মেডিকেল কলেজের কাছাকাছি একটি লোককে দেখিয়া তপতী গাড়ী থামাইয়া প্রশ্ন করিল,–এখানে কোথায়?
–রুগী দেখিতে গিয়াছিলাম—ফিরছি।
—আসুন গাড়ীতে। বলিয়া ফুলগুলি তুলিয়া নিজের কোলের উপর রাখিয়া ভদ্রোলোকের বসিবার স্থান করিয়া দিল আপনার পাশে। ভদ্রলোক তপনকে চিনেন না কিন্তু তপতী পরিচয় করাইয়া না দেওয়ায় তাহার দিকে একবার চাহিয়াই মুখ ফিরাইলেন।
তপন নীরবেই বসিয়া রহিল। তাহাকে এইভাবে অপমান করিবার জন্যই তবে তপতী সঙ্গে আসিযাছে! ভালই। ব্যথা তপনের অন্তরে জাগিতেছে কিন্তু মহাশক্তিও তাহার অসীম। ওদিকে তপতী গাড়ী চালাইতে চালাইতে কথা বলিতেছে,—এইখানেই নিমন্ত্রণ করছি, নিশ্চয়ই যাবেন বিকালে।
–নিশ্চয়ই যাবো। আপনার হাতের লিপি না পেলে বছরটাই মিছে হবে।
–খোসামুদি খুব ভালো শিখেছেন, দেখছি। কার কার স্তব করছেন আজকাল?
—স্তব করবার যোগ্য মেয়ে কমই থাকে মিস্ চ্যাটার্জি।
—যেমন আমি একজন। বলিয়াই তপতী উচ্ছলভাবে হাসিয়া উঠিল।
ভদ্রলোক বিব্রত হইতে গিয়া সামলাইয়া লইলেন, বলিলেন,—কথাটা সত্যি।
—ওঃ! এইখানে নামবেন আচ্ছা–নমস্কার।
ভদ্রলোক তাঁহার বাড়ির দরজায় নামিয়া গেলেন। তপতী আবার গাড়ী চালাইল। তপনকে সে যথেষ্ট অপমান আজ করিয়াছে। যদি সে মাকে গিয়া সব কথা বলিয়া দেয়। তপতীর মাথায় এতক্ষণে একটা দুশ্চিন্তা জাগিল। পিছন ফিরিয়া দেখিল, তপন গাড়ীর কিনারায় মাথা রাখিয়াছে। তাহার কৃষ্ণ কুঞ্চিত কেশগুলি বাতাসে উড়িয়া বিপর্যস্ত হইয়া গিয়াছে। তপতী দেখিয়াছে তপনের মুণ্ডিত মস্তক, আজ দেখিল তাহার মার্থার চুলগুলি নরম রেশমের মতো থোকা থোকা হইয়া উড়িতেছে। তপতীর বুকে অকস্মাৎ একটা শিহরণ জাগিল। গাড়ী বাড়ির কাছাকাছি আসিয়াছে। গেটে ঢুকিয়া তপতী নামিতেই দেখিতে পাইল, তপন নামিয়া দারোয়ানকে বলিতেছে,—মাকে বলে দিও, আমি বারোটা নাগাদ ফিরবো।
তপতী কত কি ভাবিতে ভাবিতে উপরে উঠিয়া আসিল।
বিকালে স্নান সারিয়া তপন যখন খাইতে আসিল, তপতীর বন্ধুরা তখন মহাসমারোহে আহারে বসিয়াছে। তপনকে দেখিয়া দুএকজন একটু নাক সিটকাইল। অধিকাংশই তাহাকে চেনে না।
বন্ধুরা যে বারান্দায় খাইতে বসিয়াছে, তপন তাহা পার হইয়া ওদিকের ঘরে তাহার নিত্যকার খাইবার স্থানে গিয়া বলিল,–কৈ মা, খাবার দিন।
—ওখানে বসবে না বাবা—ওদের সঙ্গে?
