মীরা সটান তপনের পায়ের কাছে বসিয়া হাঁটুতে চিবুক রাখিয়া বলিল, কাল কি হলো দাদা, কেঁদেছিলে সারারাত?
–না বোনটি কাঁদবো কেন? তোর দাদা কি এত দুর্বল।
কথাটা বলিয়াই তপন মীরার খোঁপা হইতে চাঁপা ফুলটা তুলিয়া লইয়া হাসিয়া বলিল—আমারে ফুটিতে হোল বসন্তের অন্তিম নিঃশ্বাসে—আমি চম্পা।
ব্যাপারটা বেশ সরস হইয়া উঠিতেছিল, কিন্তু মীরার প্রতি উচ্চারিত তপনের শেষের কথাটি এই ক্ষুদ্র সভাটিকে সচকিত করিয়া দিল। এইখানে এমন একজন আছে, অতলান্ত সাগরের মতো যাহার বেদনা পারহীন, কূলহীন। তাহার কথা শিখা বা বিনয়ক ভুলিয়া না গেলেও খুব তীক্ষ্ম ভাবে মনে রাখে নাই।
তপনের কথায় শিখার নারী হৃদয়ের কোমলতা যেন উদ্বেল হইয়া উঠিল, তিরস্কারের স্বরে সেবলিল,–তুমি হয়তো খুব কঠিন দাদা, কিন্তু তুমি এমন করে কথা বলো যে পাষাণও কেঁদে ওঠে—শিখার দুই চোখ কারুণ্যে কোমল হইয়া উঠিল।
মীরা শিখার কানে আসিয়া স্নেহের মাধুর্যে কহিল,দাদা আমার আকাশের তপনের মতই নিজেকে ক্ষয় করে পৃথিবীকে আলোক দেবে। এই তার সাধনা শিখা।
তোর ভাই বোন দুজনেই সমান মীরা! তোদের হাসিভরা কথা শুনে জনহীন প্রান্তর কেঁদে ওঠে।
মীরা এবং তপন অপ্রস্তুতের মতো চুপ করিয়া গেল। বিনায়ক অবস্থাটাকে একটু হালকা করিবার জন্য বলিল,–কান্না মানুষের প্রথম অভিব্যক্তি।
রুখিয়া শিখা জবাব দিল,—তাই অমনি বন্ধু জুটিয়েছেন, প্রতি কথায় কাঁদবো।
বিনায়ক বলিল,–রোদনের মধ্যে দিয়েই আমরা শ্রেয়ঃ লাভ করি, শিখা দেবী।
–রাখুন আপনার ফিলজফি। শ্রেয়ঃ সম্বন্ধে আমার ধারণা আপনার সমান নাও হতে পারে।
না হতে পারে, কিন্তু হতেও তো পারে। তপন টপ্পনি দিল।
–রাগিও না দাদা, ভালো লাগছে না। তোমার বন্ধুর শ্রেয়ঃ যদি দিনরাত কান্না দিয়ে পাওয়া যায়, তাহলে আমার তা চাইনে।
—আমরা কে কি চাই তা আমরা নিজেরাই জানিনে শিখা দেবী। বিনায়ক বলিল।
–রাখুন, রাখুন, এটা কলেজের ক্লাশরুম নয়। আমি কি চাই, তা আমি খুব ভালো করেই জানি।
মীরা খিল খিল করিয়া হাসিয়া বলিল,–জানিস তো চেয়ে নে-না ভাই।
রোষরক্ত নয়নে শিখা ডাকিল—মীরা ভালো হচ্ছে না।
হাসি বিকশিত মুখে মীরা বলিল,–খুব ভালোহচ্ছে শিখা।
দোতলার বারান্দা হইতে শিখার মা ডাকিয়া বলিলেন—রোদটা কড়া হয়ে উঠলো তপন, ঘরে চলে এসো বাবা তোমরা।
তপন ও মীরা তৎক্ষণাৎ উঠিয়া চলিয়া গেল। এ যাওয়ার উদ্দেশ্য এতই স্পষ্ট যে শিখা লজ্জানতমুখে খাবারের বাসনগুলি গুছাইতে লাগিল। বিনায়ক একটা ফুল পাড়িয়া শিখার হাতে দিয়া বলিল,–বেশ তাহলে বন্ধই হলেন—কেমন, রাজি।
–রাজি। শিখা নতমুখে বলিল কথাটা।
ইচ্ছা থাকিলেও বেশীক্ষণ বিনায়কের কাছে একলা থাকিতে শিখার লজ্জা করিতেছিল। উভয়ে চলিয়া আসিল ছায়াঢাকা বারান্দায়।
