তপন শান্ত করে বলিল,–ভরসা পাচ্ছিনে টিকির বদলে মাথাই যদি..
হাসিতে হাসিতে একজন বলিল,—মাথা তাহলে আছে আপনার? আমরা ভেবেছিলাম, তপতী সেটা ঘুরিয়ে দিয়েছে অনেক আগেই।
তপন নিতান্ত গোবেচারার মতো বলিল,–টিকি না থাকায় ওঁর ঘোরাতে অসুবিধা হচ্ছে।
রেবা দেবী আসিয়া বলিল,–আমি কেটেছিলাম টিকি, আমি শ্ৰীমতী রেবা…
—আপনি আমার বড় উপকার করেছেন রেবা দেবী টিকির উপর দিয়েই ফাড়াটা উতরে গেল! মাথাটা বাঁচতেও পারে।
–বাঁচবে না, ওটাকে আজ তপির পায়ে সমর্পণ করাবো।
অত্যন্ত করুণ কণ্ঠে তপন কহিল,—ওঁর পা থেতলে না যায়।
তপতী ওদিক হইতে ক্রুদ্ধস্বরে ডাকিল,—কি করছিস তোরা? এদিকে আয়না সব!
-তোর বর যে যাচ্ছে না। বলিয়াই তাহারা তপনকেও ধরিয়া আনিয়া একটা টিপয়ের কাছে বসাইয়া দিল। তাহার অদ্ভুত বেশ প্রত্যেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছে।মৃদুগুঞ্জন বিদ্রূপ শুরু হইয়া গিয়াছে। তপতীর কানেও দুই চারিটা কথা ভাসিয়া আসিল কিন্তু এখানে সে নিরুপায়। অত্যন্ত বিরক্তির সহিত সে একবার তপনের দিকে আঁখিপাত করিল। চোখের ইলি এবং চন্দনে মুখখানা আচ্ছন্ন। লোকটা কালো কি ফর্সা তাও বোঝা যায় না। মাথায় টুপি থাকার জন্য চুলও দেখা যাইতেছে না। গঙ্গাবক্ষে এই অপরূপ মূর্তি দেখিয়া হাসিই পাওয়া উচিত কিন্তু হাসিতে গিয়াই মনে পড়িয়া গেল, ঐ কিম্ভুত কিমাকার লোকটা তাহার স্বামী! তপতীর কান্না পাইতে লাগিল। আত্মসম্বরণ করিবার জন্য সে রেলিং-এর ধারে আসিয়া দাঁড়াইল।
নীরবে চা-টুকু শেষ করিয়া উঠিয়া তপন বলিল,–নমস্কার, আমি নীচেই বসছি গিয়ে।
তাহার রূপ, আচার, ব্যবহার দেখিয়া সকলেই বুঝিয়াছিল, এখানে বসিবার সে যোগ্য নয়। কেহই বিশেষ কিছু বলিল না। তপতী হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিল। কিন্তু তপন চলিয়া যাইবামাত্র মিঃ ঘোষাল কহিলেন—ওই লোকটা আপনার বর? আশ্চর্য। আপনার বাবার বুদ্ধির প্রশংসা করতে পারলাম না।
অত্যন্ত উম্মার সহিত তপতী জবাব দিল,–থাক, আমার বাবা আপনার বুদ্ধি ধার করতে যাবেন না নিশ্চয়ই।
তপতীর মনের অবস্থা বুঝিয়া সকলেই এ আলোচনা বন্ধ করিয়া দিল! তপতী কিন্তু আর কোন কথাই কহিল না। অপমানে তাহার সারা অন্তর জ্বলিতেছে। স্টিমার জেঠিতে ফিরিবামাত্র সে চার পাঁচজন অন্তরঙ্গ বন্ধু লইয়া নিজে গাড়ী চালাইয়া বাড়ী চলিয়া গেল।
তপন একধারে দাঁড়াইয়া দেখিল। আপন মনে হাসিল। উহাদের সেনিষ্ঠুর ভাবে ঠকাইয়া দিয়াছে। ধীরে ধীরে আসিয়া সে ট্রামে উঠিল।
তপতী গৃহে ফিরিয়া শয্যায় লুটাইয়া অনেকক্ষণকাদিল। আজ তাহার ঠাকুরদারকথাগুলি মনে পড়িতেছে। তিনি বলিতেন—তোর যা বর হবে দিদি, তার আর জোড়া মিলবে না—তার সেই ভবিষ্যদ্ববাণী নিয়তির এমন নিষ্ঠুর বিদ্রূপ হইয়া দেখা দিবে—কে জানিত! তপতী স্থির করিয়া ফেলিল—অপমান করিয়া ঐ বর্বরকে বাড়ী হইতে তাড়াইয়া দিবে। সারা জীবন তপতী একা থাকিবে, সেও ভালোতপতীর উহার সহিত এক গৃহে বাস অসম্ভব।
দুঃস্বপ্নের মধ্যেই তপতীর রাত্রি কাটিয়া গেল। প্রভাতে তাহার গা-হাত পা ব্যথা করিতেছে, উঠিল না। মা আসিয়া ডাকিলেন,শরীর খারাপ খুকী! উঠছিস না কেন?
