শিখা আসিয়া একটা চড় কুটিতে বসিতেই তপন গম্ভীর মুখে বলিল,–ভাল হচ্ছে না ভাই শিখা, ওর কাজ কেন তুই করবি? তোর সঙ্গে ওর সম্পর্ক–?
–মিতা বলিয়া শিখা হাসিয়া উঠিল।
–ওঃ, তা হলে কিন্তু তপন হাসিমুখেই থামিয়া গেল!
–কিন্তু কি দাদা?-শিখার চোখে প্রশ্নের আকুতি!
কাঁঠালের আঠায় কুলবে না। ফুলের ফিতে দিয়ে বাঁধনটা পোক্ত করে দিতে হবে।
–মাও তুমি বড্ড ইয়ে–।
শিখা মুখ ফিরাইয়া তরকারী কুটিতে বসিল। তাহার লজ্জার মুখের পানে তাকাইয়া বিনায়ক বসিয়া ভাবিতে লাগিল, তপনের ইচ্ছা শিখার অন্তরে সঞ্চারিত হইয়াছে। শিখা বিনায়ককে গ্রহণ করিয়াছে কিন্তু শিখাকে পাইবার যোগ্যতা কি বিনায়কের আছে! তপনের ইচ্ছায় চিরদিনই আত্মসমর্পণ করিয়াছে, বিনায়ক আজও কিছুই বলিল না।
০৫. সেদিন বৌদ্ধ-পূর্ণিমা
একটা দুঃস্বপ্ন দেখিয়া তপন জাগিয়া উঠিল! দক্ষিণ দিকের চওড়া বারান্দাসংলগ্ন পূর্বদিকের ঘরটায় তপন আর ঐ বারান্দারই পশ্চিমদিকের ঘরটায় থাকে তপতী। মাঝখানে বারান্দাটা যেন একটা দুরন্তনদী—কোন দিন পার হওয়া যাইবে না। প্রভাতের সূর্য আসিয়া তপনের কক্ষে সূর্য-কিরণ ছড়াইয়া দেয়—অস্তগামী সূর্য তপতীর ঘরের পশ্চিমের জানালাপথে উঁকি মারিয়া যায়। ইহারও মধ্যে হয়ত বিধাতার কোন সূক্ষ্ম ইঙ্গিত নিহিত রহিয়াছে।
মা বেশ শান্ত এবং নিশ্চিন্ত হইয়া গিয়াছেন। উহাদের এই কয়দিনের সংবাদ তিনি বেশী রাখেন না। বেশ বুঝিয়াছেন, বারান্দা পার হইয়া উহাদের মিলনগুঞ্জন ভালরূপেই চলিতেছে—ভাবিবার কিছু আবশ্যক নাই।
তপন বলিল,–কি ভাবছেন মা?
—কিছু না বাবা, খাও! তোমার মতো ছেলে পেয়েছি, ভাবার কি আছে?
তপনের অন্তর মুচড়াইয়া উঠিল। এই পরম স্নেহময়ী জননীকে সে প্রতারিত করিতেছে সজ্ঞানে। একবার তার ইচ্ছা হইল মাকে সব কথা বলিয়া জানায় যে তাহারা ভুল করিয়াছে। ডিগ্রীহীন আৰ্য্যধৰ্ম্মভক্ত তপনকে তাহার কন্যা গ্রহণ করিবেনা।কিন্তু তাহাতে ফল কি হইবে। অনর্থক একটা উৎপাত, তপতীর উপর শাসন এবং আরো কিছু কেলেঙ্কারী।না, থাক, তপন কৌশলে জানিয়া লইবে তপতী কাহাকে চায়, তাহারই হাতে তপতীকে ফিরাইয়া দিবার ব্যবস্থা করিয়া সে নীরবে চলিয়া যাইবে। এই যে এখানে ইহাদের প্রচুর স্নেহমমতা সে পাইতেছে, ইহারও ঋণ তপন শেষ করিয়া যাইতে চায়—তাহা সময়সাপেক্ষ। তাহারও একটা উপায় তপন ভাবিয়া রাখিয়াছে।
অম্লতা তপতী বাসি কাপড়েই আসিয়া ঘরের চৌকাট হইতে বলিল,–মা আমার লেকক্লাবে সুইমিং কমপিটিশন্ আছে। এখুনি যেতে হবে। নিজে গাড়ী চালিয়ে গেলে হাতের পরিশ্রম হবে মা, ড্রাইভারটা আসেনি—কি করি বলোতো?