–না মা, আমার অসুবিধা বোধ হয়! ওদের দতোর তো আমি নই মা।
তপতী উৎকর্ণ হইযা ছিল, মার সহিত তপনের কি কথা শুনিবার জন্য। যেটুকু সহানুভূতি আজ তপনের উপর জন্মিয়াছিল, মুহূর্তে তাহা উবিয়া গেল। উনি ওদের দলের নন কি বাহাদুরী? উহার জন্য তবে তপতীকে বুঝি ভদ্র-সমাজ ত্যাগ করিতে হইবে। রাগিয়া তপতী চলিয়া যাইতেছিল, কিন্তু আরো কি কথা হয় শুনিবার জন্য দাঁড়াইল; মা হাসিয়া বলিলেন—আচ্ছা বাবা, এইখানেই বোস। তিনি একটা চপ ও একটা কাটলেট তপনকে খাইতে দিলেন।
তপন নিতান্ত বিনয়ের সহিত বলিল,–ওসব আমি ভালবাসিনে মা, মাছ মাংস তো আমি খুব কম খাই, আমায় রুটি-মাখন, আর জেলি দিন।
তপতী আর শুনিল না। ঐ দারুণ বর্বরকে লইয়া তাহাকে ঘর করিতে হইবে, ইহা অপেক্ষা তপতী যেন মরিয়া যায়। মা জানুক সব কথা, তপতী ঐ হতভাগাকে যেমন করিয়াই হউক বাড়ি হইতে তাড়াইয়া দিবে।
মনের ভিতরটা যেন আগুনের মতো পুড়িয়া যাইতেছে। ইহার প্রতিক্রিয়া দেখা দিতেছে বন্ধুগণের প্রতি তাহার স্নেহাধিক্যে। সকলেই পরিতৃপ্ত হইয়া ভোজ সমাধা করিল, তপতীর জয়গান করিল এবং নূতন তৈরী লন্টাতে খেলিবার জন্য গিয়া জমায়েত হইল।
তপনকে আর একচোট অপমান করিবার জন্য চেঁচাইয়া তপতী বলিল,–আমি খেলতে যাচ্ছি মা, বারান্দা থেকে দেখো কেমন খেলা শিখেছি।
মা বলিলেন, তুমি টেনিশ খেলবে না বাবা?
-ও খেলা আমি খেলিনে মা, ওটা বড়লোকদের খেলা, আমাদের পোষায় না।
–হলোই বা, যাও, একটু খেলা কর গিয়ে।
–না মা, আমি একটু বেড়াতে যাচ্ছি।
তপন বাহির হইয়া গেল।
মার মন সন্তানের কল্যাণকামনায় সর্বদাই ব্যস্ত থাকে। খুকীর কাণ্ডকারখানা দেখিয়া মিসেস চ্যাটার্জি অত্যন্ত চিন্তিত হইয়া পড়িয়াছেন। স্বামীকে সব করা খুলিয়া বলিতেও তাহার ভয় হয় কারণ তিনি জানেন, স্বামীই এই ব্যাপারের মূল। খুকী তপনকে দেখিতে পারে না শুনিলেই তিনি অত্যন্ত ব্যথা পাইবেন। আর খুকী ঠিক কি ভাবে তপনকে দেখিতেছে, তাহা মাও সঠিক জানিতে পারিতেছেন না। এ যুগের তরুণ-তরুণীকে লইয়া ফ্যাসাদ বড় কম নয়। যাহা হউক, আজ তিনি উহাদের ফুলশয্যার আয়োজন করিয়াছেন। খুকীর ঘরে তপনকেই আজ তিনি পাঠাঁইয়া দিবেন।
রাত্রে খাওয়া শেষ হইলে স্নেহকোমল কণ্ঠে মা বলিলেন-খুকীর এখন আর পড়াশুনার চাপ নেই, এবার ওর সঙ্গে একটু মেলামেশা কর বাবা।
তপন একটু চকিত হইল, তৎক্ষণাৎ সামলাইয়া লইয়া বলিল,–ওর মনের উপর চাপ দিচ্ছেন কেন মা? এ যুগের মেয়ের মনের উপর চাপ সহ্য করে না।
—কিন্তু বাবা…
বাধা দিয়া তপন বলিল,আপনি সব কথা বুঝবেন না মা, আর আমি বলতেও পারবো না। তবে আমার হাতে আপনার খুকীকে সম্প্রদান করেছেন,–এ কথা যদি সঠিক হয় তাহলে তার সঙ্গে কি রকম ব্যবহার করতে হবে সে ভার আমার হাতেই ছেড়ে দিন। আপনাদের উদ্বেগ অনাবশ্যক। আরো কিছু দিন যাক।
মা তপনের কথা শুনিয়া কয়েক মিনিট নীরব হইয়া রহিলেন। তারপর করুণকণ্ঠে কহিলেন—খুকীর ঐ বন্ধুগুলোকে আমার ভয় করে বাবা–
