তপতী আসিয়া চা খাইতে বসিল! মা সস্নেহে বলিলেন,রান্নাবান্না যে ছেড়ে দিলি যুকি, ভালোলাগে না?–মাতার ইঙ্গিত অত্যন্ত স্পষ্ট।
তপতী ক্রোধ দমন করিয়াকহিল,–নিরামিষ রাঁধার জন্যে আমার হাত কামড়াচ্ছে না।
মা একটু বিষণ্ণ হইলেন, বলিলেন—কি করবো বাছা, মাছ-মাংস খেতে ও ভালবাসে না–তবে একেবারে যে খায় না তা তো নয়। তুই বলিস না কেন খেতে?
–আমার দায় পড়েনি—যার যা খুশী খাবে আমার কি?
তপতী চলিয়া গেল। মা বুঝিলেন,ইহা জামাতার উপর কন্যার অভিমান। মধুর হাসিতে তাহার মুখ ভরিয়া গেল। ভাবিলেন তপনকে মাংস খাইবার জন্য তিনি নিজেই অনুরোধ করিবেন। তপন তাহার কথা নিশ্চয় রাখিবে।
তপতী আপন ঘরে গিয়া অনেকক্ষণ বসিয়া কত কি ভাবিল। বাবার কাছে টাকা আদায় রিবার বেশ চমৎকার ফন্দি আবিষ্কার করিয়াছে লোকটা তো বেশ, নিক সে, টাকা লইয়া যন সরিয়া পড়ে। তপতী উহার মুখ দেখে নাই—দেখিবে না।
তপতীর অন্তরে বিদ্রোহের বহ্নি জ্বলিয়া উঠিল! মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকার জন্য মিঃ ঘাষালের মতো সুপাত্রের সহিত তপতীর বিবাহ হয় নাই, আজ তাহারই স্থান অধিকার চরিয়া ঐ বর্বর লোকটা দুই লক্ষ টাকা আদায় করিয়া লইল! টাকার উপর তপতীর কছুমাত্র মায়ামমতা নাই। কিন্তু লোকটা ধুত্তামী তপতীর অসহ্য বোধ হইতেছে। সে নিঃসংশয়ে বাবা আর মাকে বুঝাইয়াছে যে তপতীর সহিত আমার প্রেম নিবিড় হইয়া ঠিয়াছে, অতএব লক্ষ টাকা সে এখন পাইতে পারে। তপতীর নির্বোধ স্নেহময় বাবা-মা দুশ্চিন্ত মনে উহার পোস-খেয়াল মিটাইবার জন্য নগদ দুই লক্ষ টাকা উহার হাতে তুলিয়া দিলেন। আচ্ছা, তপতীও দেখিয়া লইবে সে কতবড় ধূৰ্ত্ত।
কিন্তু লোকটা মোটেই মুখ নয়। লেখাপড়া ভালো না জানিলেও সে নিশ্চয় বুদ্ধিমান। অভিনয় করিয়া কতগুলি পাকাপাকা কথা শিখিয়া রাখিয়াছে, যথাস্থানে যথোপযুক্ত ক্ষেত্রে তাহা সে প্রয়োগ করে। মা নিতান্তই মা, তাই উহার মা ডাক শুনিয়া গলিয়া গিয়াছে। মা আবার বলে, বুদ্ধদেবের মতো সুন্দর সুন্দর নয় বলিয়াই হয়ত বাড়াবাড়ি করিয়া বলে ঐ সব। যাক—সুন্দর হোক আর কুৎসিত হোক, তপতীর আসে যায় না!
তপতী গিয়া গম্ভীরমুখে খাইতে বসিল।
শিখা কারুণ্য-কোমলকণ্ঠে ঘরে ঢুকিল—জানো মা, অমন দাদা কারোর হয় না মা! দাদা আশ্চৰ্য্য, দাদা অদ্ভুত। মানুষকে অমন করে ভালোবাসতে আর কাউকে দেখিনি! কিন্তু মা আমায় এখুনি হাসপাতালে যেতে হবে।
-কেন? কার অসুখ?-মা উদ্বিগ্নকণ্ঠে প্রশ্ন করিলেন।
অসুখ একটা কেরাণীর, তার গায়ে রক্ত নাই, দাদা তাই তাকে নিজের রক্ত দিয়ে বাঁচাবে। কারুর কথা শুনলো না মা, আমরা এতত বারণ করলাম,বললাম, অন্য একটা লোককে তো কিছুটাকা দিলেই সে রক্ত দিতে পারে। তা বলে, তার রক্তটাও তার বোনদের কাছে এমনি দামী বুঝেছিস কি বলবো আর!
