তপন সহাস্যে কহিল,—আচ্ছা মা আমার দ্বারা আপনার খুকীর কিছু মন্দ হবে বলে কেন আপনি মনে করছেন?
শুনিতে শুনিতে তপতী বিরক্ত হইয়া উঠিল। উনি তপতীর ভালো করিয়া দিবেন। কী আশুধা। মা বলিলেন,–তোমাদের দুটিকে সুখী দেখবার জন্যই বেঁচে আছি বাবা।
মার কণ্ঠে কল্যাণাশীষ ঝরিয়া পড়িতেছে। এই অপার্থিব মাতৃমূর্তির সম্মুখে বসিয়া প্রতারণার কথা বলিতে তপনের বিবেক পীড়িত হইতেছে! সে চুপ করিয়া খাইতে লাগিল। তপতী পুনরায় ঘরে ঢুকিয়া বলিল,আমায় আর এক কাপ চা দাও মা, কড়া করে!
মা অত্যন্ত খুশি হইয়া উঠিলেন! নিশ্চয়ই উহারা কাল মিলিত হইয়াছিল, রাত জাগার জন্য খুকীর কড়া চা খাইতে ইচ্ছা হইতেছে। বলিলেন—আর একটু ঘুমোগে, শরীরটা ঝরঝরে হয়ে যাবে।
তপনের খাওয়া হইয়া গিয়াছে। সে ধীরে ধীরে চলিয়া গেল, অনুভব করিল, খুকীর অভিনয় চমৎকার জমিতেছে। মা একেবারে মুগ্ধ হইয়া গিয়াছেন। মাতৃত্বের এই ব্যাকুল আবেদন তপনের মনকে আর্ত করিয়া তুলিতেছে। কিন্তু কিছুই সে করিতে পারে না। মার কন্যাই যখন অভিনয় করিতেছে, তখন সে আর কি করিবে?
বিষাদক্ষিন্ন তপন বাহিরে চলিয়া গেল। তপতীও কড়া চা খাইয়া আপন কক্ষে আসিল, হাসিল খানিক আপন মনে এবং কবিতার খাতাটা টানিয়া লইয়া বঞ্চিতের বেদনা লিখিতে বসিল।
শিখা কয়েকটি মেয়েকে কারখানার প্রাঙ্গণে নিয়া জড় করিয়াছে। উহাদের নিকট তাহার কি একটা প্রস্তাব আছে। বিনায়ক একধারে চুপচাপ দাঁড়াইয়াছিল, তপন এখনো আসিয়া পৌঁছে নাই। শিখা কহিল,–আচ্ছা মিতা, দাদার যদি দেরি থাকে তো আমরা আরম্ভ করি।
–বেশ তো; করুন আরম্ভ। বিনায়ক মৃদু হাসিয়া উত্তর দিল। শিখা আরম্ভ করিল,–ভগ্নিগণ আমাদেব অভাব এত বেশী, যে মেটাবার চেষ্টা করতেও ভয় হয়। কিন্তু ভয় করলে চলবে না। অভাব আমাদের যত অভাব বোধ তার চেয়ে তীব্র হয়ে উঠেছে। অতএব এই ঠিক সুযোগ, যখন আমরা অভাবের প্রতিকার করতে কায়মনে লাগতে পারবো!
