-ওরে বাপ-বৌদ্ধ বিহারের কি বোঝেন আপনি। সেখানে যান কেন?—বিদ্রূপটা স্পষ্ট।
তপন এক মিনিট স্তব্ধ হইয়া রহিল, তারপর শান্ত স্বরেই জবাব দিল— মেয়েদের কাছে এক কণা প্রসাদ ভিক্ষা করার চাইতে সেটা ভালো, কিছু না বুঝলেও ভালো।
তপন চলিয়া গেল। একটি মেয়ে তপনের কথাটা শুনিয়াছিল, বলিল,—ঠিক বলেছেন উনি, আপনারা তো মেয়েদের প্রসাদ ভিক্ষাই করেন।
মিঃ ব্যানার্জি কহিলেন,করি, ভিক্ষা পাবার যোগ্যতা আছে বলে।ওকে কে ভিক্ষা দেবে শুনি?
মেয়েটি বলিল,–ভিক্ষা উনি করেন না, কোন দিন আসেননি এখানে।
—আসেননি কেন? আসার কোন্ মোগ্যতাটা আছে? বৌদ্ধ বিহারে যাওয়ার কথাটা একটা চাল। ভাবলল, ঐ শুনে আমরা ওকে বৌদ্ধধর্ম সম্বন্ধে অভিজ্ঞ ভেবে নেব। ওসব আমরা ঢের বুঝি।
মিঃ অধিকারী কহিলেন,—হাঁ হাঁ, করবে কি আর, এখানে তো এসে মিশতে পারে না, তাই ঐ সব ভণ্ডামী দেখাইয়া পণ্ডিতি জাহির করিতে চায়।
তপতী উঠিল; ভালোলাগিতেছেনা তাহার। কি যেন কোথায় কাঁটার মতো বিধিতেছে, তপন কি সত্যিই কোন নারীর কাছে প্রসাদ ভিক্ষা করে না?সত্যিই কি বৌদ্ধ বিহারে যায় সে?
শিখার কথাটা মনে পড়িয়া গেল—আৰ্য্যনারী হয়ে তুই স্বামীকে গ্রহণ করিলি না-তপতী উঠিয়া উপরে আসিল!
তপন তখনো খাইতে আসে নাই! রাত্রি মাত্র দশটা বাজিতেছে। অন্যদিন সে সাথে দশটার পূর্বে ফিরে না। তপতী চাহিয়া দেখিল, মা খাবার ঘরে টেবিলের উপর রাখিয় কি একটা সেলাই করিতেছে। ঘরে না ঢুকিয়া তপতী বাহিরের একটা সোফায় শুইয় অপেক্ষা করিতে লাগিল, কোটপ্যান্ট ছাড়িয়া ধুতি ফতুয়া পরিহিত তপন খড়ম পায়ে দিয় আসিয়া ঢুকিল খাবার ঘরে, হাতে শ্বেতপদ্ম। তপতী চাহিয়া দেখিল, মুখ তাহার পূর্বব ফিরানো রহিয়াছে। মুখ না দেখিয়া তপতী পায়ের দিকে চাহিল। সুন্দর সুগঠিত পা দুখানি খড়মের কালোর ঊপর কাঞ্চনবর্ণ বিকীর্ণ হইতেছে। রংটা এত সুন্দর নাকি!
–এসো বাবা, হাতে ও ফুলটি কিসের?—মা সাদর আহ্বান জানাইলেন। তপতী কা পাতিয়া রহিল তপনের উত্তর শুনিবার জন্য।
তপন বলিল, আজ বুদ্ধদেবের জন্মতিথি মা, গিয়েছিলাম দেখতে, ফুলটি নির্মাল সেখানকার।
মা হাসিয়া বলিলেন,–তোমাকে দেখলেই আমার বুদ্ধদেবের মুখ মনে পড়ে বাবা তুমিই আমার বুদ্ধদেব।
তপন ত্বরিতকণ্ঠে বলিল,–না মা, ও কথা বলবেন না। তিনি মানব-দেবতা আমি তা দাসানুদাস হবার যোগ্য নই!
মা চকিত হইয়া বলিলেন,–বুদ্ধদেবকে তুমি তো খুব বেশী শ্রদ্ধা করো তপন!
