শিখা ফোনে আসিয়া বলল,—কি বলছিস তপু?
—আমার বিপদে তুই চিরকাল সাহায্য করেছিস; আজ আমার এই ঘোর দুর্দিনে কেন তুই লুকোচ্ছিস বল ত?
শিখা ভরা গলায় বলিল,–লুকোইনি তপু! আমি একজন সন্ন্যাসী দাদা পেয়েছি, তার কাছেই এ কয়দিন কাটলো। এখনি আবার আসবেন তিনি।
–বেশ তো তাকেও নিয়ে আয়।
–যাবেন না। আলাপ-পরিচয় না হলে যাবেন কেন?
—তা হলে কি আমি যাবো তোদর বাড়ী?
–আসতে পারিস, তবে দাদার সঙ্গে দেখা হবে না।
–কারণ?
—দাদা চট করে কারো সঙ্গে আলাপ করেন না। তারপরে তুই আর্যনারী হয়ে স্বামীকে গ্রহণ করিসনি শুনলে চটে যাবেন।
মুহূর্তে তপতীর অন্তর রোষরক্তিম হইয়া গেল, বলিল—থাক ভাই, সেই আর্যপুত্রের সঙ্গে আলাপ করবার আমার দরকার নাই। তাহলে আসবি নে?
–না ভাই, মাফ করিস?
–আচ্ছা, আর ডাকবো না তোকে।
তপতী ফোন ছাড়িয়া দিল। ওদিকে ফোন হাতে করিয়া শিখা বেদনায় মুহ্যমান হইয়া পড়িতেছে।
সকালরেলায় শীতল হাওয়া বহিয়া যাইতেছে। একটা চাপাগাছের তলায় তিনখানা বেতের চেয়ার পাতিয়া শিখা অপেক্ষা করিতেছিল। মাত্র মাসখানেক হইল তপনের সহিত তাহার পরিচয়, কিন্তু ইহারই মধ্যে তাহার কি অভাবনীয় পরিবর্তন হইয়া গিয়াছে। ঐ স্পর্শমণির পরশে শিখার অন্তর যেন সোনা হইয়া গেল। কিন্তু ঐ মণিটি যাহার সে উহাকে পাথর ভাবিয়া দূরে ফেলিয়া দিয়াছে। তার মতো দুর্ভাগিনী আর কেহ আছে কি না, শিখা জানে না। তপতীর জন্যে শিখার অন্তর করুণায় দ্রব হইয়া উঠিল।
তপন ও বিনায়ক আসিয়া পৌঁছিল। শিখা প্রণাম সরিয়া বলিল,–একটা কথা শোন দাদা-একটা প্রার্থনা।
-কি বল্। তোর প্রার্থনা পুরানো তো দাদার গৌরব।
-জানি। অনুচিত কিছু চাইবো না দাদা। তুমি তপতীর সঙ্গে বা তার কাছে এমন দুচারটে কথা বল, যাতে সে তোমাকে চিনবার সুযোগ পায়, অন্তত উৎসুক হয়।
—তাতে লাভ কি শিখা?
–আছে লাভ আমার বিশ্বাস, তপতী আজো তোমার অযোগ্য হয়ে যায়নি। ওর প্রথম জীবন অত্যন্ত সুন্দর ঠাকুমা-ঠাকুরদার হাতে গড়া। ও এই সোসাইটির চার্মে পড়ে নষ্ট হতে বসেছে, কিন্তু এখনো নষ্ট সে হয়নি। তুমি ওকে বাঁচাও দাদা।
–মরণ-বাঁচনের অধিকার আমার হাতে নেই শিখা। তবে যদি সে আজো অন্যপরায়ণা থাকে, যদি সে সতী থাকে, তাহলে তাকে পাব। তার জন্য আয়োজনের কিছু তো প্রকার নেই। তবুও তোর কথা রাবো যতটা সম্ভব।
শিখা নীরবে নত নেত্রে স্বহস্তে প্রস্তুত খাবারগুলি সাজাইতে লাগিল! বিনায়ক ফুটন্ত চাঁপা ফুলের দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে চাহিয়া আছে। ফুলটা ফুটিয়াছে অনেক উঁচুতে নাগাল পাওয়া যায় না। বিনায়ক একটা লাফ দিল।
শিখার করুণ মুখশ্রী হাসিতে রঞ্জিত হইয়া উঠিল। বলিল, শুধু কারখানার হিসাবই দেখেন না, ফুলের খবরও রাখেন দেখি।
হাসিমুখে বিনায়ক বলিল, রাখি, কিন্তু নিজের জন্য নয়, মীরাটা বড্ড ফুল ভালোবাসে।
—আমার জন্যও একটা পাড়বেন।
বিনায়ক ত্বরিতে জবাব দিল, কেন, আপনার তো দাদা রয়েছে, দিক না পেড়ে।
ঠোঁট ফুলাইয়া শিখা কহিল, দাদা তো আছেই, আপনি বুঝি কেউ নন? কথাটা বলিয়াই শিখার অত্যন্ত লজ্জা বোধ হইতে লাগিল। চাহিয়া দেখিল তপন কিঞ্চিৎ দূরে একটা কৃষ্ণচূড়ার ছায়ায় দাঁড়াইয়া আছে। নিজেকে প্রচ্ছন্ন করিবার জন্য ডাকিল, দাদা খাবে এসো।
বিনায়ক কিন্তু কথাটার জের ছাড়ে নাই, কহিল,আমার সঙ্গে তাহলে একটা সম্পর্ক আপনার হওয়া দরকার। কী সম্পর্ক বাঞ্ছনীয় আপনার?
