মা, তাঁহার খুকীর দুরভিসন্ধি কিছুমাত্র অবগত নহেন।হাসিয়া বলিলেন,—নিজে বলতে পার না? লাজুক মেয়ে!
–নিজের জন্য তো নয় মা, একজন অতিথির জন্য তাই লজ্জা করছে।
মা বিশেষ কিছু বুঝিলেন না, ফোন করিয়া দিলেন তপনকে। বিজয়িনীর আনন্দে তপতী ভাবিতে লাগিল, বোকা মা কিছুই বুঝিলেন না যে তাহাকে দিয়াই তাহার মেহপাত্রকে কেমন করিয়া তপতী অপমান করিল। ফুলগুলি লইয়া যখন সে আসিবে, তখন তাহার সম্মুখেই মিঃ বোসকে তপতী তাহারই আনা ফুল উপহার দিবে। তপতী সাজিয়া-গুজিয়া অপেক্ষা করিতে লাগিল।
মিঃ বোস আসিয়া পৌঁছিলেন অথচ ফুল এখনো আসিল না, তপতী অত্যন্ত চটিয়া বিরক্ত মুখে মিঃ বোসকে চা পরিবেশন করিতেছে দোতলার বারান্দায়। ঠিক সাড়ে পাঁচটার সময় তপন কাগজে মোড়া একগোছ ফুল লইয়া সিঁড়ি দিয়া উঠিতেছে, দেখিয়া তপতী হরিতে নিকটবর্তী হইয়া বলিল,বড্ড দেরী হোল,—দিন,—সে হাত বাড়াইল ফুলগুলি ইবার জন্য। কাছেই একটা ছোট টিপয় ছিল, তপন নীরবে ফুলের গোছাটা সেই টিপয়ের পর রাখিয়া দিয়া চলিয়া যাইতেছে, রাগে তপতীর আপাদ-মস্তক জ্বলিয়া উঠিল, সরোষে গর্জ্জন করিয়া সে কহিল—হাতে দিতে পারেন না! একে তো আনলেন দেরী করে!
তপন ফিরে তাকাইল না, ধীরে ধীরে যাইতেছে, মিঃ বোস জিজ্ঞাসা করিলেন,–কে লোকটি?
—আমার মার পুষ্যি—তপতী সক্রোধে জবাব দিল। তপন কথাটা শুনিল তথাপি মুখ ফিরাইল না, চলিয়া গেল। তপতীর সর্বাঙ্গ ক্রোধে জ্বলিয়া উঠিতেছে। ফুলের তোড়াটা তুলিয়া লইয়া সে কাগজটা ছিঁড়িয়া ফিলিয়া সবেগে আসিয়া ঢুকিল খাইবার ঘরে, যেখানে তপনকে খাবার দিতেছেন। তোমার জামাই ফুল কিনে এনেছে দেখো, কতকগুলো খুচরো ফুল, বাসি পচা-একটা বোকে বাঁধিয়ে আনতে পারেনি।
মা তাকাইয়া দেখিলেন, সুন্দর ফুলগুলি তপতীর হাতের আছাড় খাইয়া মান হইয়া যাইতেছে। রাগিয়া বলিলেন, বোকে আনতে তো তুই বলিসনি খুকী, আর ফুল তো খুবই টাটকা।
–তোমার মাথা–এই ফুলনাকি বিলেত ফেরত লোককে দেওয়া যায়। বলিয়া তপতী সরোষে প্রস্থান করিল।
মা বিহ্বল দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলেন, তারপর বলিলেন—মেয়েটা বড্ড রাগী বাবা, তুমি দুঃখ করো না কিছু! ফুলগুলো তোমার ঘরেই দিয়ে আসছি।
জলতরঙ্গের মতো সুমিষ্ট হাসিতে ঘর ভরাইয়া দিয়া তপন বলিল—ঐ ফুলগুলো আপনার পায়ে দিই মা, আমার বয়ে আনা সার্থক হবে।