মায়ের উপর এক চোট ঝাল ঝাড়িয়া লইতে গিয়া তপতী থামিয়া গেল। বেচারী মা, উহার কি দোষ? জামাইকে স্নেহ মমতা করা শাশুড়ীর কর্তব্য।
তপতী উঠিয়া পড়িল। স্নান সারিয়া চা খাইতে আসিয়া দেখিল, রবিবার বলিয়া তপন বাহিরে যায় নাই, চা খাইতেছে।তপতীর গলার স্বর শুনিয়াই সে মুখ নীচু করিল, যেন তপতী তাহাকে দেখিতে না পায়।
তপতী আসিয়া তপনকে দেখিয়াই জ্বলিয়া উঠিল। রুক্ষ স্বরে বলিল,–বৈরাগী আগে চা খেয়ে যাক, তারপর আমি খাবো।
মা রাগিয়া বলিলেন,—ছিঃ খুকী, কি সব বলছিস?
তপন হাসিয়া কহিল,—ভালোই তো বলেছে মা। বৈরাগী যেন আমি হতে পারি। অনেক তপস্যায় মানুষ বৈরাগী হয় মা। বৈরাগ্য সাধনার ধন।
রোষ ভরে তপতী বলিয়া চলিল,–যথেষ্ট হয়েছে আর দরকার নাই! তপতী চলিয়া গেল।
মা বলিলেন—কিসব তোমাদের ব্যাপার বাবা, ঝগড়া করেছে নাকি?
—কিছু না মা, ঝগড়া আমি করি নে। আমার চন্দন তিলক ওর পছন্দ নয়; তা কি করা যায় বলুন। কারো রুচির খাতিরে চন্দন মাখা আমি ছাড়তে পারবো না।
তপনের মুখের হাসি দেখিয়া মা আশ্বস্ত হইলেন। ছোটখাটো কিছু একটা উহাদের হইয়া থাকিবে। দম্পতীর কলহ, ভাবনারও কিছুই কারণ নাই।
তপন চা খাইয়া উঠিয়া গেলে তপতী আসিল। মুখ অত্যন্ত গম্ভীর। মা হাসিয়া বলিলেন,–ঝগড়া টগড়া করিস নে খুকী-ছেলেটা বড় ভালো।
—অত ভালো ভালো নয় বুঝলে মা। অত ভালো হতে ওকে বারণ করে দিও।
—তুই বারণ করিস, আমার কি দায়?
তপতী রুখিয়া উঠিল। বলিল—-ঐ ইডিয়টটাকে শাঁখ বাজিয়ে ঘরে তুলতে তো দায় পড়েছিল তখন—যত সব।
কিন্তু তপতী সামলাইয়া লইল। মা বিরক্ত হইয়া বলিলেন, চুপ কর খুকী, স্বামীকে ওসব বলতে নেই।
তপতীর ইচ্ছা হইতেছিল, মাকে আচ্ছা করিয়া কয়েকটা কথা শুনাইয়া দেয়। বলে যে তোমরা যাহাকে আনিয়াছ, সে আমার পদ-সেবার যোগ্য নহে। তাহাকে আমি লইব না। তোমরা তাহাকে লইয়া যাহা খুশি করিতে পার। কিন্তু ব্যাপারটা বিশ্রী হইবে, বাবা শুনিবেন, এখনি একটা কেলেঙ্কারী ঘটিয়া যাইবে, অতএব সে থামিয়া গেল।
মা বলিলেন—দিন ঠিক করেছি, পয়লা বোশেখ তোদের আবার ফুলশয্যা হবে।
—আচ্ছা, পয়লা বোশেখ সে কথা ভাবা যাবে। বলিয়া তপতী চলিয়া আসিল। শিখা কেন আসিল না কাল? তাহাকে যে তপতীর কি ভীষণ দরকার। তপতী আবার ফোন্ করিল।