করা কি উচিত নয় মা? শ্রদ্ধেয়কে শ্রদ্ধা করার মধ্যে তো আমরা নিজেদেরকে শ্রদ্ধাভাজন করে তুলি-শ্রদ্ধা-না করলে বুদ্ধদেবের কিছু ক্ষতি হবে না মা, আমাদের মনুষ্যত্বের অপমান হবে।
মাতা মুগ্ধ হইয়া গেলেন, তপতী বিস্মিত বিহ্বল হইয়া গেল। এই লোকটা ইডিয়ট!ইহা অপেক্ষা মানবতায় অধিকতর গৌরব-বহনকারী মানুষ তপতী তাহার জীবনে দেখে নাই চঞ্চল পদে সে ঘরে আসিয়া ড়ুকিল।
–আয়, খেয়ে নে খুকী—মা ডাকিলেন।
তপনের আনিত পদ্মটা লইয়া খোঁপায় খুঁজিতে খুঁজিতে তপতী কহিল–আমি এখনে কাপড় ছাড়িনি মা।
-যা, ছেড়ে আয় চট করে।
তপতী তথাপি দাঁড়াইয়া রহিল। তাহার আজ ইচ্ছা করিতেছে, তাহার সন্ধ্যাকে পরিহিত সুচারু তনিমার দিকে তপন একবার চাহিয়া দেখুক। তপন কিন্তু মুখ তুলিল না পাঁচ-সাত মিনিট অপেক্ষার পর নিরাশ হইয়া তপতী চলিয়া গেল।
গভীর রাত্রে একাকী শুইয়া তপতী ভাবিতেছে, ঐ তো ওপাশের ঘরটায় সে ঘুমাইতেছে ঐ নিরহঙ্কার মানুষটি, কম খায়, কম কথা বলে, নিজেকে জাহির করে অত্যন্ত কম। খুজিয় ফিরিলেও উহার সাড়া প্রায় পাওয়া যায় না! যাকিছু কথা উহার মার সঙ্গে। তপতী তো এতদিন উহার খবর লয় নাই, বরং নির্মম ভাবে উহাকে নির্যাতিত করিয়াছে। তার প্রাপ্য সম্মান হইতে উহাকে সে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করিয়াছে তথাপি সে রহিয়া গেল তপতীকে। নির্বিকারে। ভাবিতে ভাবিতে তপতী কখন ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল, ঘুম ভাঙিতে সর্পের মতেবেলাহইয়া গিয়াছে; উঠিতে গিয়াশরীরটা অত্যন্ত অসুস্থ বোধহইল, কিন্তু শরীরের গ্লানিকে মনের জোরে ঝাড়িয়া ফেলিয়া সে স্নানের ঘরে ঢুকিল। পরিপাটি করিয়া স্নান সারিয়া ফিকে নীল শাড়ী পরিয়া সে বাইরে আসিয়া দাঁড়াইল এক পিঠ খোলা চুল মেলিয়া, আশা জাগিতেছিল অন্তরে, তপনের সহিত যদি একবার দেখা হইয়া যায়। তপনের রুদ্ধদ্বার কক্ষের পানে চাহিয়া দেখিল সে বাহির হইয়া গিয়াছে। ধীরে ধীরে খাবার ঘরের দরজায় আসিয়া শুনিল, মা বলিতেছে দুলাখ টাকা! অত টাকা করবে কি ও?
কি জানি! যা খুশী করুকগে! টাকার তো আমার অভাব নাই নীলা! বাবা উঠিয়া যাইতেছিলেন, মাবলিলেন, ভালোই হয়েছে, ছেলেটার যা নিস্পৃহ মন?টাকাকড়ি নিলে বাঁচি। পিতা হাসিয়া বলিলেন,–নেবে, নেবে, ভাবছো কেন! শিলং-এ তাহলে পাঠাচ্ছ না।
–থাক। ছেলে মানুষ দুজনেই! কোথায় একলা পাঠাবো বাপু, তার চেয়ে আমার চোখের উপর দুটিতে থাক; পূজার সময় সবাই যাব শিলং।
কথাটা তপনের সম্বন্ধে। মুহূর্তে তপতীর অন্তর স্তব্ধ হইয়া গেল। দুই লক্ষ টাকা সে বাবার কাছ হইতে লইয়াছে। এত টাকা দিয়া কি করিবে সে! তবে কি টাকার জন্য সেতপতীর অত্যাচার নীরবে সহিয়া যায়। লোকটা তো আচ্ছা ধড়িবাজ। এজন্যই বুঝি তপতীর ব্যবহারের কথা বাবা মাকে একদিনও বলে নাই। দিব্যি অভিনয় করিয়া চলিয়াছে তো!—আচ্ছা, দেখা যাইবে।