মা হাসিমুখে বলিলেন-তপন যাক না গাড়ী চালিয়ে যাওতো বাবা। —আয় খুকী, খেয়ে নে।
-আচ্ছা মা, যাচ্ছি-বলিয়া তপন উঠিয়া চলিয়া গেল।
কিছুক্ষণ পরে তপতী আসিয়া গাড়ীর ভিতরের সীটে আসন গ্রহণ করিল। তপনের পাশে বসিল না। তপন নিরুদ্বেগে নির্বিকার চিত্তে গাড়ী চালাইয়া দিল। ক্লাবের জুনিয়র ও সিনিয়ার মেম্বারগণ একযোগে আসিয়া দাঁড়াইল গাড়ীর কাছে তপতীকে অভ্যর্থনা করিতে। সুন্দরী, সুবেশা, তরুণী তপতী! তাহাকে দেখিবার আকাঙক্ষা কার না হয়।
—আসুন, আসুন, আপনার জন্যই অপেক্ষা, সময় হয়ে গেছে।–
তপতী নামিয়া গেল। গাড়ীটা ঘুরাইয়া ষ্ট্যান্ডে লইয়া রাখিতে হইবে, তপন ঘুরাইতেছে, একজন ডাকিয়া কহিল, সুইমিং কষ্টিউমটা দিয়ে যাও তো হে।
তপতীউহা লইতে ভুলিয়া গিয়াছে, না ইচ্ছা করিয়াই ফেলিয়া গিয়াছে কে জানে!তপন, নির্বিকার চিত্তে নামিয়া কষ্টিউমটা ভদ্রলোকের হাতে দিয়া আসিল।
প্রায় দুই ঘণ্টা তপন গাড়ীতে বসিয়া আছে। অকস্মাৎ দেখিল, অসংখ্য নারীপুরুষ তপতীকে ঘিরিয়া ক্লাবঘরের বারান্দায় আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। তপতীর জলসিক্ত সুদীর্ঘ বেণী সর্পের মতো দুলিতেছে। ভিজা কষ্টিউমটার উপরেই সে তাহার পাতলা শাড়িটা জড়াইতেছে, হাতে একটা রূপার কাপ, প্রাইজ পাইয়াছে বোধ হয়। তপন কোন দিন তপতীকে ভালোকরিয়া দেখে নাই, আজও তাহাকে দেখিবার ইচ্ছা তাহার হইল না। মুখ নামাইয়া সে গাড়ীটা চালাইয়া দিল!
তপতী ভিতরে বসিয়া ভাবিতেছে, ঐ নির্বোধটা দেখুক, তপতীর সম্মান প্রতিপত্তি। তপতীকে লাভ করিবার যোগ্যতা যে উহার কিছু মাত্র.নাই ইহা যেন সে অচিরে বুঝিতে পারে। কিন্তু তপন ফিরিয়া তাকাইল না। তপতী ভাবিল, এসব বাপারে মর্যাদা ঐ গ্রাম্য বর্বর কি বুঝিবে। তিলক কাটিতে যাহার দিন ফুরাইয়া যায় তাহাকে কান ধরিয়া বুঝাইয়া দিতে হইবে, তপতীর মূল্য কতখানি।
বাড়ি ফিরিয়া তপতী তাহার বিজয়ের নিদর্শন কাপটা অন্যান্য প্রাপ্ত পুরস্কারগুলির সহিত সাজাইয়া রাখিল।
সারাদিন তপতীর মনটা আত্মপ্রসাদের আনন্দে ভরপুর রহিয়াছে। সাঁতারে সে আজ প্রথম পুরস্কার লাভ করিয়াছে। কত উচ্ছ্বসিত প্রশংসা, কত উত্তেজক কথা তাহার স্নায়ুকেন্দ্রগুলিকে দুর্দান্তআবেগে যেন ঝঙ্কত করিতেছিল! সন্ধ্যা হইতে বন্ধুদের লইয়া সে গানের মজলিশ বসাইয়াছে।
অন্যদিন তপন রাত্রি সাড়ে দশটার পূর্বে ফিরে না, আজ কিন্তু নয়টার সময় ফিরিয়া আসিল। তপতীদের সঙ্গীত-চর্চার ঘরটার পাশ দিয়াই দোতলায় উঠবার সিঁড়ি। তপন নিঃশব্দে উঠিয়া যাইতেছিল, ঘরের কয়েকজন তাহাকে দেখিতে পাইয়া বলিল,–এই যে মিস্টার গোঁসাই, কোথায় গিয়েছিলেন?
তপন সিঁড়ির প্রথম ধাপে দাঁড়াইয়া রহিল। প্রশ্নটা তাহাকেই করা হইতেছে বুঝিয়া শান্তস্বরে বলিল—বৌদ্ধ বিহারে গিয়েছিলাম।