আমার প্রস্তাব এই যে, আপনারা দিনকয়েক এই কারখানায় খেলনাগুলো রং করতে শিখুন, ছোট ছোট পার্টসগুলোকে জোড়া দিতে শিখুন যাঁর হাত নিপুণ তিনি আরো কিছু বেশী শিখুন। তারপর সাজসরঞ্জাম নিয়ে আপনারা যাবেন অভাবগ্রস্তদের অন্তঃপুরে। সেখানে মেয়েদের এই কাজ শিখিয়ে দেবেন, তাদের কাঁচামাল সরবরাহ করবেন, তৈরী করাবেন এই সব খেলনা। তৈরী মাল বিক্রী করবার ভার আমাদের। মজুরী তাঁরাও পাবেন, আপনারাও পাবেন। অবসর সময়ে একাজ করে বেশ দুপয়সা রোজগার করা যাবে বাড়িতে বসে।
খেলনার সঙ্গে আমরা কার্ডবোর্ড বাক্স তৈরী শেখাবো আর শেখাবো আয়ুর্বেদীয় নানা রকম ঔষধ আর টয়লেট তৈরী করতে, যার গুণ আপনাদের বিলিতি ঔষধ, এসঙ্গে সাবানস্নাে-পাউডার থেকে অনেক বেশী। অথচ দাম হবে বিলাতীর অর্ধেক। এসব কাজের জন্য যা কিছু দরকার সবই এখান থেকে দেওয়া হবে। আপনারা শুধু কাজ করবেন। ছয়মাস করে দেখুন, না-পোষায় ছেড়ে দেবেন।
শুধু সৌখীন শিল্প, ঘর সাজাবার উপকরণ দিয়ে দেশের কিছু হবেনা। ওগুলোর দরকার আছে তরকারী হিসাবে, কিন্তু ডালভাতের দরকার আগে। অবশ্য প্রয়োজনীয় জিনিস উৎপাদন না করলে কিছুতেই সুসার হয় না।
এ কাজ যদি আমাদের সফল হয়; তাহলে পরের কাজ হবে আমাদের আরো বড়–আরো ব্যাপক! সে কাজ দেশের মানুষ তৈরী করার কাজ। আমরা প্রত্যেকে শুধু দুটিচারটি করে মানুষ গড়ে যাবো যারা নেতার আহ্বানে সাড়া দেবে, অকম্পিত হৃদয়ে মৃত্যুবরণ করবে শ্রেঃ লাভের জন্য। আমি আপনাদের নেত্রীত্ব চাইনে, আমিও আপনাদের মতন একজন কর্মী থাকতে চাই এবং সমান কাজ করতে চাই।
তপন আসিয়া পৌঁছিল এবং হাসিমুখে আসিয়া অভিবাদন করিল। শিখা বলিয়া চলিল–এই আমার দাদা, অন্তরাল থেকে উনি এবং ওঁর বন্ধু বিনায়কবাবু আমাদের সাহায্য করবেন—দেখবেন, ক্ষতি যাতে আমাদের না হয়। ওঁরা দুজনে এই কারবারটা গড়ে তুলেছেন; অতএব মাড়োয়ারীজনোচিত অভিজ্ঞতা যে ওঁদের আছে তা আমরা বিশ্বাস করিতে পারি। আর ওঁরা বলেছেন, ক্ষতি যদি হয় ওঁদের হবে, লাভ যদি হয় তো আমাদের; আর ক্ষতিই বা হবে কেন? আসুন, আজ থেকেই কাজ আরম্ভ করবে।
মেয়েগুলি সত্যই অভাবগ্রস্ত পরিবারের। কাজের প্ল্যান শুনিয়া ও সমস্ত দেখিয়া তাহাদের প্রত্যয় জন্মিল! অবসর সময়ে এ কাজ করিয়া কিছু উপার্জন করিতে পারে—তাহারা লাগিয়া গেল।
তপন শিখাকে ডাকিয়া বলিল,–বিয়ে-থা করতে হবে না বুড়ি? এই সব করবি নাকি তুই?
–বিয়ের হয়তো দরকার আছে দাদা, দিও যখন ইচ্ছে কিন্তু এ সবেরও দরকার আছে। তোমার বোন তোমার মর্যাদা রাখতে চায়।
হাসি মুখে তপন বলিল,—বেশ কথা, তবে বিয়েটাও দেব, আব এই মাসেই।
—কেন? বুড়িয়ে গেলুম নাকি দাদা?
–সেটা দেখবার ভার আমাদের উপর–তুই এখনও যা করছিস্ কর!
তপন অফিস ঘরে চলিয়া যাইবার কিছুক্ষণ পর বিনায়ক বিপন্ন মুখে কহিল,–শুনছেন মিতা আপনার দাদা বড় জ্বালাতন করছে।
আমার দাদা কাউকে জ্বালায় না—শিখা জবাব দিল।
বিনায়ক মাথা চুলকাইয়া বলিল,—কিন্তু আমায় করছে জ্বালাতন।
–কেন?
—আমি আর সব কাজ করতে পারি, লাউ-কুমড়ো কুটতে পারিনি। শিখা কলহাস্যে ঝঙ্কারিয়া উঠিল,—দাদা পারে কিন্তু…।
–আমি পারিনে যে—বিনায়কের মুখে অসহায়তার ছবি ফুটিয়া উঠিল।
শিখাব নারী হৃদয় স্নেহে উদ্বেল হইয়া উঠিতেছে। বলিল,—তা আমায় বুঝি আপনার কাজটা করে দিতে হবে? চলুন, যাচ্ছি।