০৪. পয়লা বৈশাখ সকালে উঠিয়া
পয়লা বৈশাখ সকালে উঠিয়াই তপতীর মনে পড়িল, নববর্ষের নিমন্ত্রণ-লিপি কেনা হয় নাই। আজই বন্ধুগণকে তাহা পাঠানো উচিত। বৎসরের প্রথম দিন বলিয়া হয়তো তপনের উপর তাহার মনটা একটু প্রসন্ন ছিল।
মাকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিল,–আমার নববর্ষের নিমন্ত্রণ-লিপি কেনা হয়নি মা, এখুনি যেতে হবে। সে আবার সেই কলেজ স্ট্রীট,—এ পাড়ায়, পাওয়া যায় না।
মা বলিলেন,—তা যা-না কলেজ স্ট্রীট, কিনে আগে।
—একা যাবো মা? ওদিকে আমি বেশী যাইনে।
মা এক মুহূর্ত কি ভাবিলেন, তারপরই হাস্যদীপ্তকণ্ঠে কহিলেন, একা কেন যাবি তপনকে নিয়ে যা। যাও তো তপন, নববর্ষের কার্ড কিনে আনো গিয়ে।
এতোটা তপতীর ইচ্ছা ছিল না। ঐ অভদ্র লোকটাকে লইয়া বাজার করিতে যাইতে সে নারাজ। কিন্তু মা যেভাবে কথাটা বলিলেন তপতী আর না যাইয়া পারে নাই। সম্মতি সূচক ঘাড় নাড়িয়া বলিল,–বেশ, গাড়ীটা বের করুন।
তপন নীরবে চা পান শেষ করিয়া উঠিয়া গেল এবং গ্যারেজ হইতে গাড়ী বাহির করিয়া চালকের আসনে বসিয়া তপতীর জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিল।
সুন্দর একটা হালকা রং-এর শাড়ী পরিয়া তপতী নামিয়া আসিল। কিন্তু ঐ সুবেশা তরুণীকে একটা চন্দন-তিলক আঁকা কিম্ভুতের পাশে দেখিলে লোকে ভাবিবে কি। দুই মুহূর্ত ভাবিয়া তপতী ভিতরে আসনে উঠিয়া বসিল-তপন গাড়ী ছাড়িয়া দিল।
কলেজ স্ট্রীটের একটা বড় দোকানের সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইল গাড়ী। নামিয়া তপতী দোকানে ঢুকিল। সম্রান্ত তরুণী দেখিয়া দোকানের কর্মীরাও প্রয়োজন জানিবার জন্য ব্যস্ত হইল।
তপতী কার্ড দেখিতে চাহিল, একবার ঘাড় ফিরাইয়া দেখিল তপন গাড়ীতে বসিয়া রাস্তার ওপারে ফুলের দোকানটায় সাজানো ফুলগুলির দিকে চাহিয়া আছে। দোকানের একজনকে তপতী আদেশ করিল,—ওকে বলুন তো দুটাকার ফুল কিনে আনুক।
সে ব্যক্তি দোকানের ভিতর হইতে চীকার করিয়া কহিল,–এ ড্রাইভার, দুরুপেয়াকো ফুল লে-আও।
তপন নীরবেনামিয়া ফুলের দোকানে চলিয়া গেল। তাহাকে ড্রাইভার সম্বােধন করায় তপতীর প্রথমটা লজ্জাই হইয়াছিল, কিন্তু ভাবিয়া দেখিল, দোকানের কর্মচারীর কিছুমাত্র অপরাধ নাই। মৃদু ভাবিয়া সেকার্ড চাহিয়া লইয়া এবং মূল্য দিয়া গাড়ীতে ফিরিয়া চালকের আসনে নিজে বসিল।
তপন অনেকগুলি ফুলের বোঝয় মুখ আড়াল করিয়া ফিরিতেই তপতী নিজের বাঁদিকের খালি জায়গাটা দেখাইয়া দিয়া বলিল,–রাখুন।
তপন ফুলগুলি সেখানে রাখিয়া দেখিল, তপতীর পাশে বসিবার আর স্থান নাই। সে ভিতরের সীটে আসিয়া বসিবামাত্র তপতী গাড়ী ছাড়িয়া দিল।