—আপাতত বন্ধু। শিখা জবাব দিয়া সরবৎ তৈরী করিতে লাগিল।
ঐ আপাতত কথাটির মধ্যে রহিয়াছে যে ভবিষ্যতের ইঙ্গিত তাহাই ভাবিতে গিয়া শিখার হাস্যমধুর মুখের পানে চাহিয়া বিনায়ক বুঝিল, শিখাকে পাওয়া তাহার পক্ষে খুব কঠিন না-ও হইতে পারে। কিন্তু তাহার ভয় করিতেছে। তপনের দারুণ ভাগ্য-বিপর্যয়ের কথা তাহাকে আতঙ্কিত করিয়াছে। এই সোসাইটিতে দরিদ্র বিনায়ক আবার ঢুকিবে। শিখা তাহার আকাঙক্ষাব ধন, শিখাকে পাইলে ধন্য হইয়া যাইবে বিনায়ক কিন্তু শিখাকে সে রাখিবে কোথায়?
–কি ভাবছিস্ বিনু। বলিয়া তপন ফিরিয়া আসিল।
–ভাবছেন, আমার সঙ্গে উনি কি সম্পর্ক পাবেন। বলিয়া শিখা গ্লাসের সরবৎ আরো বেগে নাড়িতে লাগিল। মুখে তাহার হাসি মাখানো।
তপন শিখার গায়ে একটা কৃষ্ণচূড়ার ঝরা ফুল ছুঁড়িয়া দিয়া কহিল,দুষ্টু আমার বন্ধুকে বিব্রত করে তুলেছিস্?
কি করা যায় দাদা, তোমার বন্ধু যদি নিঃসম্পৰ্কীয় কাউকে ফুল তুলে না দেন, তাহলে, সম্পর্ক একটা পাতানো ভালো নয় কি? মীরাটা কিন্তু বড্ড দেরী করছে।
–থাম—তার স্বামী, শাশুড়ী, শ্বশুর। সকালবেলা বিস্তর কাজ। ঐ তো এসেছে…
প্রকাণ্ড একটা গাড়ী গেটে ঢুকিতেই শিখা ছুটিয়া গিয়া মীরাকে জড়াইয়া ধরিল—আয় দুষ্টু, এত্তো দেরী করলি যে…?
-চুপ চুপ বিনুদা এক্ষুণি মার লাগাবে! ওর কারখানার পাংচুযালিটি বড় কড়া। কিন্তু বিনুদার মুখটা যেন,—কি হয়েছে বিনুদা? মীরা বিনায়কের মাথার চুলে হাতের আঙুলগুলি বাইয়া নড়িতে লাগিল।
—না বোনটি, কিছু হয়নি; আয়, তোর জন্য এই ফুলটা পেড়ে রেখেছি।
মীরা ফুলটা লইয়া খোঁপায় পরিতে পরিতে বলিল,–তোর কই শিখা?
শিখা করুণ কণ্ঠে কহিল,–আমার দাদাও দিল না, তোর বিনুদাও না।
–বা-রে! বিনুদা, ফুল পেড়ে দাও, আমার হুকুম, ওঠো।
বিনায়ক উঠিতে যা শিখা ব্যাকুলভাবে বলিয়া উঠিল,–না, না, আগে খেয়ে নিন–।
মীরা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হইয়াছে, এমনি ভঙ্গি করিয়া বলিল,–বটে। আমার চেয়ে তোর দরদ ওর উপর বেশি? আচ্ছা। তোমাকে ওর হাতে দিয়ে দিলুম বিনুদা, বুঝে কাজ কর এবার থেকে।
