কিছু ভয় নেই মা, মেয়ে আপনার যথেষ্ট বুদ্ধিমতী। ওরা তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আর ক্ষতি যদি হয়ে থাকে, তাহলে অনেক আগেই তা হয়েছে।
–সে কি কথা বাবা! মাতা শিহরিয়া উঠিলেন।
–না মা বিচলিত হবেন না। আপনার মেয়েকে বুঝতে সময় লাগে। তবে যতদুর মনে হয়, সে আত্মরক্ষায় সক্ষম। আমার ঘুম পাচ্ছে মা, শুইগে।
মা আর কিছুই বলিলেন না, বলিতে তঁাহার বাধিতেছিল। আপন কন্যার সম্বন্ধে আপনারই জামাই-এর সহিত কতক্ষণই বা আলোচনা করা যায় এইরকম একটি বিষয় লইয়া! তপন চলিয়া গেলে তিনি তপতীর কক্ষে আসিয়া দেখিলেন, তপতী অনেকক্ষণ ঘুমাইয়া গিয়াছে। একটা নিঃশ্বাস ফেলিয়া তিনি শয়নকক্ষে ফিরিয়া গেলেন।
কিন্তু ফিরিয়া গিয়াও নিশ্চিন্ত হইতে পারিলেন না। আধুনিক আলোকপ্রাপ্তা শিক্ষিত মেয়েকে তিনি অধিক আর কি বলিতে পারেন। যতদুর বলিয়াছে, তাহাই যথেষ্ট।এ সমাজে এতখানিও কেহ বলে না। কিন্তু তাহার আশ্চর্য বোধ হইতেছে যে, খুকী জানে তপন ওঘরে আজ যাইবে, অথচ খুকী নিশ্চিন্তে ঘুমাইয়া পড়িল! তপনের জন্য এতটুকু উদ্বেগ, একটুখানি উকণ্ঠাও কি তাহার মনে জাগে না? সমস্ত ব্যাপারটা মিসেস চ্যাটার্জির অত্যন্ত দুয়ে বোধ হইতেছে।
তপনই বা কেন ওভাবে জবাব দিল? তপন যাহা বলিল, হয়ত সেই কথাই সত্য; জোর করিলে খুকীর জেদ বাড়িয়া যাইবে, কিন্তু জোর করিতে হয় কিসের জন্য! আজ দুই আড়াই মাস তিনি তপনকে দেখিতেছেন, তাহার মতো চোখ জুড়ানো ছেলে তিনি কমই দেখিয়াছেন। খুকী যদি তাহাকে অভদ্র বা ইডিয়ট মনে করিয়া থাকে তবে অত্যন্ত ভুল করিয়াছে-খুকীর এ ভুল ভাঙ্গিয়া দিতে হইবে। মিসেস চ্যাটার্জি কন্যার ভবিষ্যৎ ভাবিয়া ব্যাকুল হইয়া উঠিতে লাগিলেন ক্রমশ।
ওদিকে পদশব্দটা ফিরিয়া যাইবা মাত্র তপতী চোখ মেলিয়া চাহিল, দেখিল, তপন নহে, মা; তপন আসিতেছে ভাবিয়াই সে ঘুমের ভান করিয়াছিল, কিন্তু তৎপরিবর্তে মাকে আসিয়া ফিরিয়া যাইতে দেখিয়া একটু নিশ্চিন্ত হইল। হয়ত তপন আসিবে না, কিম্বা পরে আসিবে! রাত্রি তো এগারটা বাজিয়া গেল।
তপতী দরজা খোলা রাখিয়া অনেকক্ষণ জাগিয়া রহিল। তপন তাহা হইলে আজ আসিবে না। তপতী যেন বাঁচিয়া গেল। তপন আসলে তাহাকে একটা নির্মম আঘাত করিবার জন্য তপতী প্রস্তুত হইতেছিল,—আসিল না, ভালোই হইল। কিন্তু সত্যিই কি আসিবে না।
তপতী পা-টিপিয়া-টিপিয়া এদিকের বারান্দা পার হইয়া তপনের রুদ্ধদ্বার শয়ন কক্ষের কাছে আসিয়া দাঁড়াইল। ভিতর হইতে নিদ্রিত ব্যক্তির ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ আসিতেছে। তপন তাহা হইলে ঘুমাইয়া গিয়াছে। কিন্তু কেন? তপতী মার কথায় সম্মতি দেয় নাই, কিন্তু প্রতিবাদও করেনাই। যাক, না আসিয়া ভালোই করিয়াছে। তপন তাহাহইলে বুঝিয়াছেতপতী তাহাকে চায় না। তপতী নিশ্চিন্ত হইতে গিয়া ঠিক বুঝিল না, আধুনিক যুগের বিকৃত শিক্ষা তাহার নৈরাশ্যকে নিশ্চিন্ততার রূপে দেখাইতেছে কিনা। তপতী ফিরিয়া আসিয়া শয়ন করিল। ঘুম তাহার ভালই হইবার কথা, কিন্তু অনেক-অনেকক্ষণ তপতী জাগিয়া রহিল সেদিন…