মা কি বলে শুনিবার জন্য তপতী বাহিরে অপেক্ষা করিতেছিল, তপনের কাণ্ড দেখিয়া সে শুধু বিস্মিত নয়, বিমূঢ় হইয়া গেল। এতবড় অপমানটা ও গায়েই মাখিল না। উহারই সামনে অন্য একজন পুরুষকে অন্যত্র বসাইয়া তপতী পরম যত্নে খাওয়াইতেছে, মা যার জন্য কত কিলেন। বিলাত ফেরত লোকের টেবিলে তপন বসিবে না বলিয়া তপতী রক্ষা পাইয়াছে। সেই অন্য পুরুষের জন্য নির্বিকার চিত্তে তপন ফুল আনিয়া দেয়, সে-ফুল না লইয়া অপমান করিলে সেই ফুল দিয়াই অপমানকারীর মার পূজা করে। এতবড় বিস্ময় তপতীর জীবনে আর ঘটে নাই। লোকটা হয় সাংঘাতিক ধূর্ত নয়তো সবসহিষ্ণু সন্ন্যাসী
ঠাকুরদার কথাটা তপতীর অকস্মাৎ মনে পড়িয়া গেল, তোর যে বর হবে দিদি তার আর জোড়া মিলবে না সত্যই, উহার জোড়া মিলিবে না। কিন্তু টাকা তাহা হইলে সে লইয়াছে কেন। দুই লক্ষ টাকা লইয়া সে কি করিবে? গরীবের ছেলে, দুলাখ টাকা কৌশলে আদায় করিয়া লইল। আরো কিছু আদায়ের ফন্দীতে আছে, তাই এমন করিয়া অপমান সহ্য করে। ইহার পর আমরা তাড়াইয়া দিলেও যাহাকে ও সুখে থাকিতে পারে তাহারই জোগাড়ে ফিরিতেছে।
তপতীর ক্ৰোধ কমিতে গিয়া পরবর্তী চিন্তায় অত্যন্ত বাড়িয়া উঠিল। কত অপমান সহ্য করিতে পারে তপতী তাহা দেখিয়া লইবে, শেষ অবধি প্রহারেণ ধনঞ্জন করিয়া ঐ বেহায় ইতর লোকটাকে তপতী তাড়াইয়া দিবে—স্থির করিল।
মিঃ বোসের সহিত চা খাইয়া তপতী বেড়াইতে চলিয়া গেল মিঃ বোসের মোটরেই তপন কোনদিনই তপতীর সহিত বেড়াইতে যায় না, বৈকালিক জলযোগের পর সে আবার বাড়ি তৈরীর কাজ দেখিতে যায় বা একাই বেড়াইতে যায়। তপতী নিত্যই তাহার বন্ধুদের সহিত টেনিস খেলে কিম্বা বেড়াইতে যায়। কিন্তু মিঃ বোসের সহিত আজ একা বেড়াইতে যাওয়াটা মা পছন্দ করিলেন না। মিঃ বোস বা তপনের সাক্ষাতে তিনি কিছু না বলিলেও ঠিক করিয়া রাখিলেন, ফিরিলে তপতীকে তিনি ভৎসনা করিবেন এবং যাহাতে আর না যায় তাহার ব্যবস্থা করিবেন।
মিঃ বোসের পাশে বসিয়া গাড়ীতে বায়ু সেবন করিতে করিতে তপতী ওদিকে ভাবিতেছে, ঐ লোকটাকে অপমান করিবার কতরকম ফন্দি বাহির করা যাইতে পারে।
মিঃ বোস বলিলেন,—কি ভাবছেন মিস্ চাটার্জি?
তপতী বলিল—হুঁ!
–হুঁ কি? এতো বেশী ভাবছেন যে কথাই শুনতে পাচ্ছেন না।
লজ্জিত হইয়া তপতী বলিল,–হাঁ ভাবছিলাম একটা কথা। চলুন, সিনেমা যাওয়া যাক!
তৎক্ষণাৎ গাড়ী আসিয়া একটা বড় রকম সিনেমা হাউসের গেটে ঢুকিল। উভয়ে নামিয়া টিকিট কিনিয়া ঢুকিল ভিতরে। অন্ধকার ঘরে বসিয়া ফন্দি আঁটিতে বেশ সুবিধা হইবে। তপতী নিঃশব্দে চেয়ারে বসিয়া আছে। মিঃ বোস কিন্তু সিনেমা দেখার চেয়ে তপতীর নয়নানন্দকর রূপ দেখার ও শ্রবনানন্দকর কথা শোনার বেশী পক্ষপাতী, কহিলেন, সিনেমা বিস্তর দেখে এলাম। ছায়া, কায়া, দুই-ই, ছায়া আর দেখতে ইচ্ছা করে না।
কায়াও তো বিস্তর দেখেছেন—সাদা, তুষার শুভ্র, তার প্রতি অরুচি জন্মালো না যে?