মা শুনিয়া শিহরিয়া উঠিলেন। তপন কোন একটা অজ্ঞাত কেরাণীর জন্য নিজের দেহের রক্ত দান করবে। ব্যগ্রভাবে বলিলেন,নানা শিখা, ওকে বারণ কর তোরা।
ও শুনবেনা মা, কারুর কথা শুনবে না। আর যুক্তি দিয়ে ওকে হারাতে পারবেনা কেউ। ওর বন্ধু বিনুবাবু সকাল থেকে সে চেষ্টা করছেন। আমায় খানিকটা দুধ আর কিছু লেবুর রস করে দাও শিগগীর।
নিরুপায় মাতা লেবুর রস তৈরী করিতে করিতে বলিলেন,—ওর শ্বশুরবাড়ির কেউ জানে না?
ওঁদের জানাবে না—তুমি জানিয়ে দিও না যেন। বেলা এগারোটার সময় শিখা ও বিনায়ক তপনকে লইয়া ফিরিল। শিখা তাহার নিজের শয়নকক্ষে তপনকে শোয়াইয়া দিল; বিনায়ক তপতীর মাকে ফোনকরিয়া জানাইয়া দিল, তপনবাবু আজ দুপুরে অন্যত্র খাইবেন—তাহার যেন অপেক্ষা না করেন।
শিক্ষার মা আসিয়া অনুযোগ করিলেন—একি বাবা, নিজের রক্ত কেন তুমি দিতে গেলে?
—দিলাম তো কি হলো মা, আমি তো আপনার সুস্থ সবল ছেলে।
কিন্তু বাবা, তোমার জীবন আমাদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।
—সে লোকটির জীবন কিছু কম মূল্যবান নয় মা, তারও মা, ভাই বোন, স্ত্রী, সব ছোট ছোট ছেলেমেয়ে, সেই একমাত্র উপার্জনকারী তাদের।
মা চুপ করিয়াই রহিলেন! তপন আর একটু দুধ খাইয়া বলিল,–কিছু ভয় নেই বোনটি, ওবেলাই সেরে উঠবো; ঘুমুই একটু। শিখা বসিয়া বসিয়া হাওয়া করিতেছে। চোখ দুটি জলে ছলছল করিতেছে, তাহার মুখের দিকে চাহিয়াতপন বলিল,—কি হোলরে? কাঁদছিস?
–ভালো লাগছে না দাদা, তুমি রক্ত দিয়ে বেড়াবে নাকি?
–একা আমার রক্তে কি হবে শিখা, তবে এই আত্মসুখ সর্বকীব, পশুর জাতটাকে রক্ত দিয়ে বাঁচাতে হবে নইলে আৰ্য্যগৌরব বুঝিবা ড়ুবলো।
তপন পাশ ফিরিয়া শুইল। বিনায়ক ইসারায় শিখাকে নিষেধ করিল আর কথা না। বলিতে।
স্নেহের যে সামান্য সূত্রটুকু ধরিয়া তপনের অন্তরে তপতী প্রবেশ করিতে পারিত, তপতীর মনস্তত্ব-বিশ্লেষক মনের উষ্ণ চিন্তাধারায় তাহা পুড়িয়া গেল। তপনকে সে একটা অর্থশোষণকারী পরভৃতিক ছাড়া আর কিছু ভাবিতে পারিতেছে না। এক একবার মনে হইতেছে, হয়ত উহার মধ্যে এমন কোন গুণ আছে যাহাতে তার মা-বাবা এতটা মুগ্ধ হইতেছেন, আবার মনে হইতেছে, ইহা ঐ সুচতুর লোকটির সু-অভিনয়ের গুণ। তপতী উহাকে কঠোর পরীক্ষা করিতে মনস্থ করিল।
সেদিন টকটকে লাল শাড়ীখানা পড়িয়া তপতী বাহির হইয়া আসিল, যেন অগ্নিশিখা। মা তাহার দিকে চাহিয়া হাসিয়া বলিলেন,—বেড়াতে যাবি নাকি!
–না, মিঃ অভিনব বোস ব্যারিস্টার হয়ে এসেছেন তাকে নিমন্ত্রণ করেছি চায়ে। কিন্তু মা, ফুল আনা হয়নি। দাও না ফোন করে তোমার জামাইকে, ফুল কিনে আনবে।