পরদিন সকালে তপতীর ক্লান্ত-বিষণ্ণ মুখশ্রী দেখিয়া মা সস্নেহে কহিলেন,বরের সঙ্গে ভাঙ্গা করগে খুকী, দেখবি, ছেলেটা খুব ভালো।
ঝঙ্কার দিয়া তপতী কহিল—তুমি বড় বাড়াবাড়ি করছে মা, থামো এবার। মা মুহূর্তে স্তব্ধ হইয়া গেলেন। একটা ভয়ানক কিছু উহাদের হইয়াছে, কিন্তু কী হইয়াছে? প্রশ্নের উত্তর মা খুঁজিয়া পাইলেন না তপতীর মুখের কোনো রেখায়। মায়ের চিন্তাকুল মুখ দেখিয়া তপতী নিজের কথাটা সম্বন্ধে সচকিত হইল, মৃদু হাসিয়া কহিল,—এত বড়ো মেয়েকে কিছু শেখাতে হয় না, তোমার অত ভাবনা কেন? ভাব সাব হয়েছে আমাদের। এক ঘরে না শুলেই বুঝি আর ভাব হয় না।
তপতীর মুখের হাসি দেখিয়া মা অত্যন্ত তৃপ্তি বোধ করিলেন। আজকালকার চালাক ছেলেমেয়ে, হয়ত মাকে ফাঁকি দিয়া বিদায় করিয়া উহারা দুজনে মিলিত হইয়াছে। তাই তপতীর জাগরণক্লান্ত মুখশ্রী মাকে অত্যন্ত আনন্দ দিল। স্নেহ বিগলিত স্বরে তিনি কহিলেন,—বেশ মা, আমার মনটা খুব চঞ্চল হয়েছিল কিনা, তাই বলছিলাম। এবার আমি নিশ্চিন্ত হতে পারবো তাহলে!
মধুর হাসিয়া তপতী কহিল,—একদম নিশ্চিন্ত হয়ে যাও, কিছু ভাবনার দরকার নেই তোমার।
তপন আসিয়াই ঘরের মধ্যে তপতীকে দেখিয়া দরজার কাছে থামিয়া গেল। মা ডাকিলেন,—এসসা বাবা, খাবে। তপতীর পাশ কাটাইয়া তপন ও-দিকের একটা চেয়ারে মুখ ফিরাইয়া বসিল। তপতী সন্ধানী দৃষ্টিতে তাহার আপাদ-মস্তক দেখিতে চাহিল, কিছুই দেখা যায় না। কোট-প্যান্টগুলো সমস্ত দেহটা ঢাকা। উর্ধ্বাংশে তিলক এবং চোখে সবুজ ঠুলি। মুখখানা অমন ভাবে ফিরাইয়া রাখিবার হেতু কি। তপতীর আশ্চর্য বোধ হইতে লাগিল। ভাবিল, মুখের ডােন্টা বোধ হয় ভালোনয়। হয়ত দাঁতগুলো উঁচু কিম্বা ঠোঁট দুইটা পুরু তাই তপতীকে দেখাইতে চাহে না। কিম্বা লজ্জাও হইতে পারে। তপতী মাথার চুলগুলি শুধু দেখিতে পাইতেছে! ভ্রমরকৃষ্ণ কুঞ্চিত চুলগুলি পিছনদিকে উল্টাইয়া দিয়াছে, সদ্যস্নাত চুলঝরা একটা জলধারা ঘাড়ের পাশে গড়াইয়া আসিতেছে, ঘাড় এবং কাধের সংযোগস্থলে একটা ডাগর কালো তিল! পিছনটা তো খুবই সুন্দর মনে হইতেছে, আর ফিগারটাও বেশ লম্বা দোহারা, বলিষ্ঠ।
সবই হয়ত ভাল, কিন্তু অসভ্য যে। আবার ঐ দারুণ গোঁড়ামী, তিলক-ফোটা, নিরামিষ খাওয়া, পাঁচালী পড়ানাঃ, উহাকে লইয়া তপতীর চলিবেনা। খাওয়া শেষ করিয়া উঠিয়া গেল, কিন্তু একেবারে চলিয়া গেল না, বারান্দায় দাঁড়াইয়া রহিল তপনের সহিত মার কথা শুনিবার জন্য। মা বলিতেছে,কাল তোমার কথাটা আমি ভেবে দেখলাম বাবা, ঐ ঠিক। তবে তোমরা দুটি আমাদের সর্বস্ব-ধন তোমাদের ভালোর জন্য মন বড় ব্যস্ত হয়ে ওঠে।
