! কাল বাবা মাকে বলিলেন—টাকা নিয়ে কি করছে জানতে চেও না, মদও তো ও খায় না। মদ-ভাং না খাওয়া ছাড়া টাকা খরচ করিবার যেন আর পন্থা নাই? আর খরচই বা করিবে কেন? ভবিষ্যতের জন্য করিতেছে। ও তো নিঃসন্দেহে বুঝিয়াছে, তপতী উহাকে তাড়াইয়া দিবে। তাই যতদূর সম্ভব সাবধানে কাজ গুছাইতেছে।
তপতী ক্লান্তি অনুভব করিতেছে। এই বিরক্তিকর পরিস্থিতি সে আর কতদিন ভে করিবে। উহাকে তাড়াইয়া দিলেই তো সব লেঠা চুকিয়া যায় কিন্তু তাড়াইবার উপায় বাহির করা সহজ নহে।
তপন খাইতে বসিয়াছে। কি কথা কহিতেছে, শুনিবার জন্য তপতীও গিয়া খাইতে বসিল। তপন মুখ নত করিয়া বসিয়াছে। মা জানেন, এখনো তপনের লজ্জা ভাঙে নাই, বলিলেন—তুই একটু পরে খাবি খুকী।
—কেন। আমি তোমার ছেলের কেড়ে খেতে যাব না। খিদে পেয়েছে আমার।
সন্তান ক্ষুধা পাইতেছে বলিলে কোন মাতা আর স্থির থাকিতে পারেন না, তথাপি মা ইতস্তত করিতেছিলেন। তপতী চাপিয়া বসিল–না খাইয়া যাবে না। অগত্যা তাহাকে খাবার দিলেন।
